বাংলাস্ফিয়ার: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর বাতিল এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, মধ্য দিল্লিতে মিছিল করলেন প্রায় ৫০০ বিক্ষোভকারী। ‘পিপল এগেনস্ট এসআইআর’ মঞ্চের ব্যানারে এই মিছিলে যোগ দেন ছাত্র, যুব, মহিলা, কৃষক ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা। এসআইআরের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে চলা ধারাবাহিক প্রতিবাদের অংশ হিসেবেই এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় ২০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করার পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও বিক্ষোভকারীদের দাবি, প্রায় ৫০ জনকে আটক করা হয়েছিল। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারায় জারি করা নিষেধাজ্ঞা অমান্যের অভিযোগে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অন্তত একটি এফআইআর দায়ের করেছে পুলিশ।
জাতীয় পতাকা, ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভকারীরা কালী বাড়ি মার্গ ও ভাই বীর সিং মার্গের সংযোগস্থলে গোল ডাকখানা মোড়ের কাছে জমায়েত হন। সেখান থেকে তাঁরা নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরের দিকে মিছিল করার চেষ্টা করেন। দুপুর ১টায় বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছিল। তার আগে থেকেই বাংলা সাহিব গুরুদ্বারের আশপাশে ছোট ছোট দলে জড়ো হতে থাকেন অংশগ্রহণকারীরা।
মিছিলে যোগ দেন রাজনৈতিক কর্মী যোগেন্দ্র যাদব, সিপিআই নেত্রী অ্যানি রাজা এবং সারা ভারত কৃষকসভার সহ-সভাপতি ইন্দ্রজিৎ সিং। অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন, স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া, ক্রান্তিকারী যুব সংগঠন এবং অল ইন্ডিয়া ডেমোক্র্যাটিক স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন-সহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে যোগেন্দ্র যাদব বলেন, প্রতিবাদস্থল হিসেবে যন্তর মন্তরের স্বীকৃতি প্রত্যাহার-সহ নানা বিধিনিষেধ সত্ত্বেও আন্দোলন চলবে।
তাঁর কথায়, “প্রতিবাদ চলবে। আপনারা একটি যন্তর মন্তর বন্ধ করলে আরও শত শত যন্তর মন্তর গড়ে উঠবে। একজনকে চুপ করানোর চেষ্টা করলে মানুষ চুপ করে থাকবে না। ব্যক্তি ও সংগঠন বদলাতে পারে, কিন্তু আন্দোলন চলবে। জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা প্রতিবাদ চালিয়ে যাব।”
ইন্দ্রজিৎ সিং জানান, দিল্লিতে আগের বিক্ষোভগুলিতে অংশগ্রহণকারীদের, বিশেষত মহিলাদের হেনস্থা করার ঘটনার পরেই সংযুক্ত কিসান মোর্চা এই আন্দোলনকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
তিনি বলেন, “আমাদের তরুণদের সঙ্গে, বিশেষ করে মহিলা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যা হয়েছে, তাতে আমরা ক্ষুব্ধ। তাঁদের মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে, জামাকাপড় ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে। আর নয়। এসআইআর বাতিল না হওয়া পর্যন্ত, ভোটাধিকার সুরক্ষিত না হওয়া পর্যন্ত এবং যন্তর মন্তরে প্রতিবাদের অধিকার ফিরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত আমরা এই আন্দোলনকে সমর্থন করে যাব।”
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কার্যধারায় বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে পুলিশের হাতে ক্ষমতা দেওয়ারও বিরোধিতা করেন ইন্দ্রজিৎ। তাঁর যুক্তি, এই ব্যবস্থায় পুলিশের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এখন বিচারকও ওরা, আইনজীবীও ওরা, আদালতটাও ওদের। ফলে আমাদেরই অপরাধী ঘোষণা করা হবে, এটাই তো স্বাভাবিক।”
অ্যানি রাজা অভিযোগ করেন, সাংবিধানিক সুরক্ষাগুলিকে দুর্বল করতে কেন্দ্র এসআইআরকে ব্যবহার করছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত প্রতিবাদ চলবে বলেও জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্য, “সংবিধানকে দুর্বল করার জন্য নরেন্দ্র মোদী সরকার এসআইআরকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। এ দেশের মানুষ তা হতে দেবেন না। সেই কারণেই আমরা প্রতিবাদ জানিয়ে চলেছি। আজ আমরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দফতরের খুব কাছে পৌঁছেছি। শীঘ্রই আমরা সেখানেও পৌঁছে তাঁকে চলে যেতে বলব।”
অ্যানি আরও বলেন, “কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, উত্তর-পূর্ব থেকে গুজরাত—সর্বত্র মানুষ নিজেদের যন্তর মন্তর গড়ে তুলছেন। কর্তৃপক্ষ একটি প্রতিবাদস্থলে বিধিনিষেধ চাপালেও মানুষ নিজেদের কথা শোনানোর পথ খুঁজে নেবেন।”
বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন বেঙ্গালুরুর তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী সুভাষ মিশ্রও। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। সুভাষের বক্তব্য, রাজনৈতিক আলোচনা ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ না রেখে নাগরিকদের প্রকাশ্য প্রতিবাদে অংশ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “প্রশান্ত ভূষণ, অভিজিৎ দিপকে এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী প্রত্যেকের পাশে দাঁড়াতে আমি এখানে এসেছি। আলোচনা শুধু বসার ঘর আর হোয়াটসঅ্যাপ গোষ্ঠীর মধ্যে আটকে থাকতে পারে না। মানুষকে বাড়ি থেকে বেরোতে হবে। আমরা যদি কেবল নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করি, তা হলে কিছুই বদলাবে না।”
তিনি আরও বলেন, “যে ভাবে সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কাকে এক সপ্তাহ জেলে রাখা হয়েছিল, তা স্বৈরাচারী আচরণ। মানুষের এখন রাস্তায় নেমে প্রতিবাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করার সময় এসেছে।”
বিক্ষোভকারীরা নির্বাচন কমিশনের দিকে এগোতে শুরু করলেও প্রায় ৫০০ মিটার যাওয়ার পরে অশোকা রোডে একাধিক ব্যারিকেড ও নিরাপত্তারক্ষীদের বাধার মুখে পড়েন। তাঁরা কিছুক্ষণের জন্য রাস্তায় বসে পড়েন। পুলিশ তখন বিএনএসএসের ১৬৩ ধারায় জারি করা নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়ে তাঁদের সতর্ক করে।
এর পরে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ঠেলে মূল রাস্তার দিকে ফিরিয়ে দেয়। বাঁশি বাজিয়ে এবং বারবার নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়ে পুলিশকর্মীরা সতর্ক করেন, বিধিনিষেধ অমান্য করলে আটক করা হবে। স্লোগান চলতে থাকার মধ্যেই গোল ডাকখানা মোড়ের কাছে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে দু’টি গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
অন্য দিকে, সংযুক্ত কিসান মোর্চা জানিয়েছে, এসআইআর বাতিল এবং জ্ঞানেশ কুমারকে বরখাস্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চালানোর দাবিতে দেশের বিভিন্ন জেলা ও তহসিল সদরে কৃষকেরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। জেলাশাসক ও মহকুমাশাসকদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর উদ্দেশে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন কৃষক প্রতিনিধিরা।
এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, “বহু জায়গায় পুলিশ প্রতিবাদ আটকানোর চেষ্টা করেছে। সকাল থেকেই নেতাদের গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে, বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার পথে অংশগ্রহণকারীদের আটক করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও হরিয়ানায়, বিশেষত বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে, নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।”
প্রতিবাদস্থল হিসেবে যন্তর মন্তরের স্বীকৃতি প্রত্যাহার করে দিল্লি পুলিশ যে নির্দেশ জারি করেছে, তা বাতিল করারও দাবি জানিয়েছে সংযুক্ত কিসান মোর্চা।
গত সপ্তাহে দিল্লিতে ২০০-র বেশি সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে জরুরি আলোচনার পরে ‘পিপল এগেনস্ট এসআইআর’ মঞ্চ গঠিত হয়। তার পরেই ২৩ অক্টোবরের এই কর্মসূচি পালিত হল। দেশের ১৮টি রাজ্যের মোট ১৪৫টি নাগরিক সংগঠন, কৃষক ইউনিয়ন, শ্রমিক সংগঠন এবং মহিলা ও যুব সংগঠনকে একত্র করেছে এই মঞ্চ।