উত্তরপ্রদেশে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর চলাকালীন ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য জমা পড়া কিছু ফর্ম ৭ ‘ভুয়ো’ বলে চিহ্নিত হয়েছিল। তবে সেগুলির একটিও গ্রহণ করা হয়নি। শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬, সুপ্রিম কোর্টে এ কথা জানাল ভারতের নির্বাচন কমিশন।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে কমিশনের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী দামা শেষাদ্রি নাইডু জানান, এই ধরনের ‘ভুয়ো’ ফর্ম নজরে আসার পরেই দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। নিয়ম লঙ্ঘন করে জমা দেওয়া ফর্ম ৭ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাতিল করে দিয়েছেন বলে দাবি করে কমিশন।
উত্তরপ্রদেশের এসআইআরের দাবি ও আপত্তি জানানোর পর্যায়ে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক ফর্ম ৭ জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অপব্যবহার ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন বারাবাঁকির কংগ্রেস সাংসদ তনুজ পুনিয়া। তাঁর হয়ে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী সলমন খুরশিদ এবং আইনজীবী শারিক আহমেদ। তাঁদের আবেদনের জবাবেই এ দিন নিজেদের অবস্থান জানায় কমিশন।
ভুয়ো ফর্ম ৭ গোড়াতেই আটকে দেওয়া হয়েছিল—কমিশনের এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আহমেদ। তাঁর বক্তব্য, এই দাবির বিচারবিভাগীয় যাচাই প্রয়োজন। তিনি যুক্তি দেন, উত্তরপ্রদেশের এসআইআরে কোনও সংশোধনমূলক ব্যবস্থা না নেওয়াই কর্নাটক ও তেলঙ্গানায় একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক ফর্ম ৭ জমা দেওয়ার প্রবণতাকে ‘সাহস জুগিয়েছে’।
আদালতে তিনি বলেন, “উত্তরপ্রদেশের হাটা বিধানসভা কেন্দ্রের ৩২টি ফর্ম ৭-এর মধ্যে দু’টিতে বুথ লেভেল অফিসারের স্বাক্ষর ছিল। এই সমস্ত ফর্মই একটি সম্প্রদায়ের ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার জন্য জমা দেওয়া হয়েছিল।” আদালত আহমেদকে বিষয়টির বিস্তারিত তথ্য এবং অতিরিক্ত কোনও তথ্য থাকলে তা-সহ একটি নোট জমা দিতে বলে।
আদালতের বক্তব্য, “নির্বাচন কমিশন এই বিষয়গুলি খতিয়ে দেখুক, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিক এবং নির্দেশ পালনের রিপোর্ট জমা দিক।”
উত্তরপ্রদেশে এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ হয় এপ্রিলে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ভোটারের সংখ্যা ৮৪ লক্ষ বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৩৯ লক্ষে। সংশোধনের পর দু’কোটিরও বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়ে।
খুরশিদ ও আহমেদ জানান, বারাবাঁকির সাংসদের আবেদনে উত্থাপিত বিষয়টি আর দেরি না করে শুনতে হবে। কারণ, রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের প্রক্রিয়া ২০২৬ সালের ডিসেম্বর অথবা আগামী বছরের জানুয়ারির গোড়াতেই শুরু হয়ে যেতে পারে।
পুনিয়ার আবেদনে বিস্তারিত ভাবে অভিযোগ করা হয়েছে, ‘অসংখ্য’ ফর্ম ৭ তৈরি করে জমা দেওয়া হয়েছে, যেখানে আপত্তিকারীর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য অসম্পূর্ণ বা মিথ্যা, পরিচয় শনাক্ত করার তথ্য অবৈধ এবং স্বাক্ষর জাল। একাধিক ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিদের নামে আপত্তি জমা পড়েছে, যাঁরা পরে জানিয়েছেন যে তাঁরা আদৌ কোনও আপত্তি জানাননি। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বুথ লেভেল অফিসারদের বা বিএলওদের কাছে আগে থেকেই পূরণ করা ফর্ম ৭ পৌঁছেছিল, যার মাধ্যমে একাধিক ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়। তাঁদের মধ্যে এমন ভোটারও ছিলেন, যাঁদের তথ্য এসআইআর প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই যাচাই করা হয়েছিল।
বারাবাঁকির সাংসদের বক্তব্য, এই ঘটনাগুলি “আপত্তি জানানোর ব্যবস্থার সততা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর আশঙ্কা” তৈরি করেছে। যাঁরা মিথ্যা ঘোষণা করেছেন, প্রতারণামূলক আপত্তি জমা দিয়েছেন, অন্যের পরিচয়ে আপত্তিকারী সেজেছেন অথবা ভোটার তালিকা থেকে অন্যায় ভাবে নাম বাদ দেওয়ানোর উদ্দেশ্যে ফর্ম ৭ ব্যবস্থার অপব্যবহার করেছেন বলে প্রমাণিত হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩১ ধারা এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইনি বিধান অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা শুরুর আর্জি জানিয়েছেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টে নাইডুর বক্তব্যের সঙ্গে সেপ্টেম্বরে নির্বাচন কমিশনের জমা দেওয়া হলফনামার বক্তব্যের মিল রয়েছে। ওই হলফনামায় কমিশন জানিয়েছিল, বিএলওদের কাছে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক ফর্ম ৭ জমা দেওয়ার চেষ্টা সম্পর্কে মাঠপর্যায়ের নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছ থেকে একাধিক রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছে।
এর মধ্যে ছিল হাটা বিধানসভা কেন্দ্রের একটি ঘটনা। সেখানে শুধু ‘যোগেন্দ্র’ নামে চিহ্নিত এক ব্যক্তি ৩২ জন ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার ফর্ম ৭ এক বিএলওর টেবিলে রেখে যান। হলফনামায় এই রেখে যাওয়াকে ‘অনিচ্ছাকৃত’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ওই ‘যোগেন্দ্র’র এখনও কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
কমিশনের হলফনামায় আরও বলা হয়, খলিলাবাদের ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ভোটার নিবন্ধন আধিকারিকের রিপোর্টেও এক বিএলওর কাছে একসঙ্গে অনেকগুলি ফর্ম ৭ জমা দেওয়ার চেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, “তবে বিপুল সংখ্যায় একসঙ্গে জমা দেওয়ার কারণে ফর্মগুলি গ্রহণ করা হয়নি।” এই ঘটনার পরে বিএলওদের স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়, যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া কোনও ফর্ম ডিজিটাল ব্যবস্থায় নথিভুক্ত করা যাবে না এবং একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক ফর্ম ৭ গ্রহণ করা যাবে না।
হলফনামা অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সকলডিহায় তদন্ত হয়। সেখানে আধিকারিকেরা এমন কিছু ভুয়ো ফর্ম ৭ পান, যেগুলি সংশ্লিষ্ট বিএলও দেননি এবং নির্ধারিত পদ্ধতি মেনেও জমা দেওয়া হয়নি।
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ফর্ম ৭ জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর, ভোটার নিবন্ধন কেন্দ্র, বিএলও অথবা ভোটার পরিষেবা পোর্টাল থেকে পাওয়া যায়। আবেদনকারীকে ফর্মটি যথাযথ ভাবে পূরণ করে, স্বাক্ষর করে, ভোটার পরিচয়পত্রের নম্বর বা ইপিআইসি এবং ফোন নম্বর-সহ জমা দিতে হয়। তা সরাসরি বিএলওর কাছে অথবা অনলাইনে জমা দেওয়া যায়।
হলফনামায় আরও জানানো হয়, কয়েক জন বিএলওর বাড়িতে খামের ভিতরেও ফর্ম ৭ পাওয়া গিয়েছিল। কমিশন বলে, “যথাযথ অনুসন্ধানের পরে দেখা যায়, যাঁদের নামে ফর্ম ৭ জমা দেওয়া হয়েছে বলে দেখানো হয়েছিল, তাঁরা সেগুলি জমা দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁরা আরও জানিয়েছেন, ওই ফর্মগুলি ভুয়ো।”
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।