বার্ষিক প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার ব্যবসা এবং বিপুল সংখ্যক দুধ উৎপাদককে নিয়ে গড়ে ওঠা বিস্তৃত সংগঠনের সুবাদে মহারাষ্ট্রের বৃহত্তম দুগ্ধ সমবায় ‘গোকুল’ পশ্চিম মহারাষ্ট্রের রাজনীতি ও অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
রাজ্য মন্ত্রিসভা অনুমোদিত প্রস্তাব অনুযায়ী, গোকুলের মতো শীর্ষ সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলির পরিচালন পর্ষদে সরকার চার জন বিশেষজ্ঞ পরিচালক এবং ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদমর্যাদার এক জন আধিকারিক নিয়োগ করতে পারবে। চার জন বিশেষজ্ঞ পরিচালকের ভোটাধিকার থাকবে, তবে তাঁরা চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। জেলা সমবায় ব্যাঙ্কগুলির ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না।
গোকুলের চেয়ারম্যান নির্বাচন নিয়ে চলতে থাকা অচলাবস্থার মধ্যেই এই পদক্ষেপ। কংগ্রেস নেতা সতেজ পাটিলের ‘রাজর্ষি শাহু শেতকারি সমবিচারী আঘাড়ি’ সমবায়ের ২৫টি আসনের মধ্যে ১৩টিতে জয়ী হয়েছে। বিজেপি-নেতৃত্বাধীন মহাযুতি সমর্থিত প্যানেল পেয়েছে ১২টি আসন। কিন্তু চেয়ারম্যান নির্বাচনের জন্য ডাকা পরিচালন পর্ষদের বৈঠকে শাসক জোটের ১২ জন পরিচালকই অনুপস্থিত থাকছেন। ফলে পাটিলের প্যানেল সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও কোরামের জন্য প্রয়োজনীয় ১৪ জন সদস্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারছে না।
মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনে পরাজয় সত্ত্বেও পরিচালন পর্ষদের সদস্যবিন্যাসে প্রভাব খাটানোর একটি সম্ভাব্য পথ খুলে দিচ্ছে মহাযুতির সামনে। সরকারের বিরুদ্ধে দুধ উৎপাদকদের রায়কে খর্ব করার চেষ্টার অভিযোগ তুলে পাটিল জানিয়েছেন, তিনি এই সিদ্ধান্তকে বম্বে হাই কোর্টে চ্যালেঞ্জ করবেন।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ গোকুল
১৯৬৩ সালের ১৬ মার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় কোলহাপুর জেলা সমবায় দুগ্ধ উৎপাদক ইউনিয়ন। তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নামেই প্রতিষ্ঠানটি ‘গোকুল’ নামে পরিচিত। এটি মহারাষ্ট্রের বৃহত্তম দুগ্ধ সমবায়গুলির অন্যতম।
২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার ব্যবসার অঙ্ক দিয়েই গোকুলের প্রভাবের সম্পূর্ণ হিসাব পাওয়া যায় না। আনুমানিক ১,৮১০টি গ্রামে ছড়িয়ে থাকা ৮,০০৯টি প্রাথমিক সমবায় সমিতির মাধ্যমে প্রায় ৪ লক্ষ ৪১ হাজার দুধ উৎপাদক এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত।
রাজনৈতিক ভাষ্যকার বসন্ত ভোঁসলে বলেছেন, প্রান্তিক কৃষক এবং গ্রামীণ পরিবারগুলির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কই এই সমবায়ের গুরুত্বের মূল কারণ। দুধ বিক্রির টাকা সরাসরি মহিলা উৎপাদকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হয়। সংসার চালানোর জন্য এটি তাঁদের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
ফলে গোকুলের নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকা মানে কোলহাপুর এবং সংলগ্ন অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির গভীর পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাওয়া।
বিজেপি কেন গোকুলের নিয়ন্ত্রণ চায়
প্রায় তিন দশক ধরে প্রাক্তন বিধায়ক মহাদেবরাও মহাডিক এবং প্রয়াত কংগ্রেস বিধায়ক পি এন পাটিলের সঙ্গে যুক্ত একটি প্যানেল গোকুল নিয়ন্ত্রণ করত। ২০২১ সালের মে মাসে সতেজ পাটিল, অবিভক্ত জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টির নেতা হাসান মুশরিফ এবং শিবসেনা সাংসদ সঞ্জয় মণ্ডলিকের নেতৃত্বাধীন প্যানেল তাঁদের হাত থেকে সমবায়ের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেয়।
শিবসেনা ও এনসিপি ভেঙে যাওয়ার পরে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়। মুশরিফ বিজেপি-নেতৃত্বাধীন মহাযুতিতে যোগ দেন। তবে প্রথম দিকে সমবায় ক্ষেত্রে পাটিলের সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা বজায় ছিল। শেষ পর্যন্ত সেই বোঝাপড়াও ভেঙে যায়। এক সময়ের দুই সহযোগী চলে যান পরস্পরবিরোধী শিবিরে।
পশ্চিম মহারাষ্ট্রে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ হিসেবে গোকুলের নিয়ন্ত্রণ চাইছে বিজেপি। এই অঞ্চলে সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে কংগ্রেস ও এনসিপির নেতারা দীর্ঘদিন ধরে যথেষ্ট প্রভাব বজায় রেখেছেন।
জুন মাসে একটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, গোকুলের নির্বাচনে মহাযুতির শরিকদের একজোট করতে মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ নিজে হস্তক্ষেপ করেছিলেন। মন্ত্রী, বিধায়ক ও সাংসদদের সমর্থনে জোট একটি অভিন্ন প্যানেল দাঁড় করায়। প্রচারের নেতৃত্বে ছিলেন চিকিৎসাশিক্ষামন্ত্রী মুশরিফ।
শাসক জোট জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী ছিল। কিন্তু ফল হয় উল্টো। পাটিলের প্যানেলের কাছে তারা হেরে যায়। পরাজিতদের মধ্যে ছিলেন মুশরিফের ছেলে নাভিদ এবং বিদায়ী চেয়ারপার্সন শৌমিকা মহাডিক, যিনি বিজেপি নেতা ধনঞ্জয় মহাডিকের স্ত্রী।
এই জয় কোলহাপুরের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সতেজ পাটিলের অবস্থান আরও মজবুত করেছে। প্রাক্তন মন্ত্রী এবং কংগ্রেসের বিধান পরিষদ সদস্য পাটিল স্থানীয় নির্বাচন ও সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলিকে কেন্দ্র করে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছেন। এই অঞ্চলের রাজনীতি ও ব্যবসায় প্রভাবশালী মহাডিক পরিবারের সঙ্গে তাঁর লড়াই বারবার সামনে এসেছে।
এই জয় কংগ্রেসকেও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাফল্য এনে দিয়েছে এমন একটি জেলায়, যেখানে ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দল একটি আসনও জিততে পারেনি।
বৈঠক বয়কট থেকে আইন বদলের উদ্যোগ
নির্বাচনের পরে প্রথম সংঘাত বাধে ২৯ অক্টোবর। সে দিন নবনির্বাচিত পরিচালন পর্ষদ চেয়ারম্যান নির্বাচনের জন্য বৈঠকে বসে। মহাযুতি সমর্থিত ১২ জন পরিচালকই অনুপস্থিত থাকেন। গোকুলের উপবিধি অনুযায়ী, কোরামের জন্য ১৪ জন পরিচালকের উপস্থিতি প্রয়োজন। পাটিলের শিবিরের ১৩ জন উপস্থিত থাকায় বৈঠকের সভাপতিত্বকারী আধিকারিক বৈঠক মুলতুবি করে দেন।
এর পরে ওই ১৩ জন পরিচালক আলাদা বৈঠক করেন এবং শশিকান্ত পাটিল চুয়েকরকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত ঘোষণা করেন। কিন্তু দুগ্ধ সমবায়ের প্রশাসন সেই সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দেয়নি।
পাটিলের প্যানেল বম্বে হাই কোর্টের কোলহাপুর সার্কিট বেঞ্চের দ্বারস্থ হয়। ২ নভেম্বর আদালত নির্দেশ দেয়, ২৫ জন পরিচালককেই নোটিস পাঠিয়ে ১০ নভেম্বর নতুন করে বৈঠক ডাকতে হবে।
মহাযুতি অবশ্য বৈঠক বয়কটের পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, কোরামের শর্ত গোকুলের চালু উপবিধিরই অংশ; নির্বাচনের পরে এই নিয়ম তৈরি করা হয়নি। ৩ নভেম্বর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া একটি যৌথ চিঠিতে বিজেপি, শিবসেনা, এনসিপি ও জনসুরাজ্য পার্টির নেতারা বলেন, পাটিল যেন তাঁর অল্প ব্যবধানে জয়কে নিজের রাজনীতির প্রতি সমর্থন বলে ধরে না নেন।
তাঁদের যুক্তি, দুধ উৎপাদকেরা মহাযুতির ১২ জন পরিচালককেও নির্বাচিত করেছেন। কেবল বিরোধী প্যানেলের কাউকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে সাহায্য করার জন্য এই সদস্যেরা বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন, এমন প্রত্যাশা করা যায় না।
আইন সংশোধনের পথ
বুধবার রাজ্য মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের আগে, ১৬ অক্টোবর মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবিশকে একটি চিঠি দিয়েছিলেন প্রবীণ বিজেপি মন্ত্রী চন্দ্রকান্ত পাটিল। গোকুলের নির্বাচনের তখনও দু’দিন বাকি।
চিঠিতে চন্দ্রকান্ত পাটিল প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যে সব সমবায় প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ব্যবসা ৩,০০০ কোটি টাকার বেশি, সেখানে সরকার-নিযুক্ত পরিচালকের সংখ্যা দুই থেকে বাড়িয়ে চার করা হোক। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান-মনোনীত পরিচালকের সংখ্যাও দুই থেকে চার করার প্রস্তাব দেন তিনি। এর জন্য মহারাষ্ট্র সমবায় সমিতি আইন সংশোধনের প্রয়োজন হবে।
বার্ষিক প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার ব্যবসা করা গোকুল এই শ্রেণির মধ্যেই পড়বে।
প্রস্তাবটি ঘিরে ঘটনাক্রমের দিকে আঙুল তুলে বিরোধীরা অভিযোগ করেছে, নির্বাচনে জিততে না পেরে সরকার গোকুলের পরিচালন পর্ষদের সদস্যবিন্যাস বদলাতে চাইছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন সেই সম্ভাবনাকে এখন আরও বাস্তব করে তুলেছে।
বুধবার সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় সতেজ পাটিল রাজ্য মন্ত্রিসভার পদক্ষেপকে দুর্ভাগ্যজনক বলে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “সরকারের নীতিই যদি হয় মানুষের রায় উপেক্ষা করে নিজেদের ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নেওয়া, তা হলে নির্বাচন করার কোনও মানে হয় না। তার চেয়ে সব নির্বাচন বাতিল করে সরকারি মনোনীত লোক বসিয়ে দেওয়া হোক। তাঁরাই চিনিকল, সুতোকল আর পুরনিগম চালান।”
এই টানাপড়েনের পরবর্তী অধ্যায় ১০ নভেম্বর—সে দিন গোকুলের চেয়ারম্যান নির্বাচনের জন্য পরিচালন পর্ষদের বৈঠক হওয়ার কথা।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।