উত্তর-পূর্ব দিল্লির মুস্তাফাবাদের দয়ালপুর এলাকায় একই ঠিকানায় দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে বাস করছেন সাজিদ হুসেন। পেশায় দর্জি হুসেন বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, জানতে পেরে হতবাক হয়ে যান যে দিল্লির ভোটার তালিকা থেকে তাঁর ছেলে ও স্ত্রীর নাম বাদ দেওয়ার জন্য ফর্ম ৭ জমা পড়েছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় এখন দাবি ও আপত্তি জানানোর পর্ব চলছে। সেই পর্বেই জমা দেওয়া হয়েছে আবেদনগুলি।
হুসেন জানান, তাঁর ছেলে আসাদ রেজা জাইদি এবং স্ত্রী আফসানা খাতুনের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন যিনি করেছেন, তাঁর নাম তিনি কখনও শোনেননি। ওই পাড়ার মোট ২৮ জন ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন জমা পড়েছে। কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে—‘অনুপস্থিত/স্থায়ী ভাবে অন্যত্র চলে গিয়েছেন’ অথবা ‘মৃত’। নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, সব ক’টি আবেদন করেছেন বিজেপি-নিযুক্ত বুথ স্তরের এজেন্ট-২ বা বিএলএ-২ চন্দ্রশেখর নৈনওয়াল।
১২৯ নম্বর বুথে জমা পড়া ফর্ম ৭ বলতে এই আবেদনগুলিই। এর মধ্যে ১৮টি দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দৈনিক আপত্তির তালিকায়, অর্থাৎ ফর্ম ১০-এ, নথিভুক্ত হয় ২৫ অক্টোবর। ন’টি নথিভুক্ত হয় ২১ অক্টোবর এবং একটি ১৯ অক্টোবর। নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-র কাছে আপত্তি জমা পড়ার পরে এবং তা ফর্ম ১০-এ প্রকাশিত হলে যে নোটিস দেওয়া হয়, এই ভোটারেরা এখনও তা পাননি।
কিন্তু সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ২৮ জন ভোটারই নিজেদের ঠিকানায় বসবাস করছেন। প্রত্যেকেই গণনার ফর্ম জমা দিয়েছিলেন এবং ৩১ আগস্ট প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম ছিল। তাঁদের মধ্যে ১৯ জনের সঙ্গে অথবা তাঁদের নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করে কথা বলা হয়। তাঁদের কাছে বৈধ পরিচয়পত্র ছিল। কেউই এর আগে নৈনওয়ালের নাম শোনেননি।
হুসেনের বাড়ির পাশের বাড়িতে থাকেন আব্দুল জব্বার। তাঁর ২২ বছরের ছেলে মহম্মদ হুজেফা এবং মেয়ে আয়েশার নামও বাদ দেওয়ার আবেদনের তালিকায় রয়েছে। হুজেফা সেখানে আরও একটি পরিচিত নাম দেখতে পান—উম্মেদ আলি। বহু দিনের প্রতিবেশী উম্মেদ একটি ছোট মুদির দোকান চালান।
মুস্তাফাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রের অন্য এলাকাতেও একই ধরনের ঘটনা সামনে এসেছে। ভোটারেরা নথিভুক্ত ঠিকানাতেই থাকেন, অথচ তাঁদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
৩১ আগস্টের পর থেকে মুস্তাফাবাদ কেন্দ্রে মোট ৮৪৩টি আপত্তি জমা পড়েছে। ফর্ম ৭ জমা পড়ার সংখ্যা এই কেন্দ্রেই সর্বাধিক। সংশ্লিষ্ট ভোটার ছাড়া অন্য ব্যক্তিদের জমা দেওয়া ৫৯৭টি আবেদনের ৯৬ শতাংশে ‘আপত্তিকারী’ হিসেবে নাম রয়েছে বিজেপির বুথ স্তরের এজেন্টদের। এই এজেন্টদের জমা দেওয়া ৫৭২টি ফর্ম ৭-এ কেন্দ্রের ২৪টি ভোটার তালিকার অংশে থাকা মুসলিম ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
এখনও পর্যন্ত দশ জন বুথ এজেন্ট ৩০টির বেশি এবং ন’জন ২৫টির বেশি ফর্ম ৭ জমা দিয়েছেন। অথচ নির্বাচন কমিশনের ৯ অক্টোবরের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, একজন ভোটার অনলাইন ও অফলাইন মিলিয়ে সর্বাধিক দশটি এমন আবেদন করতে পারবেন।
বিএলএ-২-দের অন্য ভোটারদের পূরণ করা ফর্ম একসঙ্গে জমা দেওয়ার অনুমতি রয়েছে। তবে ফর্ম ৬, ৭ ও ৮ মিলিয়ে দিনে সর্বাধিক দশটি জমা দেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে আবেদনগুলির তালিকার সঙ্গে একটি অঙ্গীকারপত্রও দিতে হয়। তাতে জানাতে হয়, তাঁরা আবেদনগুলির তথ্য যাচাই করেছেন।
কিন্তু এই সমস্ত ক্ষেত্রে বুথ এজেন্টেরা নিজেরাই ‘আপত্তিকারী’ হিসেবে ফর্ম পূরণ করেছেন।
একজন পদস্থ আধিকারিক বলেন, “বিএলএ যদি বুথ এজেন্ট হিসেবে প্রয়োজনীয় অঙ্গীকারপত্র-সহ আবেদন জমা না দিয়ে নিজেই ‘আপত্তিকারী’ হিসেবে ফর্ম পূরণ করেন, তা হলে একজন সাধারণ ভোটারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম এবং সংখ্যার সীমাই তাঁর ক্ষেত্রে কার্যকর হবে।”
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের পাঠানো একটি প্রশ্নের জবাবেও নির্বাচন কমিশন একই কথা জানিয়েছিল।
মুসলিম ভোটারদের বিরুদ্ধে জমা পড়া এই ৫৭২টি ফর্ম ৭-এর আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন শশী—৪২টি আবেদন; রমন—৩৫টি; মনোজ কুমার ও মোহন মদন—৩৩টি করে; সাওয়ার সিং—৩২টি; রাজকুমার ও হিমাংশু—৩১টি করে; কপিল, নিতিন কুমার ও রবিন সিং ধামা—৩০টি করে; নীরজ শর্মা—২৯টি; এবং অভিষেক মিশ্র—২৮টি। আধিকারিকেরা নিশ্চিত করেছেন, তাঁদের নথিতে এই সমস্ত আপত্তিকারীই বুথ স্তরের এজেন্ট হিসেবে নথিভুক্ত। তাঁরা আরও জানিয়েছেন, “এই ফর্মগুলির সঙ্গে কখনও কোনও বিএলএ অঙ্গীকারপত্র জমা পড়েনি।”
একজন আধিকারিক বলেন, “বিএলএ-রা ফর্মগুলি বুথ স্তরের আধিকারিক বা বিএলও-দের হাতে দেন। বিএলও-রা সেগুলি দপ্তরে জমা করেন।”
নিতিন কুমারের হাতে পূরণ করা এমনই একটি ফর্ম হাতে এসেছে। সেখানে তিনি যে বুথ এজেন্ট, তার উল্লেখ নেই। বিএলএ-দের জন্য নির্ধারিত বিন্যাসেও ফর্মটি জমা দেওয়া হয়নি।
৯ অক্টোবরের নির্দেশিকায় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, “ইআরও যদি দেখেন অভিযোগটি মিথ্যা বা মনগড়া, তা হলে ফর্ম ৭-এ জেনেশুনে মিথ্যা লিখিত বিবৃতি বা ঘোষণা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীর বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের বিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।”
দয়ালপুরে সাজিদ হুসেন এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না, এমন ঘটনা ঘটল কী করে। তাঁর প্রশ্ন, “আমার পরিবারের শুধু দু’জন কী করে অন্যত্র চলে যেতে পারেন? আমাদের পরিবারে আট জন সদস্য। আমরা সবাই কয়েক দশক ধরে এই ঠিকানাতেই ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত। এ কেমন তামাশা?”
২৫ বছরের জাইদি তখন কাজের জন্য বাইরে ছিলেন। আফসানা খাতুন জানান, তিনি সব সময় বাড়িতেই থাকেন। তাঁর কথায়, “বিএলও যখন এখানে এসেছিলেন, তখন আমরা তাঁর হাতে ফর্ম দিয়েছিলাম। তার পরে একটা নোটিসও এসেছিল, যার জন্য আমরা কাগজপত্র জমা দিয়েছি। এখন কি আবার কোনও কাগজপত্র জমা দিতে হবে?”
অন্য দিকে, ৭৬ বছরের জাহির আলির নাম বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে—‘মৃত’। তাঁর পরিবারের সদস্য শামা পারভিন বলেন, “সম্ভবত আমাদের পরিচয়ের কারণেই আমাদের নিশানা করা হচ্ছে। অন্য কোনও কারণ তো দেখতে পাচ্ছি না। কারণ, যিনি আপত্তি জানিয়েছেন, তাঁকে আমরা ব্যক্তিগত ভাবে চিনিই না।”
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।