প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের দিল্লি সমাবেশকে ‘নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ ও পরিকল্পিত নাটক’ বলে আক্রমণ করলেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা। রবিবার, ১ নভেম্বর, তাঁর অভিযোগ, এই প্রতিবাদের উদ্দেশ্য গণতন্ত্রকে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার হাতে তুলে দেওয়া। একই সঙ্গে সমাবেশের দিন নির্বাচন নিয়ে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে নিশানা করেন তিনি।
নাড্ডার বক্তব্য, ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হিংসার বার্ষিকীতে রাজধানীতে এই কর্মসূচি আয়োজন করে রাহুল শিখদের পুরনো ক্ষতে নুন ছিটিয়েছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলনকে আক্রমণ করতে গিয়ে তিনি দিল্লিতে অশান্তি ছড়ানোর ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তোলেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষতি এবং দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার প্রসঙ্গ।
সাংবাদিকদের সামনে নাড্ডা দাবি করেন, এই সমাবেশের পিছনে রয়েছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বিপন্ন করার ষড়যন্ত্র। তাঁর কথায়, গণতন্ত্রকে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার কাছে সমর্পণ করাই এই কর্মসূচির লক্ষ্য। কংগ্রেসের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও তীব্র কটাক্ষ করেন তিনি। তাঁর দাবি, এই প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত দলের ‘রাজনৈতিক পতনের কফিনে শেষ পেরেক’ হয়ে দাঁড়াবে।
সমাবেশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও গুরুতর অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, দিল্লিতে দাঙ্গা ও অরাজকতা ছড়ানোর ষড়যন্ত্র করে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে সরানোর চেষ্টা চলছে। বিরোধীদের প্রকাশ্য দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ হলেও নাড্ডা সেই কর্মসূচির সঙ্গে সরকার উৎখাতের উদ্দেশ্য জুড়ে দেন। তাঁর বক্তব্যে, নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে প্রতিবাদের আড়ালে রয়েছে আরও বৃহত্তর রাজনৈতিক অভিসন্ধি।
উৎসবের মরসুমে দিল্লির দোকানদার ও ব্যবসায়ীদের রোজগারের প্রসঙ্গও টেনে আনেন নাড্ডা। তাঁর অভিযোগ, রাজধানীতে এই কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁদের উপার্জন ক্ষতিগ্রস্ত করা বিরোধীদের অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে দেশের বদনাম করার অভিযোগ তোলেন তিনি। ফলে তাঁর আক্রমণে একদিকে গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের দাবি, অন্যদিকে সাধারণ ব্যবসায়ীদের জীবিকার প্রশ্ন—দুই বিষয়ই জায়গা পেয়েছে।
তবে নাড্ডার বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ১ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য। দিনটিকে ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের ‘সবচেয়ে কুৎসিত ও অন্ধকার কলঙ্ক’ বলে বর্ণনা করেন তিনি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পরে সংঘটিত ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হিংসার প্রসঙ্গ তুলে কংগ্রেসকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী।
নাড্ডা বলেন, ওই দিন কংগ্রেসের মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীরা নিরীহ শিখদের হত্যা করেছিল। তাঁর ভাষায়, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ শিখ পরিবার রাতারাতি ঘরছাড়া হয়ে যায়। সেই বিপর্যয়ের স্মৃতির সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক কর্মসূচিকে যুক্ত করে তাঁর অভিযোগ, এমন একটি দিনে দিল্লিতে সমাবেশ আয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত শিখ পরিবারগুলির যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দেওয়ার শামিল।
রাহুল গান্ধীর প্রতি নাড্ডার আক্রমণের কেন্দ্রে তাই ছিল প্রতিবাদের বিষয়বস্তুর পাশাপাশি তার সময় নির্বাচনও। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শিখবিরোধী হিংসার স্মৃতিবাহী দিনে এই কর্মসূচি নেওয়ার মধ্যেই কংগ্রেসের অসংবেদনশীলতা প্রকাশ পেয়েছে। ‘ক্ষতে নুন ছিটোনো’ মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিরোধী দলনেতার রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে অতীতের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিও জুড়ে দিয়েছেন।
এই বক্তব্যে নাড্ডা বিরোধীদের দাবির রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত সমাবেশকে তাঁর বর্ণনায় দেখানো হয়েছে বিশৃঙ্খলা তৈরির পরিকল্পনা হিসেবে। পাশাপাশি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ১৯৮৪ সালের হিংসায় মদত দেওয়ার অভিযোগ পুনরায় সামনে এনে বর্তমান আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিতেও আঘাত করেছেন তিনি।
নাড্ডার আক্রমণের মূল সুর ছিল, গণতন্ত্র রক্ষার নামে আয়োজিত এই সমাবেশ আসলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করার রাজনৈতিক কর্মসূচি। অরাজকতা ছড়ানোর অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের উপার্জন ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিসন্ধি এবং শিখবিরোধী হিংসার স্মৃতি—এই তিনটি বিষয়কে একসূত্রে গেঁথে বিরোধী জোটকে নিশানা করেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁর সবচেয়ে তীব্র আক্রমণের মুখে ছিল কংগ্রেস এবং দলের নেতা রাহুল গান্ধী।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।