বাংলাস্ফিয়ার: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরে ভুল ও অসংগতি শনাক্ত করতে ব্যবহৃত সফটওয়্যারের নাম এবং সংস্করণ প্রকাশ করতে অস্বীকার করল ভারতের নির্বাচন কমিশন। তথ্যের অধিকার আইনে করা আবেদনের জবাবে কমিশন জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট তথ্য বাণিজ্যিক গোপনীয়তা, ব্যবসায়িক গোপন তথ্য এবং মেধাস্বত্বের আওতায় পড়ে। ফলে তা প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নেই বলে কমিশনের অবস্থান। এই জবাব ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে।

একই সঙ্গে কমিশন জানিয়েছে, এসআইআর পরিচালনার জন্য নতুন কোনও সফটওয়্যার তৈরি করা হয়নি, কেনাও হয়নি। কোনও ভোটারের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে কিংবা বাদ যাবে, সেই সিদ্ধান্ত তথ্য ও নথির ভিত্তিতে নেন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও। কমিশনের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ভোটার তালিকা প্রস্তুত এবং সংশোধনের দায়িত্ব আইন অনুযায়ী ওই আধিকারিকেরই। সফটওয়্যারের পরিচয় প্রকাশে আপত্তির পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই প্রশাসনিক কাঠামোর উপর জোর দিয়েছে কমিশন।

এসআইআর ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ এবং সমালোচনার মধ্যেই এই উত্তর এসেছে। কমিশনের বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট: অভিযানের জন্য নতুন সফটওয়্যার সংগ্রহের কথা তারা অস্বীকার করছে এবং নাম সংযোজন বা বিয়োজনের দায়িত্ব ইআরওর উপর ন্যস্ত থাকার কথা জানাচ্ছে। তবে ব্যবহৃত সফটওয়্যারের পরিচয় সম্পর্কে আবেদনকারীর প্রশ্নের জবাবে কোনও নাম বা সংস্করণ জানানো হয়নি। ফলে প্রযুক্তির পরিচয় ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বিষয়ে কমিশনের উত্তর আলাদা রয়ে গেল।

আইনের দিক থেকে বাণিজ্যিক গোপনীয়তার সুরক্ষা অবশ্য শর্তসাপেক্ষ। তথ্যের অধিকার আইনের ৮(১)(ডি) ধারায় এমন তথ্য প্রকাশ থেকে অব্যাহতির ব্যবস্থা রয়েছে, যা প্রকাশ করলে তৃতীয় পক্ষের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু একই ধারায় বৃহত্তর জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের সুযোগও রাখা হয়েছে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে জনস্বার্থে প্রকাশ প্রয়োজন, তা হলে গোপনীয়তার দাবি সত্ত্বেও সেই তথ্য দেওয়া সম্ভব। অর্থাৎ আইনে গোপনীয়তার পাশাপাশি জনস্বার্থ যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে।

অন্যান্য প্রশ্নে ২(এফ) ও ৮(১)(জি) ধারাও দেখিয়েছে কমিশন। প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ওপি রাওয়াত আবেদনকারীকে আপিল করতে বলেছেন।  তথ্যের অধিকার আইনের কাঠামোয় কোনও আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেই সংশ্লিষ্ট বিরোধের নিষ্পত্তি হয়ে যায় না; সেই সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার পথ খোলা থাকে।

আইনের ৮(১)(জি) ধারার বিষয় ব্যক্তির জীবন বা শারীরিক নিরাপত্তার বিপদ এবং আইন প্রয়োগ বা নিরাপত্তার প্রয়োজনে গোপনে পাওয়া তথ্যের উৎস সুরক্ষিত রাখা। আবার প্রকাশযোগ্য তথ্যকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত অংশ থেকে যুক্তিসংগতভাবে পৃথক করা গেলে আংশিক তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থাও আইনে রয়েছে। ফলে একটি নথিতে সুরক্ষিত তথ্য থাকলে তার অন্য সব অংশও স্বয়ংক্রিয়ভাবে গোপন থাকবে, এমন নয়। কোন অংশ দেওয়া সম্ভব, সেই প্রশ্নও বিবেচনার বিষয়।

তথ্য না দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকের কাছে আপিল করা যায়। পরবর্তী পর্যায়ে উপযুক্ত তথ্য কমিশনে দ্বিতীয় আপিলের ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রত্যাখ্যানের যৌক্তিকতা প্রমাণের দায়িত্ব তথ্য আধিকারিকের। এই প্রক্রিয়াতেই গোপনীয়তার দাবি এবং তথ্য পাওয়ার অধিকারের মধ্যে বিরোধ বিচার করা সম্ভব।

কমিশনের জবাব বিশ্লেষণ করলে মূল পার্থক্যটি দাঁড়ায় প্রযুক্তির ভূমিকা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দায়িত্বের মধ্যে। ইআরও সিদ্ধান্ত নেন—এই বক্তব্য থেকে অসংগতি শনাক্তকারী সফটওয়্যারের কার্যপদ্ধতি জানা যায় না। আবার সফটওয়্যারের নাম প্রকাশ না করার ঘটনাই বেআইনি ভোটার বিয়োজনের প্রমাণ নয়। সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে নির্দিষ্ট নথি ও প্রমাণ প্রয়োজন।

তবে ভোটার তালিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে নাগরিকের প্রশ্নের যথাযথ উত্তর পাওয়া জরুরি। কী তথ্য গোপন রাখা প্রয়োজন এবং কোন তথ্য প্রকাশ বৃহত্তর জনস্বার্থে দরকার, সেই ভারসাম্য নির্ধারণই এখানে মুখ্য। কমিশনের প্রশাসনিক দায়িত্বের ব্যাখ্যার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতার প্রশ্নটিরও নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। কারণ ভোটার তালিকার নির্ভুলতার সঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাও সরাসরি জড়িত।