ভারতের উচ্চতর বিচারব্যবস্থার গম্ভীর প্রাতিষ্ঠানিক আবরণের আড়ালে বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে কতটা টানাপড়েন চলে? সরকারের সঙ্গে আলোচনার সীমা কোথায় শেষ হয়, কোথা থেকে শুরু হয় বিচারবিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ? সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সঞ্জয় কিষাণ কউলের স্মৃতিকথা ‘উইদাউট ফিয়ার অর ফেভার’ এই অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলিকেই সামনে এনেছে। জাগারনট প্রকাশিত বইটিতে দুই দশকের বেশি বিচারজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি তুলে ধরেছেন প্রতিষ্ঠানের শক্তি, দুর্বলতা এবং ভিতরের নীরব ক্ষমতার লড়াই।

সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের উপলব্ধ অংশে কউল জানিয়েছেন, স্মৃতিকথা লিখবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধা ছিল। কারণ, লিখতে গেলে এমন বহু মানুষের প্রসঙ্গ আসত, যাঁদের সঙ্গে তিনি কাজ করেছেন এবং যাঁরা বিচারব্যবস্থার অংশ। কিছুটা সময় পেরোলে ঘটনাগুলিকে আরও নিরাসক্তভাবে দেখা সম্ভব হবে ভেবেই অপেক্ষা করেছিলেন। গত তিন বছরে সংশ্লিষ্ট অনেকেই অবসর নিয়েছেন। ফলে এখন বিষয়গুলি নিয়ে কথা বলতে তিনি তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীন বোধ করছেন।

কউলের বক্তব্য, বিচারব্যবস্থা নিয়ে নানা মহলে অবিরাম আলোচনা হয়, যার অনেকটাই অনুমাননির্ভর। অথচ ভিতর থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে দেখার অভিজ্ঞতা জনপরিসরে খুব কম আসে। নিজের বিবরণ দিয়ে সেই শূন্যস্থান কিছুটা পূরণ করতে চেয়েছেন তিনি। তাঁর আশা, বইটি পড়ে সরকার এবং বিচারবিভাগ উভয়েই আত্মসমীক্ষা করবে। সাধারণ মানুষের বিচারব্যবস্থার উপর গভীর বিশ্বাস এখনও অটুট বলেই তিনি মনে করেন। সেই আস্থা ধরে রাখা বিচারপতিদের দায়িত্ব; আরও কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রয়োজনও সেখানেই।

সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে তাঁর আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে নিয়োগের পদ্ধতি। সাক্ষাৎকারে কউল জানান, প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের কাছে তাঁর প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল। দ্বিতীয় প্রবীণতম বিচারপতি হিসেবে প্রধান বিচারপতিকে সহযোগিতা করাই নিজের ভূমিকা বলে মনে করতেন। কিন্তু সরকারের সঙ্গে, বিশেষত বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে, আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন ছিল বলে তাঁর ধারণা। মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল সেই জায়গায়।

একটি ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি জানান, কলেজিয়াম পাঁচটি নামের বিষয়ে একমত হলেও শেষ মুহূর্তে একটি ষষ্ঠ নাম সামনে আসে। তাঁর এবং অন্য সদস্যদের কাছে সেটি গ্রহণযোগ্য ছিল না। সরকারের সঙ্গে আগে আলোচনা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করেছিলেন কউল। তবে এই প্রবণতাকে তিনি শুধু চন্দ্রচূড়ের আমলে সীমাবদ্ধ রাখেননি; তাঁর বক্তব্য, আগেও এমন হয়েছে, পরেও হয়েছে। এই ধারাবাহিকতাই তাঁকে উদ্বিগ্ন করে।

মামলা বণ্টন নিয়েও তাঁর অসন্তোষ রয়েছে। কউল জানান, অর্থপাচার প্রতিরোধ আইনসংক্রান্ত মামলা তাঁর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ থেকে অন্য বেঞ্চে যাওয়ার খবর তাঁকে বিচলিত করেছিল। পরে তাঁকে নিয়েই নতুন বেঞ্চ গঠিত হয়। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনায় তাঁকে সতর্ক থাকতে এবং মধ্যপন্থা নিতে বলা হয়েছিল। ঘটনাও তাঁদের সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ায়।

এই বিতর্কে চন্দ্রচূড়ের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, বইটি না পড়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া দেওয়া সম্ভব নয়। তবে কলেজিয়ামের বৈঠকগুলিকে তিনি সৌহার্দ্যপূর্ণ, যুক্তিপূর্ণ আলোচনা হিসেবে স্মরণ করেন। কউলের বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার কোনও ঘটনা তাঁর মনে পড়ছে না। প্রস্তাবগুলিতে নথিভুক্ত ভিন্নমতের কথাও মনে করতে পারেননি। তাঁর যুক্তি, নিয়োগে সরকারের ভূমিকা রয়েছে এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সরকারের আলোচনা হয়। ফলে কউলের স্মৃতিচারণকে সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্যের পাশেই বিচার করতে হবে।

কউল নিজেও সরকারের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করার পক্ষপাতী নন। একটি সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত বইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর আপত্তি পরামর্শ এবং আগাম অনুমোদনের সীমারেখা মুছে যাওয়ায়। কলেজিয়াম কোনও নাম আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করার আগেই সরকারের সম্মতি নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানের অবস্থান দুর্বল হয় বলে তাঁর মূল্যায়ন। পাশাপাশি তিনি মনে করেন, আদালত সরকারের ক্ষমতার উপর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ রাখলেও বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের সহায়ক বাহিনী হয়ে উঠতে পারে না।

নিয়োগ আটকে থাকার একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ উঠে এসেছে তাঁর সাক্ষাৎকারে। আইনজীবী সৌরভ কিরপালের নাম পুনরায় সুপারিশ করার পরও নিয়োগ হয়নি। কউলের দাবি, প্রকাশ্যে সমকামী পরিচয় জানানো একজন বিচারপতিকে গ্রহণ করার জন্য দেশ প্রস্তুত নয় বলে সরকারি স্তরে তাঁদের জানানো হয়েছিল। বিদেশি সঙ্গী নিয়ে আপত্তিও ছিল। কউলের মূল্যায়ন, কিরপালের যৌন পরিচয় এই বাধার মূল কারণ। এটি তাঁর বক্তব্য; সরকারের স্বাধীনভাবে যাচাই করা স্বীকারোক্তি নয়।

সংস্কারের প্রশ্নে কউল কলেজিয়ামকে ত্রুটিমুক্ত বলে রক্ষা করেননি। তিনি বলেন, ব্যবস্থাটি ক্রমশ প্রধান বিচারপতিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। সরকারের সঙ্গে আলোচনায় অন্য সদস্যেরা অনেক সময় অন্ধকারে থাকেন। তাঁর মতে, জাতীয় বিচারপতি নিয়োগ কমিশন বা এনজেএসি সংশোধিত কাঠামোয় কাজ করার সুযোগ পেতে পারত। কলেজিয়ামের সদস্যদের যুক্ত রেখে সরকারের সঙ্গে একই টেবিলে আলোচনা হলে প্রক্রিয়াটি ভিন্ন হতে পারত বলে মনে করেন তিনি।

এই বক্তব্যগুলির তাৎপর্য বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে প্রচলিত বিতর্কের চেয়ে বিস্তৃত। কেবল সরকারের চাপ থাকলেই পুরো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না; সেই চাপ মোকাবিলায় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিদ্ধান্তগ্রহণ কতটা সম্মিলিত, সেটিও জরুরি প্রশ্ন। আবার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মত হওয়ার নথি থাকলেই সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগের সমস্ত মতপার্থক্য মুছে যায় না। কউল ও চন্দ্রচূড়ের বিবরণের ফারাক তাই নথি, স্মৃতি এবং প্রক্রিয়া পাশাপাশি খতিয়ে দেখার প্রয়োজন সামনে আনে।

সব মিলিয়ে কউলের আত্মকথন বিচারব্যবস্থার কাছে একটি আত্মসমীক্ষার উপলক্ষ। প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে তার দুর্বলতা প্রকাশের সম্পর্ক কী হবে, সেই প্রশ্নও এখানে আছে। তাঁর নিজের ঘোষিত উদ্দেশ্য মানুষের আস্থা ধরে রাখা। সেই লক্ষ্য পূরণে স্মৃতিকথার অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক শোরগোলের পাশাপাশি প্রয়োজন নির্দিষ্ট ঘটনাগুলির নিরপেক্ষ পরীক্ষা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়াকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করার আলোচনা। বিচারবিভাগের প্রতি বিশ্বাস টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিষ্ঠানেরও।