বাংলাস্ফিয়ার: অধ্যাপক অশোক সেনের নাম হয়তো সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পরিচিত নয়। কিন্তু তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জগতে, বিশেষত স্ট্রিং তত্ত্বের গবেষকদের কাছে, তিনি অন্যতম অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব। মহাবিশ্বের গভীরতম নিয়মগুলি বোঝার চেষ্টায় তাঁর গবেষণা গত কয়েক দশকে খুলে দিয়েছে নতুন পথ। সেই অবদানের স্বীকৃতিতেই এ বার ২০২৬ সালের অস্কার ক্লাইন পদক পেলেন সত্তর বছরের এই বাঙালি বিজ্ঞানী। তিনিই প্রথম ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী, যাঁকে এই সম্মান দেওয়া হল।

বেঙ্গালুরুর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিয়োরেটিক্যাল সায়েন্সেস বা আইসিটিএসের অধ্যাপক সেনের এই সম্মানের কথা জানিয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠান। সুইডেনের পদার্থবিজ্ঞানী অস্কার ক্লাইনের স্মৃতিতে ১৯৮৮ সালে চালু হয় পদকটি। স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় এবং রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল কমিটি যৌথ ভাবে এই সম্মান দেয়। পুরস্কার উপলক্ষে ২২ অক্টোবর স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ের আলবানোভা কেন্দ্রে বক্তৃতা দেন সেন। বিষয় ছিল, ‘স্ট্রিং থেকে মহাকর্ষ এবং মহাকর্ষ থেকে স্ট্রিং’।

তাঁর গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের এক মৌলিক প্রশ্ন: প্রকৃতির সমস্ত কণা ও বলকে কি একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ তত্ত্বের মধ্যে বোঝা সম্ভব? আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের দুটি প্রধান স্তম্ভ এই প্রশ্নের পটভূমি তৈরি করেছে। একটি আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ, যা মহাকর্ষকে স্থান-কালের বক্রতার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে। নক্ষত্র, ছায়াপথ এবং মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামো বুঝতে তার সাফল্য অসামান্য। অন্যটি কোয়ান্টাম তত্ত্ব, যা পরমাণু ও তার চেয়েও ক্ষুদ্র জগতের আচরণ ব্যাখ্যা করে।

নিজ নিজ ক্ষেত্রে এই দুই তত্ত্ব অত্যন্ত সফল। কিন্তু এমন কিছু পরিস্থিতি রয়েছে, যেখানে মহাকর্ষ এবং কোয়ান্টাম প্রভাবকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। সেখানেই তাদের প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে অসংগতি দেখা দেয়। এই সমস্যা মেটাতে বহু দশক ধরে এমন একটি তত্ত্বের সন্ধান চলছে, যা উভয়কে একই ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে পারে। স্ট্রিং তত্ত্ব সেই অনুসন্ধানের অন্যতম প্রধান পথ।

স্ট্রিং তত্ত্বে প্রকৃতির মৌলিক উপাদানগুলিকে শুধু বিন্দুর মতো কণা হিসাবে দেখা হয় না। তাদের ভাবা হয় অত্যন্ত ক্ষুদ্র, একমাত্রিক সুতোর মতো সত্তা হিসাবে। এই ‘স্ট্রিং’-এর বিভিন্ন ধরনের কম্পন থেকে বিভিন্ন কণার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেতে পারে। যেমন একই বাদ্যযন্ত্রের তারের ভিন্ন কম্পনে আলাদা সুর তৈরি হয়, তেমনই এই তত্ত্বে ভিন্ন কম্পনরীতি দিয়ে কণার বৈচিত্র্য বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। অবশ্য উপমাটি ধারণা বোঝানোর জন্য; স্ট্রিং দৈনন্দিন জীবনের কোনও বস্তুগত সুতো নয়।

এই তত্ত্বের গাণিতিক কাঠামো নির্মাণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে প্রকৃতির চূড়ান্ত বিবরণ হিসাবে স্ট্রিং তত্ত্ব এখনও পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত নয়। আমাদের বাস্তব জগতের মৌলিক নিয়ম সত্যিই এই তত্ত্ব মেনে চলে কি না, তা নিশ্চিত করার মতো প্রত্যক্ষ পরীক্ষামূলক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে তাত্ত্বিক সাফল্য এবং পরীক্ষালব্ধ প্রতিষ্ঠার মধ্যে পার্থক্যটি বজায় রেখেই এর গুরুত্ব বিচার করতে হয়।

অশোক সেনের শিক্ষাজীবনের সূচনা কলকাতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯৭৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক হন তিনি। ১৯৭৮ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান আইআইটি কানপুর থেকে। পরে আমেরিকার স্টোনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করে ১৯৮২ সালে পিএইচডি অর্জন করেন। ফের্মিল্যাব এবং স্ট্যানফোর্ড লিনিয়ার অ্যাক্সেলারেটর সেন্টারে গবেষণার পর ১৯৮৮ সালে ভারতের টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে যোগ দেন।

পরবর্তী সময়ে তাঁর গবেষণার প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে প্রয়াগরাজের হরিশচন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটি আগে মেহতা রিসার্চ ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত ছিল। ভারত সরকারের পরমাণু শক্তি দফতরের অধীন এই স্বশাসিত গবেষণাকেন্দ্রে দীর্ঘ দিন কাজ করেন সেন। ২০২১ সালের নভেম্বরে তিনি বেঙ্গালুরুর আইসিটিএসে চলে আসেন। টিআইএফআরের এই কেন্দ্রেই তাঁর গবেষণা অব্যাহত রয়েছে।

নব্বইয়ের দশকে স্ট্রিং তত্ত্বের একটি বড় ধাঁধা সমাধানের পথে সেনের কাজ বিশেষ গুরুত্ব পায়। তখন পাঁচটি সামঞ্জস্যপূর্ণ সুপারস্ট্রিং তত্ত্বের কথা জানা ছিল। প্রকৃতির একটি ঐক্যবদ্ধ ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে এতগুলি আলাদা তাত্ত্বিক কাঠামোর উপস্থিতি নতুন প্রশ্ন তুলেছিল। এগুলি কি সত্যিই পৃথক তত্ত্ব, নাকি কোনও আরও গভীর তত্ত্বের বিভিন্ন প্রকাশ?

সেনের গবেষণা দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিকে জোরালো করে। তাঁর ‘এস-ডুয়ালিটি’ সংক্রান্ত কাজ দেখাতে সাহায্য করে, আপাতদৃষ্টিতে আলাদা কিছু তাত্ত্বিক বিবরণ আসলে একই অন্তর্নিহিত পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত। এক বিবরণে যেখানে পারস্পরিক ক্রিয়া প্রবল, অন্য বিবরণে তা দুর্বল হতে পারে। এই সম্পর্ক বোঝা কঠিন সমস্যাকে নতুন ভাবে বিশ্লেষণের সুযোগ করে দেয়। বিভিন্ন স্ট্রিং তত্ত্ব যে একটি বৃহত্তর কাঠামোর পৃথক সীমায় প্রকাশিত রূপ হতে পারে, সেই উপলব্ধি গড়ে ওঠায় সেনের অবদান মৌলিক।

পরবর্তী দশকগুলিতেও তাঁর কাজের বিস্তার ঘটেছে। কৃষ্ণগহ্বরের এনট্রপির সূক্ষ্ম গণনা এবং স্ট্রিং ফিল্ড তত্ত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি। মহাকর্ষের বৃহৎ চিত্রের সঙ্গে ক্ষুদ্র জগতের কোয়ান্টাম বিবরণের সম্পর্ক অনুসন্ধানে এই গবেষণাগুলি আধুনিক স্ট্রিং তত্ত্বকে সমৃদ্ধ করেছে।

স্বীকৃতিও এসেছে ধারাবাহিক ভাবে। ১৯৯৪ সালে শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার পান সেন। ১৯৯৮ সালে নির্বাচিত হন রয়্যাল সোসাইটির ফেলো; ২০০৪ সালে হন থার্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের ফেলো। ২০০৯ সালে পান ইনফোসিস পুরস্কার। মৌলিক পদার্থবিজ্ঞানে ব্রেকথ্রু পুরস্কার পান ২০১২ সালে, ডিরাক পদক ২০১৪ সালে। ভারত সরকার তাঁকে ২০০১ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১৩ সালে পদ্মভূষণে সম্মানিত করে।

ভারতে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের শক্তিশালী গবেষণা-পরম্পরারও প্রতিনিধি সেন। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, এই বিষয়ে ভারতের সাফল্যের একটি কারণ হতে পারে, গবেষণার জন্য সব সময় বড় যন্ত্রপাতি বা বিপুল পরিকাঠামো প্রয়োজন হয় না। ধারণা, গণিত এবং গভীর চিন্তার সাহায্যেও মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব।

তবে পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকার বাইরেও তাঁর বিজ্ঞানচর্চার চালিকাশক্তি ব্যক্তিগত কৌতূহল। ২০১২ সালে ব্রেকথ্রু পুরস্কার পাওয়ার পরে তাঁর কথায় সেই মনোভাবই ধরা পড়েছিল: ‘আমার কাছে বিজ্ঞানচর্চার সবচেয়ে ভালো দিক হল, যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী করে, আমি তা নিয়েই কাজ করতে পারি।’ মহাবিশ্বের নিয়মের ঐক্য খোঁজার দীর্ঘ যাত্রায় সেই স্বাধীন অনুসন্ধানই এখনও অশোক সেনের প্রধান প্রেরণা।