অগ্নিপথ প্রকল্পে বড়সড় পরিবর্তন এনে তিন বাহিনীতে প্রশিক্ষণরত সমস্ত অগ্নিবীরের জন্য নিয়মিত সৈনিক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পথ খুলে দিল কেন্দ্র। বুধবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে।

নতুন ব্যবস্থায় প্রক্রিয়াটি হবে দু’টি ধাপে। প্রথম ধাপে, মূল প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, চার বছরের মেয়াদ শেষ করার পরে মেধার ভিত্তিতে ২৫ শতাংশ অগ্নিবীরকে বেছে নিয়ে বাহিনীতে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

বাকি ৭৫ শতাংশ অগ্নিবীরকে এত দিন নিজেদের ও সরকারের যৌথ অবদানে গঠিত আর্থিক প্যাকেজ নিয়ে বাহিনী ছাড়তে হত। তাঁদের এ বার অতিরিক্ত দু’বছর কাজ করার সুযোগ দেওয়া হবে। সেই মেয়াদ শেষে তাঁরাও নিয়মিত সৈনিক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাবেন—যদি তাঁরা নিজেরা আগ্রহী হন এবং সামরিক বাহিনীর নির্ধারিত বস্তুনিষ্ঠ নির্বাচনী মানদণ্ড পূরণ করেন।

এই সিদ্ধান্তের অর্থ, সমস্ত অগ্নিবীরের সামনেই এখন নিয়মিত সৈনিক হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকবে। তিন বাহিনীতে বর্তমানে বিভিন্ন পর্যায়ে তিন লক্ষের বেশি অগ্নিবীর প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২ লক্ষ ৮০ হাজার রয়েছেন সেনাবাহিনীতে। সেনাবাহিনীর প্রায় ১৯ হাজার অগ্নিবীরের প্রাথমিক চার বছরের মেয়াদ পূর্ণ হতে চলেছে।

চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল এন এস রাজা সুব্রামণি সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত চার বছর ধরে অগ্নিবীরদের ধারাবাহিক মূল্যায়নের পরে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সশস্ত্র বাহিনীতে কমবয়সি সদস্যদের প্রাধান্য বজায় রাখার পাশাপাশি অভিজ্ঞ সৈনিকও পাওয়া যাবে।

তিনি জানান, যে অগ্নিবীরেরা অতিরিক্ত দু’বছর কাজ করবেন, তাঁদের বেতন বাড়বে। অতিরিক্ত মেয়াদের প্রথম বছরে তাঁরা পাবেন ৪৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং দ্বিতীয় বছরে ৪৭ হাজার ৫০০ টাকা। তুলনায়, অগ্নিবীরদের প্রথম ব্যাচের প্রারম্ভিক বেতন ছিল ৩০ হাজার টাকা।

এই মেয়াদ শেষে যাঁরা বাহিনী ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন, তাঁরা বর্ধিত ‘সেবা নিধি’ প্যাকেজও পাবেন। তাতে সরকারের অবদানের অংশ হবে ৭০ শতাংশ। মূল সেবা নিধি ব্যবস্থায় অগ্নিবীর ও সরকারের অবদান ছিল সমান—৫০ শতাংশ করে।

সিডিএস আরও বলেন, অগ্নিপথ প্রকল্পের এই পরিবর্তনের পরে অগ্নিবীরদের জন্য আধাসামরিক বাহিনীতে সংরক্ষণের প্রয়োজন নেই। কারণ, নতুন ব্যবস্থা তাঁদের সশস্ত্র বাহিনীতেই কর্মজীবন গড়ে তোলার যথেষ্ট সুযোগ দেবে।

তাঁর বক্তব্য, এই সিদ্ধান্ত সশস্ত্র বাহিনীর অভিযান পরিচালনার দক্ষতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, বাহিনীর সাংগঠনিক প্রয়োজন মেটাবে এবং অগ্নিবীরদের আশা-আকাঙ্ক্ষারও যত্ন নেবে।

অতিরিক্ত দু’বছরের মেয়াদ শেষে তাঁদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে যে মানদণ্ডগুলি বিবেচনা করা হবে, তার মধ্যে রয়েছে আরও ভালভাবে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, শৃঙ্খলা এবং কোনও ভিজিল্যান্স মামলা না থাকা।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এক্স-এ লিখেছেন, “অগ্নিপথ প্রকল্পের আওতায় অগ্নিবীরদের জন্য অতিরিক্ত দু’বছরের ‘সেকেন্ড ট্যুর অব ডিউটি’-র সিদ্ধান্ত নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এর ফলে চার অথবা ছ’বছরের মেয়াদ শেষে নির্বাচনের মানদণ্ড পূরণকারী সমস্ত ইচ্ছুক অগ্নিবীর নিয়মিত সৈনিক হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাবেন।”

তিনি আরও বলেন, “এই সিদ্ধান্ত আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারেরই ধারাবাহিকতা। লক্ষ্য হল আরও তরুণ, শারীরিকভাবে সক্ষম, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত একটি সামরিক বাহিনী গড়ে তোলা। এটি নিছক একটি নিয়োগনীতি নয়; যুদ্ধের পরিবর্তনশীল চরিত্রের মোকাবিলায় ভারতের সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুত করার পথ।”

জেনারেল সুব্রামণি জানান, অগ্নিবীরদের কাজের নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং ধারাবাহিক পর্যালোচনা চলেছে। তাঁর কথায়, “নির্বাচনের জন্য বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড ছিল। তিন বাহিনীর সমস্ত অগ্নিবীরের কাজের মূল্যায়ন নথিবদ্ধ রাখতে একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা হয়েছিল। প্রতি বছর তাঁদের কাজের পর্যালোচনা করা হয়েছে।” সেই মূল্যায়নের পরেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

সিডিএস স্পষ্ট করে দেন, অগ্নিপথ প্রকল্পের বর্তমান কাঠামো বহাল থাকছে। অর্থাৎ, অগ্নিবীরদের প্রাথমিক চাকরির মেয়াদ চার বছরই থাকবে।

তাঁর কথায়, “অগ্নিপথ প্রকল্প বন্ধ করা হয়নি। এটি চলবে। দ্বিতীয়ত, প্রথম চার বছরের শেষে যে অগ্নিবীরেরা নির্বাচিত হননি, অতিরিক্ত দু’বছরের এই দ্বিতীয় মেয়াদ তাঁদের আরও বেশি দিন কাজ করার সুযোগ দেবে।”

তিনি বলেন, “তাঁদের অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও দক্ষতার বিচারটা তুলনামূলক। তাঁরা খারাপ, বিষয়টা এমন নয়; এটি আপেক্ষিক বিচার। ফলে এই দু’বছরে তাঁরা সেনাবাহিনীতে আরও বেশি দিন কাজ করার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি নিয়মিত সৈনিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যবস্থাও থাকবে। এতে দু’পক্ষেরই লাভ।”

গত চার বছরের মূল্যায়নের ভিত্তিতে অগ্নিবীরদের কাজ সম্পর্কে সশস্ত্র বাহিনী ইতিবাচক মতামত পেয়েছে বলেও জানান তিনি।

সুব্রামণির বক্তব্য, “সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সামরিক অভিযানের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে আমরা প্রকল্পটির বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করেছি। তাতে শারীরিক সক্ষমতা, উদ্দীপনা, মনোবল এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার ক্ষেত্রে অগ্নিবীরদের অসাধারণ পারদর্শিতা উঠে এসেছে।”

আধিকারিকদের মতে, নতুন পরিবর্তন-সহ অগ্নিবীর প্রকল্প তাঁদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মনোভাব বজায় রাখতে সাহায্য করবে। প্রথম ধাপেই নির্বাচিত সেরা ২৫ শতাংশের মধ্যে জায়গা করে নিতে তাঁরা সচেষ্ট হবেন। পাশাপাশি একাধিক স্তরে নির্বাচনের ফলে বাহিনীতে যোগ্য সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে।

আধিকারিকেরা আরও জানান, এই প্রকল্পে সমস্ত অগ্নিবীরের জন্য দক্ষতা অর্জন, কর্মজীবন গড়ে তোলার সুযোগ এবং উপযুক্ত বেতনের ব্যবস্থা রয়েছে। যাঁরা বাহিনী ছাড়বেন, তাঁদের জন্য থাকছে যৌথ অবদানে গঠিত আর্থিক প্যাকেজও।

চলতি মাস থেকেই অগ্নিবীরদের বিভিন্ন ব্যাচের চার বছরের মেয়াদ পূর্ণ হতে শুরু করছে। ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রথম ব্যাচের অগ্নিবীরেরা এ মাসেই তাঁদের চার বছরের মেয়াদ শেষ করবেন। তার পরে আগামী মাসের শেষে সেনাবাহিনী ও বায়ুসেনার প্রথম ব্যাচগুলির মেয়াদ পূর্ণ হবে।

২০২২ সালে ঘোষিত মূল অগ্নিপথ প্রকল্প অনুযায়ী, তিন বাহিনীর প্রতিটিতে মাত্র ২৫ শতাংশ অগ্নিবীরকে রেখে দেওয়ার কথা ছিল। বাকি অগ্নিবীরদের চার বছরের মেয়াদ শেষ হলে বাহিনী ছাড়তে হত।

প্রাথমিক মেয়াদ শেষে আরও অনেক বেশি সংখ্যক অগ্নিবীরকে বাহিনীতে রেখে দেওয়ার বিষয়ে তিন বাহিনী আগেই সামরিক বিষয়ক দফতরের সঙ্গে আলোচনা করেছিল। এই নিয়ে তাদের মধ্যে একাধিক বার যোগাযোগও হয়েছিল।