বাংলাস্ফিয়ার: ‘৫০০ কোটি টাকা’র অডিয়ো ক্লিপ ঘিরে বিতর্ক মহারাষ্ট্রের শাসক জোটে নতুন সংঘাত তৈরি করেছে। শিবসেনার এক নেতা উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে, শিন্ডের দল ২০২৯ সালে ফের মুখ্যমন্ত্রীর পদ ফিরে পাওয়ার লক্ষ্য সামনে আনছে।
অডিয়ো ক্লিপটির তদন্তের দাবিতে শিবসেনার এক প্রতিনিধিদল মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীসের সঙ্গে দেখা করে। কিন্তু সেই প্রতিনিধিদলে ছিলেন না শিন্ডে। তাঁর অনুপস্থিতি মুখ্যমন্ত্রী ও উপমুখ্যমন্ত্রীর সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।
এই বিতর্কের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে দ্রুত। শিবসেনা নেতা রামদাস কদম অভিযোগ করেছেন, বিজেপির একাংশ শিন্ডেকে দুর্বল করার ষড়যন্ত্র করছে। পাল্টা বিজেপি নেতারা তাঁদের জোটসঙ্গীকে সতর্ক করে বলেছেন, প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ করা চলবে না। মুখ্যমন্ত্রী ফডণবীস ফরেনসিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, রেকর্ডিংটির উৎস এবং তাতে যাঁদের কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে, তাঁদের পরিচয় নির্ধারণ করতে হবে।
শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠকে কদম বলেন, “বিজেপির মধ্যে কারা একনাথ শিন্ডেকে রাজনৈতিকভাবে শেষ করে দেওয়ার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন? জনগণের সামনে তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে।”
শিন্ডের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাব কি বিজেপিকে শঙ্কিত করে তুলছে, সেই প্রশ্নও তোলেন কদম। তিনি বলেন, “একনাথ শিন্ডে আপনাদের বিশ্বাস করে আপনাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। কিন্তু এখন কি আপনারাও তাঁকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেছেন?”
পাল্টা জবাবে বিজেপির বিধান পরিষদ সদস্য প্রবীণ দারেকর বলেন, প্রমাণ ছাড়া দলের নেতাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা বিজেপি বরদাস্ত করবে না। তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ফডণবীস প্রশ্ন তোলেন, আড়াই বছর পরে কেন রেকর্ডিংটি প্রকাশ্যে এল। তাঁর কথায়, “আড়াই বছর পরে এই অডিয়ো ক্লিপ এখন কেন বাইরে এল, সেটাও আমাদের খুঁজে বার করতে হবে।”
আস্থার প্রশ্ন
বর্তমান বিরোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আগের বিবাদগুলির থেকে আলাদা। আগে মতবিরোধের মূল বিষয় ছিল কোনও দফতরের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, রাজনৈতিক নিয়োগে কে সুবিধা পাবেন, কিংবা সরকারের কাজের কৃতিত্ব কে দাবি করবেন। কিন্তু ৫০০ কোটি টাকার অভিযোগকে ঘিরে শিবসেনার এক প্রবীণ নেতা সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন, বিজেপির একাংশ হয়তো তাদের জোটসঙ্গী দলের নেতাকেই রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।
শিবসেনার কাছে এই বিতর্ক একটি স্পর্শকাতর রাজনৈতিক প্রশ্নকে সামনে এনেছে। ২০২২ সালে অবিভক্ত শিবসেনা থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন শিন্ডে। বিজেপির সমর্থন নিয়ে তিনি উদ্ধব ঠাকরের সরকারের পতন ঘটান। শিন্ডে হন মুখ্যমন্ত্রী, আর ফডণবীস তাঁর উপমুখ্যমন্ত্রী। এই জোট শিন্ডেকে রাজ্যের শীর্ষ পদ দিয়েছিল, আর বিজেপিকে দিয়েছিল সরকারে ফেরার পথ।
তবে জোটের দুই শরিকের শক্তি সমান ছিল না। বিধানসভায় বিজেপি ছিল বড় দল। অন্যদিকে, শিন্ডেকে প্রমাণ করতে হচ্ছিল যে তাঁর গোষ্ঠীর নিজস্ব জনভিত্তি রয়েছে এবং শিবসেনার রাজনৈতিক পরিচয় ধরে রাখার ক্ষমতাও রয়েছে।
এই টানাপড়েন প্রকাশ্যে আসে ২০২৩ সালের জুনে। সংবাদপত্রের একটি পূর্ণপাতার বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ফডণবীসের তুলনায় শিন্ডে বেশি জনপ্রিয়। একটি সমীক্ষার উল্লেখ করে বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শিন্ডের পক্ষে সমর্থন ২৬ শতাংশ, আর ফডণবীসের পক্ষে ২৩.২ শতাংশ। বিজ্ঞাপনটি নিয়ে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
পরে দুই নেতাকে একসঙ্গে রেখে আর একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে শিবসেনা। ঘটনাটি প্রথম দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছিল, একসঙ্গে সরকার চালালেও সরকারের প্রধান মুখ হিসেবে কাকে তুলে ধরা হবে, তা নিয়ে দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে।
বদলে যাওয়া শক্তির ভারসাম্য
২০২৪ সালের নভেম্বরের বিধানসভা নির্বাচনের পরে নেতৃত্বের প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বিধানসভার ২৮৮টি আসনের মধ্যে বিজেপি জেতে ১৩২টিতে। শিন্ডের শিবসেনা পায় ৫৭টি আসন। ফডণবীস আবার মুখ্যমন্ত্রী হন, আর শিন্ডে হন উপমুখ্যমন্ত্রী।
পদমর্যাদার বিচারে এই পরিবর্তন শিন্ডের জন্য ছিল রাজনৈতিক ধাক্কা। কারণ, তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ ধরে রাখতে আগ্রহী ছিলেন। ক্ষমতার এই পালাবদলের পরে নাসিক ও রায়গড়ের পালকমন্ত্রী, অর্থাৎ জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর পদ বণ্টন নিয়ে বিরোধ শুরু হয়। শিবসেনা চেয়েছিল, ওই পদগুলি তার দলের মন্ত্রীদের দেওয়া হোক। মতবিরোধের মধ্যেই শিন্ডে কয়েকটি সরকারি বৈঠকে যোগ দেননি।
সংঘাতের আরও ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফডণবীস সরকার ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে কৃষিপণ্য সংগ্রহের কয়েকটি প্রকল্পের কিছু দিক এবং আগের শিন্ডে সরকারের আমলে অনুমোদিত সংগ্রহকারী সংস্থাগুলির নির্বাচনপ্রক্রিয়া পর্যালোচনার নির্দেশ দেয়। এর কারণ হিসেবে অনিয়মের অভিযোগ এবং সংগ্রহকারী সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে টাকা দাবি করার অভিযোগের কথা বলা হয়।
২০২৫ সালের নভেম্বর নাগাদ বিরোধ পৌঁছে যায় দলীয় সংগঠনের স্তরে। শিন্ডের দলের নেতাদের নিজেদের দলে টানার বিজেপির চেষ্টায় প্রতিবাদ জানান শিবসেনার মন্ত্রীরা। তাঁদের অধিকাংশই একটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দেননি। পরে শিন্ডে বলেন, মহাযুতি জোটের শরিকদের মধ্যে পরস্পরের দল ভাঙিয়ে নেতা নেওয়া চলবে না।
চলতি বছরের জানুয়ারির পুরনিগম নির্বাচনেও সেই প্রতিযোগিতা দেখা যায়। মূলত আসন বণ্টন এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে রাজ্যের ২৯টি পুরনিগমের মধ্যে ১৫টিতে নির্বাচনের আগে সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি বিজেপি ও শিবসেনা। মুম্বই, ঠাণে ও কল্যাণ-ডোম্বিভলি-সহ ১৪টি পুরনিগমে তারা একসঙ্গে লড়ে।
ফেব্রুয়ারিতে মুম্বইয়ের মেয়র হন বিজেপির ঋতু তাওড়ে। এর ফলে মেয়র পদে অবিভক্ত শিবসেনার তিন দশকের কর্তৃত্বের অবসান ঘটে। গত এক বছর ধরে শিবসেনার পুরপ্রতিনিধিরা বারবার অভিযোগ করেছেন, শাসক জোটের অংশ হওয়া সত্ত্বেও দেশের সবচেয়ে ধনী পুরনিগমে তাঁদের কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে।
২০২৯-এর প্রশ্ন
সাম্প্রতিক অডিয়ো-বিতর্ক এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন শিবসেনার নেতারা প্রকাশ্যে আবার বলতে শুরু করেছেন যে তাঁরা শিন্ডেকে ফের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান।
২০ অক্টোবর পরিবহণমন্ত্রী প্রতাপ সরনাইক বলেন, ২০২৯ সালে বিধানসভায় নিজেদের আসনসংখ্যা বাড়িয়ে শিন্ডেকে আবার মুখ্যমন্ত্রী করার চেষ্টা করবে দল।
সরনাইকের কথায়, “প্রত্যেক শিবসৈনিক চান, একনাথ শিন্ডে আবার মুখ্যমন্ত্রী হোন। আজ আমাদের প্রয়োজনীয় সংখ্যা নেই বলেই শিন্ডে উপমুখ্যমন্ত্রী। আগামী বিধানসভা নির্বাচনে আমরা নিজেদের শক্তি বাড়াব এবং তাঁকে আবার মুখ্যমন্ত্রী করব।”
জলসম্পদমন্ত্রী গুলাবরাও পাটিলও একই আকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়েছেন। এই মন্তব্যগুলিকে মুখ্যমন্ত্রী বদলের জন্য মহাযুতি নেতৃত্বের কাছে তোলা আনুষ্ঠানিক দাবি বলা যায় না। তবে এগুলি স্পষ্ট করে দিচ্ছে, সরকারে বর্তমান অবস্থানকেই নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার শেষ সীমা বলে মনে করছে না শিবসেনা।
নাসিকের প্রাক্তন শিবসৈনিক অশোক ধাতিঙ্গন দীর্ঘদিন ধরে দলের বিবর্তন দেখেছেন। তিনি বলেন, “শিন্ডের ক্ষেত্রে আবার শীর্ষ পদে ফেরার লক্ষ্য প্রকাশ্যে তুলে ধরার অর্থ হল, দলের কেন্দ্রে তাঁর নেতৃত্বকে ধরে রাখা এবং কর্মীদের সামনে একটি রাজনৈতিক লক্ষ্য স্থির করা। এর মাধ্যমে এই বার্তাও দেওয়া হচ্ছে যে, বিজেপির আসনসংখ্যার উপর নির্ভর করে থাকার বদলে শিবসেনা নিজের শক্তি বাড়াতে চায়।”
বিজেপির কাছে বারবার এই ধরনের বক্তব্যের অর্থ, আগামী বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতার আরও বড় অংশ আদায়ের জন্য দরকষাকষির প্রস্তুতি নিচ্ছে তার জোটসঙ্গী। ২০২৯ সালের নির্বাচনে মহারাষ্ট্রের ক্ষমতা ধরে রাখার রাজনৈতিক হিসাবে শিবসেনা এখনও বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ শরিক। কিন্তু যে দলের রাজনৈতিক পরিচয় ও ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু এখনও একনাথ শিন্ডে, সেই শরিককে কতটা রাজনৈতিক পরিসর ছেড়ে দেওয়া উচিত, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছে বিজেপি।