বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের শেয়ার বাজারে বিপুল সাড়া ফেলল মুকেশ অম্বানীর রিলায়্যান্স গোষ্ঠীর জিয়ো প্ল্যাটফর্মসের প্রথম শেয়ার বিক্রি বা আইপিও। শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর আবেদন গ্রহণ শেষ হওয়ার পরে দেখা যায়, বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট শেয়ারের তুলনায় চাহিদা হয়েছে ২২.১৯ গুণ। সাধারণ আবেদন এবং আগাম প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের চাহিদা মিলিয়ে অঙ্ক পৌঁছেছে প্রায় ৭.৪ লক্ষ কোটি টাকায়। মোট আবেদনের সংখ্যা প্রায় ১.৩৯ কোটি বলে জানিয়েছে একটি সংবাদ সংস্থা ।

তবে এই বিপুল অঙ্কের পুরোটাই জিয়োর হাতে আসছে না। এটি বিনিয়োগকারীরা কত টাকার শেয়ার কিনতে চেয়েছেন, তার হিসাব। আইপিওটির আকার ৩০,২১৩ কোটি টাকা। আগাম প্রাতিষ্ঠানিক বরাদ্দ বাদ দিয়ে আবেদনপর্বে প্রায় ১৯.৭৫ কোটি শেয়ারের বিপরীতে চাওয়া হয়েছে ৪৩৮.৩ কোটি শেয়ার। এই অংশেই আবেদনের মূল্য ছাড়িয়েছে ৪.৯ লক্ষ কোটি টাকা।

এই শেয়ার বিক্রির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, সম্পূর্ণ অর্থই নতুন শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে তোলা হচ্ছে। মূল সংস্থা রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিজ কিংবা অন্য বর্তমান অংশীদারেরা নিজেদের শেয়ার বিক্রি করছেন না। ফলে সংগৃহীত অর্থ যাবে সংস্থার কাছেই। বুধবার আবেদন গ্রহণ শুরুর মাত্র ১০০ মিনিটের মধ্যেই সম্পূর্ণ আইপিওর সমপরিমাণ চাহিদা তৈরি হয়েছিল।

চাহিদার প্রধান চালিকাশক্তি বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। তাঁদের জন্য সংরক্ষিত অংশ প্রায় ৭০ গুণ পূর্ণ হয়েছে। সাধারণ ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের অংশে আবেদন এসেছে ২.৭২ গুণ। অন্য দিকে, অপ্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ অংশে আবেদন এসেছে ১৪ গুণ। বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের সংরক্ষিত অংশ পূর্ণ হয়েছে ৭.৬০ গুণ এবং কর্মীদের জন্য রাখা অংশে চাহিদা হয়েছে ২.৯৩ গুণ। সব শ্রেণিতেই সাড়া মিললেও এই ব্যবধান দেখাচ্ছে, সামগ্রিক চাহিদার তীব্রতা মূলত বড় লগ্নিকারীদের আগ্রহ থেকেই তৈরি হয়েছে। ফলে মোট সাবস্ক্রিপশনের হার দিয়ে ছোট বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের মাত্রা বোঝা যাবে না।

প্রতি শেয়ারের মূল্যসীমা ছিল ১,০৬৫ থেকে ১,১১৯ টাকা। সর্বোচ্চ দরের হিসাবে জিয়োর মূল্যায়ন দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১০.৩ লক্ষ কোটি টাকা। আগামী ২৮ অক্টোবর শেয়ার বাজারে সংস্থাটির লেনদেন শুরু হওয়ার কথা। তার আগে ১৯ অক্টোবর আগাম প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৮,১১০ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিল এলআইসি, ব্ল্যাকরক এবং ফিডেলিটির মতো বড় প্রতিষ্ঠান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রোকারেজ সংস্থাগুলির আগ্রহের পিছনে রয়েছে টেলিকম ব্যবসায় জিয়োর শক্তিশালী অবস্থান, মুনাফার উন্নতি এবং নতুন ব্যবসা বাড়ানোর সম্ভাবনা। বাড়ির ব্রডব্যান্ড সংযোগ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি পরিষেবা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পরবর্তী বৃদ্ধির ক্ষেত্র হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

আইপিওর অর্থের মধ্যে ২৭,৫০০ কোটি টাকা ঋণ শোধে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, নতুন মূলধনের বড় অংশ দিয়ে আর্থিক দায় কমাতে চাইছে জিয়ো। বাকি অর্থ নির্ধারিত সীমার মধ্যে সংস্থার সাধারণ ব্যবসায়িক প্রয়োজনে ব্যয় করা হবে। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই ঋণমুক্ত সংস্থা হয়ে ওঠার লক্ষ্যের কথা জানিয়েছে।

জিয়োর এই সাফল্য এসেছে বাজারের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে। চড়া অশোধিত তেলের দাম, মূল্যবৃদ্ধি, বন্ডের আয় বৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদের চাপ রয়েছে। ২০২৬ সালে সেনসেক্স প্রায় ১৫ শতাংশ নেমেছে। সেই পটভূমিতে এত বড় শেয়ার বিক্রিতে বিপুল আগ্রহ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি দেখাচ্ছে, বাজারে সামগ্রিক উদ্বেগ থাকলেও নির্দিষ্ট বৃহৎ সংস্থায় বিনিয়োগের প্রবল চাহিদা রয়েছে।

অর্থ সংগ্রহের আকারেও জিয়ো ছাড়িয়ে গিয়েছে ২০২৪ সালের হুন্ডাই মোটর ইন্ডিয়ার ২৭,৮৭০ কোটি টাকার আইপিওকে। ২০১৬ সালে পরিষেবা চালুর পরে সস্তা ডেটা এবং দ্রুত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভারতের টেলিকম বাজার বদলে দিয়েছিল জিয়ো। এখন বিপুল গ্রাহকভিত্তিকে কাজে লাগিয়ে বৃহত্তর ডিজিটাল ব্যবসা গড়তে চাইছে সংস্থাটি। রেকর্ড আবেদন সেই পরিকল্পনায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের প্রমাণ; বাজারে তালিকাভুক্তির পরে নজর থাকবে ব্যবসার বৃদ্ধি এবং ঋণ কমানোর লক্ষ্যে অগ্রগতির দিকে।