বাংলাস্ফিয়ার: অরুণাচল প্রদেশের একাধিক জায়গায় ভারতীয় ও চিনা বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থান এখনও চলছে বলে আইটিবিপি প্রধানের বক্তব্য ঘিরে কেন্দ্রের উপর চাপ বাড়াল কংগ্রেস। সীমান্তের প্রকৃত পরিস্থিতি এবং ভারতীয় বাহিনীর টহল দেওয়ার অধিকার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে অবিলম্বে ব্যাখ্যা চেয়েছে বিরোধী দল। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, চিনা বাহিনী প্রতিষ্ঠিত টহল-পদ্ধতি থেকে সরে গেলে মাঝেমধ্যেই সীমান্তে অশান্তি তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামলাতে সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনা চলছে।

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর রাজস্থানের আলওয়ারে আইটিবিপি জওয়ানদের বার্ষিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বাহিনীর মহানির্দেশক শত্রুজিৎ কপূর জানান, সম্প্রতি অরুণাচলের কয়েকটি জায়গায় মুখোমুখি অবস্থানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং তা এখনও অব্যাহত। সেখানে নবগঠিত শৌর্য কমান্ডো দলগুলির ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি। সীমান্তে উত্তেজনার খবরের মধ্যে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষকর্তার এই প্রকাশ্য বক্তব্য ঘটনাটিকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে। তবে কপূর নির্দিষ্ট সংঘাতস্থলগুলির নাম বা ঘটনাগুলির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেননি।

শুক্রবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি বরাবর ভুল বোঝাবুঝি এবং পরিস্থিতির ভুল মূল্যায়ন এড়াতে দুই দেশ প্রচলিত সামরিক ও কূটনৈতিক ব্যবস্থাগুলি ব্যবহার করছে। বকেয়া সমস্যার সমাধানও এই আলোচনার উদ্দেশ্য। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে উপযুক্ত এলাকাগুলিতে এলএসি সম্পর্কে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও স্পষ্ট করার উপায় নিয়ে আলোচনায় সম্মত হয়েছে ভারত ও চিন।

জয়সওয়াল একই সঙ্গে ভারতের পরিচিত অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন: সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় থাকা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক উন্নতির জন্য অপরিহার্য। তবে অরুণাচলে কোথায়, কতগুলি জায়গায় এবং কী ধরনের মুখোমুখি অবস্থান চলছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি। সামরিক ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নির্দিষ্ট প্রশ্নের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। ফলে সরকারের ব্যাখ্যায় আলোচনা চলার কথা স্পষ্ট হলেও মাটির পরিস্থিতির সম্পূর্ণ ছবি পাওয়া যায়নি।

এই উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে আপার সুবনসিরি জেলার দুর্গম তাকসিং এলাকা। সেখানে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ৬ সেপ্টেম্বর ভারতীয় ভূখণ্ডের ওয়াচা–দামাই সীমান্ত বৈঠকস্থলে দুই দেশের কোর কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনা হয়েছিল। তার আগে স্থানীয় কমান্ডারদের মধ্যেও একাধিক বৈঠক হয়। সংবাদসূত্র অনুযায়ী, উত্তেজনা যাতে আরও না বাড়ে, সে জন্য এলাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয় সেনা মোতায়েন রয়েছে। সেই বৈঠকের এক মাসেরও বেশি পরে কপূরের বক্তব্য সামনে এল।

কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে পরিস্থিতিকে গভীর উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর প্রশ্ন, ডোকলাম ও গালওয়ানের পরে আবার কি বড় ধরনের সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে? তাকসিংয়ের কাছে চিনা তৎপরতার খবর এবং সামরিক বৈঠকের পরেও মুখোমুখি অবস্থান চললে তার ব্যাখ্যা কী? ভারতীয় বাহিনীর টহল দেওয়ার সুযোগ কোথাও বাধাগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

খাড়গে আরও জানতে চেয়েছেন, মোদী ও চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের একাধিক সাক্ষাৎ, বিশেষ প্রতিনিধিদের আলোচনা এবং সীমান্তবিষয়ক সমন্বয় বৈঠক থেকে বাস্তবে কী ফল মিলেছে। ২০২০ সালের মে মাসের আগের টহল-অধিকার সম্পূর্ণ ফিরেছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। সশস্ত্র বাহিনীর উপর পূর্ণ আস্থা জানিয়ে তাঁর দাবি, সরকার সংসদ এবং দেশবাসীকে প্রকৃত পরিস্থিতি জানাক। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে রাজনৈতিক প্রচারের চেয়ে জবাবদিহিকেই অগ্রাধিকার দিতে বলেছেন কংগ্রেস সভাপতি। দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছেও জানতে চেয়েছে, অরুণাচলের এলাকায় ভারতীয় জওয়ানদের টহল দিতে চিন বাধা দিয়েছে বলে যে খবর এসেছে, তার সত্যতা কী।

কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশও প্রধানমন্ত্রীর নীরবতার সমালোচনা করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যের উল্লেখ করে তাঁর অভিযোগ, অরুণাচলের কয়েকটি টহলস্থলে ভারতের প্রবেশাধিকার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। চিনের অরুণাচলের স্থাননাম পরিবর্তন এবং বড় বাঁধ নির্মাণের বিষয়টিও তুলেছেন তিনি। পাশাপাশি চিনের সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি বৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখিয়েছে কংগ্রেস। তবে টহলস্থলের নিয়ন্ত্রণ হারানোর অভিযোগকে বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্যে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বিরোধীদের এই অভিযোগ এবং সরকারের দেওয়া তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

সীমান্ত পরিস্থিতির পাশাপাশি আইটিবিপির প্রস্তুতি নিয়েও বিস্তারিত বলেছেন কপূর। উঁচু পার্বত্য এলাকায় অভিযানের জন্য বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন বাহিনী গড়ে তোলার কাজ চলছে। বিভিন্ন ব্যাটালিয়নে শৌর্য কমান্ডো দল তৈরি করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে পূর্ণাঙ্গ বিশেষ ব্যাটালিয়ন গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আধুনিক যুদ্ধের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও সুরক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রয়োজনের কথাও জানিয়েছেন তিনি।

ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী প্রযুক্তিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে আইটিবিপি। কপূরের বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্তরক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যাটালিয়নগুলিতে ড্রোন প্লাটুন গড়া হয়েছে এবং কর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ৪০০ কোটি টাকার আধুনিকীকরণ তহবিলের প্রায় ৭০ শতাংশ ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে নির্ধারিত হয়েছে। আরও প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার আধুনিকীকরণ পরিকল্পনায় ড্রোন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জন্য ১,০০০ কোটি টাকা রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি।

সামনের সারির সীমান্তচৌকিতে ভূগর্ভস্থ আশ্রয়ও তৈরি করা হচ্ছে, যাতে সংঘাতের সময় জওয়ানদের সুরক্ষা বাড়ে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় থাকার ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যানবাহন চালু রাখার সুবিধা উন্নত করা হচ্ছে। গালওয়ানের মতো পরিস্থিতির মোকাবিলায় বিশেষ প্রশিক্ষণের কথাও জানিয়েছে বাহিনী। এই প্রস্তুতির ঘোষণার মধ্যেই অরুণাচলের চলতি মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে সরকারের কাছে আরও স্পষ্ট তথ্য চাইছে বিরোধীরা।

আপাতত বিদেশ মন্ত্রকের অবস্থান, সীমান্তের সমস্যা মেটাতে আলোচনা এবং সামরিক যোগাযোগের পথ খোলা রয়েছে। কিন্তু কোন কোন এলাকায় টহল নিয়ে বিরোধ চলছে, সাম্প্রতিক বৈঠকে কী অগ্রগতি হয়েছে এবং চলতি মুখোমুখি অবস্থান শেষ করার বিষয়ে কোনও সমঝোতা হয়েছে কি না, শুক্রবারের বক্তব্যে তার নির্দিষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি। এই প্রশ্নগুলিরই প্রকাশ্য ব্যাখ্যা দাবি করছে কংগ্রেস।