বাংলাস্ফিয়ার: ‘তোমাদের মুখ দেখা গিয়েছে, ওখান থেকে বেরিয়ে যাও।’ টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলি চালানোর পরে পালানোর সময় এমনই সতর্কবার্তা পেয়েছিল এক অভিযুক্ত। পুলিশের সন্দেহ, টেলিভিশনের সংবাদ সম্প্রচার দেখে হামলাকারীদের পরিচালকেরা তাদের ফোন ও বার্তায় তদন্তের অগ্রগতি জানাচ্ছিল। ফলে পুলিশ কত দূর পৌঁছেছে, তা জেনে নিজেদের গতিবিধি বদলানোর সুযোগ পাচ্ছিল অভিযুক্তেরা।
পুলিশ সূত্রের দাবি, ঘটনাস্থলে পাপারাৎজি ও ভ্লগারদের তোলা ভিডিয়ো থেকে অভিযুক্তদের মুখ টিভিতে দেখানোর পরেই সতর্কবার্তা যায় রেহান আনসারির কাছে। আন্ধেরিতে মোটরবাইক খুঁজে পাওয়ার খবর এবং অভিযুক্তদের ট্রেনে ওঠার তথ্যও পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। সিসিটিভিতে রেহানকে বারবার ফোন ব্যবহার করতে দেখা যায়। গ্রেফতারের পরে তাঁদের কথোপকথনের কিছু অংশ তদন্তকারীদের হাতে এসেছে।
তবে বার্তাপ্রেরকের পরিচয় নিশ্চিত হয়নি। সন্দেহের তালিকায় রয়েছে আমেরিকায় আত্মগোপন করে থাকা বলে মনে করা অনিল পণ্ডিত এবং সোনিপতে ধৃত অঙ্কিত খাটক ও সমীর খত্রী। পুলিশের ধারণা, শেষের দু’জন পণ্ডিতের সঙ্গে হামলাকারীদের যোগাযোগ রাখত। কোন অ্যাপ ব্যবহৃত হয়েছিল, তা প্রকাশ করেনি পুলিশ। মুম্বইয়ের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার অনিল কুম্ভারের বক্তব্য জানতে চাইলেও সাড়া পায়নি সংবাদপত্রটি।
ঘটনাটি ঘটে ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায়, মুম্বইয়ের জুহুতে। পুষ্পা নারসি পার্কে ফুটবল খেলে বেরোনোর পরে অভিনেতার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চলে। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, রেহান ও ফুল সিংহ গুলি চালায়; মোটরবাইক চালাচ্ছিল হৃতিক মাহাতো। অভিনেতার গায়ে গুলি লাগেনি। তাঁর গাড়িচালক ফিরদৌস ইব্রাহিম বালোচের বাঁ হাতে গুলি লাগে। অভিনেতার ছবি তুলতে থাকা ভ্লগার উমেশ চৌহানও গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশের দাবি, হামলার সময় একটি আগ্নেয়াস্ত্র আটকে যায়। রেহান ও ফুল সিংহ হরিয়ানার সোনিপতের বাসিন্দা, দু’জনের বয়স ১৮। বাইশ বছরের হৃতিক বিহারের বেগুসরাইয়ের বাসিন্দা; মুম্বইয়ে বাইক-ট্যাক্সি চালাত।
পালানোর পথ পুনর্গঠন করে পুলিশ জানতে পারে, তিনজন প্রথমে মোটরবাইকে আন্ধেরি স্টেশনে যায়। সেখান থেকে লোকাল ট্রেন ধরে বরিভলির দিকে রওনা হয়। পরে সুরাতে যাওয়ার জন্য ভাড়ার গাড়ি নেয়। কিন্তু সেই গাড়ি পৌঁছতে দেরি হওয়ায় এক অভিযুক্ত চালককে ফোন করে নিজেদের অবস্থান জানায়। এই ফোনই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে।
তদন্তকারীদের বক্তব্য, সিসিটিভি দেখে সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করার পর প্রযুক্তিগত তথ্যের সাহায্যে তাঁদের ব্যবহৃত ফোনের সন্ধান মিলেছিল। কিন্তু ফোন বন্ধ থাকায় অনুসরণ করা কঠিন হচ্ছিল। চালককে করা সংক্ষিপ্ত কলটির পর ফের ফোন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ততক্ষণে অবশ্য চালকের নম্বর পেয়ে গিয়েছিল পুলিশ।
পুলিশ ওই চালকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারে, তিনি তিনজনকে সুরাতের বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিয়েছেন। সেখানকার সিসিটিভি দেখে তাঁদের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। বাসের অপেক্ষায় থাকার পরে অভিযুক্তেরা রেলস্টেশনে গিয়ে পুণে–জয়পুর ট্রেনে ওঠে। প্ল্যাটফর্মের ক্যামেরা থেকে কোন কামরায় তারা উঠেছিল, সেটিও জানা যায়।
এরপর মুম্বই পুলিশ কোটার পুলিশকে সতর্ক করে। সোমবার সকালে স্টেশনের প্রবেশপথ, প্ল্যাটফর্ম ও আশপাশে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ট্রেন পৌঁছলে সাধারণ কামরায় অভিযুক্তদের শনাক্ত করে ঘিরে ফেলে পুলিশ। কোটার পুলিশ সুপার তেজস্বিনী গৌতমের বক্তব্য অনুযায়ী, ধৃতদের পরিকল্পনা ছিল জয়পুর থেকে দিল্লি হয়ে নেপালে পালানো। গ্রেফতারের সময় তাঁদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যায়নি।
হামলার আগের প্রস্তুতি নিয়েও মিলেছে তথ্য। রেহান ও ফুল সিংহ আন্ধেরি পূর্বের একটি হোটেলে ভুয়ো আধার কার্ড ব্যবহার করে উঠেছিল বলে পুলিশের অভিযোগ। ১৪ অক্টোবর নেওয়া ঘরটির দৈনিক ভাড়া ছিল দেড় হাজার টাকা। তদন্তকারীদের দাবি, মুম্বইয়ের কাছের জঙ্গলে গুলি চালানোর অনুশীলনের সময় একটি পিস্তল আটকে যায়। পরে হোটেলের ঘরে আটকে থাকা গুলি বার করার চেষ্টায় সেটি থেকে গুলি বেরিয়ে যায়।
যদিও হোটেলের কর্মীরা পুলিশকে জানিয়েছেন, তাঁরা গুলির শব্দ শোনেননি। ১৮ অক্টোবর বিকেলে অভিযুক্তদের হোটেলের পিছনের দরজা দিয়ে বেরোতে দেখা যায় সিসিটিভিতে। কর্মীদের না জানিয়েই তারা চলে যায়। পুলিশ ঘরটি সিল করে বুকিং রেজিস্টার, নথিপত্র, পোশাক ও ফেলে যাওয়া একটি ছোট ব্যাগ বাজেয়াপ্ত করেছে। সংশ্লিষ্ট হোটেলের ম্যানেজারের বক্তব্য, অভিযুক্তেরা আধারের ছবি মোবাইলে দেখিয়ে পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছিল। সেই ছবির প্রিন্ট নিয়েই ঘর দেওয়া হয়।
অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে তদন্ত পৌঁছেছে দিল্লি ও হরিয়ানাতেও। দিল্লি পুলিশের দাবি, কুণাল নামে এক অভিযুক্ত অমৃতসর থেকে একটি পিস্তল ও ২০টি কার্তুজ সংগ্রহ করেছিল। পরে রাধা ও ববিতা নামে দুই মহিলার মাধ্যমে অস্ত্র মুম্বই পাঠানো হয়। দু’জনই সোনিপতে কাজ করতেন। পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, অস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁদের টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
১৫ অক্টোবর দিল্লি থেকে রওনা হয়ে তাঁরা ১৭ অক্টোবর দাদরে পৌঁছন। হোটেলের কাছে এক নাবালকের হাতে অস্ত্রভর্তি ব্যাগ তুলে দেওয়া হয় বলে তদন্তকারীদের দাবি। হামলার দিনই দুই মহিলা দিল্লির ট্রেন ধরেন। পরে তাঁদের এবং কুণাল ও সুমিতকে গ্রেফতার করে দিল্লি পুলিশের বিশেষ শাখা।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, অভিযুক্তেরা মুম্বইয়ে থাকার সময় সলমন খান, আমির খান ও রণবীর সিংহের আবাসনের কাছেও গিয়েছিল। তবে ওই অভিনেতাদের হামলার লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল, নাকি কৌতূহলবশত সেখানে গিয়েছিল তারা, তা পুলিশ এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি। কয়েকজন অভিনেতার বাড়ির নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এই অনিশ্চয়তা তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ: কোনও বাড়ির কাছে যাওয়ার তথ্য থেকেই সেখানে হামলার পরিকল্পনা ছিল বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।
এই মামলায় এখনও পর্যন্ত দশজন গ্রেফতার হয়েছে। মূল তিন অভিযুক্তের পুলিশ হেফাজত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। অনিল পণ্ডিত সমাজমাধ্যমে হামলার দায় স্বীকার করলেও সেই দাবির সত্যতা যাচাই হয়নি। টিভির খবর দেখে সতর্কবার্তা পাঠানোর অভিযোগটিও তদন্তাধীন।