বাংলাস্ফিয়ার: বিচারপতি নিয়োগের প্রশ্নে সরকারের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় ছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়—প্রকাশিতব্য স্মৃতিকথায় এমনই অভিযোগ তুলেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সঞ্জয় কিষাণ কৌল। তাঁর বক্তব্য, সরকার শেষ পর্যন্ত সেই বিচারপতিদেরই সম্মান করে, যাঁরা দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেন। কলেজিয়ামের অভ্যন্তরে দুই বিচারপতির মতপার্থক্যের বিবরণ সামনে এসেছে। চন্দ্রচূড় অবশ্য কৌলের বর্ণিত একটি ঘটনার স্মৃতি স্বীকার করেননি; কলেজিয়ামের আলোচনাকে যুক্তিনির্ভর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ বলেই বর্ণনা করেছেন।
২৫ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রকাশ্য অংশ অনুযায়ী, জাগারনট থেকে প্রকাশিতব্য স্মৃতিকথায় কৌল বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার পদ্ধতিকেই তাঁদের টানাপড়েনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ আরও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে, এই পরিস্থিতিতে বিচারবিভাগ কতটা দৃঢ় থাকবে, সেটিই তাঁর উদ্বেগের কেন্দ্র। এমনকি কলেজিয়ামের বৈঠকের আগেই সরকারের সম্মতি চাওয়ার প্রসঙ্গও তাঁর বিবরণে এসেছে।
চন্দ্রচূড়ের প্রস্তাবিত একটি নাম নিয়ে কলেজিয়ামে আপত্তি ওঠে। কৌলের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তখন চন্দ্রচূড় ভাবছিলেন, ফোন করে সরকারের মনোভাব জেনে নেওয়া উচিত কি না। এখানে বিতর্কের বিষয় শুধু সম্ভাব্য নিয়োগপ্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা নয়; বিচারপতিদের নিজেদের আলোচনায় মতপার্থক্য দেখা দিলে তা মেটানোর ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান কতখানি গুরুত্ব পাবে, সেই প্রশ্নও উঠে আসে। তবে ফোনটি শেষ পর্যন্ত করা হয়েছিল কি না, প্রদত্ত অংশে তার উল্লেখ নেই।
আরেকটি ঘটনায় সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী এক সম্ভাব্য বিচারপতির জাতপরিচয় নিয়ে সরকারের প্রশ্ন কলেজিয়ামের বৈঠকে তোলেন চন্দ্রচূড়, এমনটাই কৌলের দাবি। তিনি জানিয়েছেন, এর পর তিনি বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে যান। অভিযোগটি নিয়োগের আলোচনায় ব্যক্তির ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয় কীভাবে বিবেচিত হচ্ছিল, সেই সংবেদনশীল প্রশ্নকে সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর নাম বা ধর্ম সম্পর্কে এখানে কোনও অনুমান করার অবকাশ নেই।
চন্দ্রচূড়ের বক্তব্যও এই বিতর্কের অপরিহার্য অংশ। তাঁর প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী, কৌল বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, এমন ঘটনা তাঁর মনে পড়ছে না। বরং কলেজিয়ামে যুক্তির ভিত্তিতে আলোচনা হয়েছে এবং বৈঠকগুলি সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল বলেই তিনি জানিয়েছেন। ফলে বৈঠক ত্যাগের ঘটনাটি কৌলের স্মৃতিনির্ভর দাবি হিসেবেই বিবেচ্য। চন্দ্রচূড়ের মনে না থাকার বক্তব্যকে আবার ঘটনাটি ঘটেনি বলে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবেও দেখানো যায় না।
দুই বিচারপতির মতভেদের পূর্বসূত্র অবশ্য আগেই প্রকাশ্যে এসেছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এক সাক্ষাৎকারে কৌল জানিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ নিয়ে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছু পার্থক্য হয়েছিল, বিশেষত তাঁর কার্যকালের শেষদিকে। তবে তখন তিনি এও বলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁরা বিষয়গুলি মিটিয়ে নিয়েছিলেন। প্রধান বিচারপতির পরের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হিসেবে পরামর্শ দেওয়াকে নিজের দায়িত্ব মনে করতেন তিনি; সেই পরামর্শ গ্রহণের সিদ্ধান্ত ছিল চন্দ্রচূড়ের।
ওই সাক্ষাৎকারেই কৌল সরকার ও বিচারপতির মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, বিচারবিভাগের কাজ ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা। সরকারের কোনও পদক্ষেপকে সাংবিধানিক সীমার মধ্যে রাখতে হলে আদালতকে বাধাও দিতে হতে পারে। প্রশাসনিক প্রশ্নে যুক্তি ব্যাখ্যা করে দৃঢ় অবস্থান নিলে সরকার অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আসে, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এমন অভিমত জানিয়েছিলেন তিনি।
আরও নির্দিষ্ট একটি ঘটনা ঘটেছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে। কলেজিয়ামের সুপারিশ সত্ত্বেও বিচারপতি নিয়োগে বিলম্ব নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদনের শুনানি কৌলের বেঞ্চে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মামলাটি সেদিনের কার্যতালিকা থেকে বাদ যায়। আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ বিষয়টি তুললে কৌল জানান, তিনি মামলাটি সরাননি এবং শুনতেও অনিচ্ছুক নন। প্রধান বিচারপতি বিষয়টি জানেন বলে ধরে নিচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগের শুনানিতে কৌলের বেঞ্চ কলেজিয়ামের সুপারিশ থেকে কেন্দ্রের বেছে বেছে নাম ছাড়ার প্রবণতায় অসন্তোষ জানিয়েছিল। এভাবে নিয়োগ অনুমোদন করলে ভুল বার্তা যায়, জানিয়েছিল বেঞ্চ। পরবর্তী সাক্ষাৎকারে কৌলও স্পষ্ট করেছিলেন, নিজের বেঞ্চ থেকে মামলাটি সরিয়ে নেওয়ায় তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং চন্দ্রচূড়কে সেই আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন।
নিয়োগব্যবস্থার প্রেক্ষাপটও এখানে প্রাসঙ্গিক। কেন্দ্রীয় বিচার বিভাগের সংসদে দেওয়া ব্যাখ্যা অনুযায়ী, উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগ বিচারবিভাগ ও সরকারের অংশগ্রহণে পরিচালিত একটি প্রক্রিয়া। হাই কোর্টের কলেজিয়ামের প্রস্তাব, রাজ্য ও কেন্দ্রের মতামত এবং অন্যান্য তথ্য সুপ্রিম কোর্ট কলেজিয়ামের বিবেচনায় আসে। চূড়ান্তভাবে সুপ্রিম কোর্ট কলেজিয়ামের সুপারিশ পাওয়া ব্যক্তিরাই হাই কোর্টে বিচারপতি নিযুক্ত হন। ফলে সরকারি মতামত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ হলেও, সেই মতামত বিচারবিভাগের নিজস্ব মূল্যায়নকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা পৃথক বিচার্য বিষয়। সামাজিক বৈচিত্র্য বাড়াতে তফসিলি জাতি, তফসিলি জনজাতি, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি, সংখ্যালঘু ও মহিলাদের মধ্যে উপযুক্ত প্রার্থীদের বিবেচনার জন্য হাই কোর্টগুলিকে অনুরোধ করার কথাও সরকার জানিয়েছে। কিন্তু এই নীতির উল্লেখ দিয়ে কৌলের বর্ণিত বৈঠকে প্রশ্নটি কেন উঠেছিল, তার উত্তর পাওয়া যায় না।
ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিক থেকেও এই প্রকাশ্য মতপার্থক্য তাৎপর্যপূর্ণ। চন্দ্রচূড় ও কৌল দিল্লির সেন্ট স্টিফেন্স কলেজ এবং পরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ল সেন্টারে পড়েছেন। ২০২৩ সালের বিদায় অনুষ্ঠানে চন্দ্রচূড় কৌলের বিচারবুদ্ধি ও প্রশাসনিক দক্ষতার প্রশংসা করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানেই কৌল মনে করিয়ে দেন, সাংবিধানিক সুরক্ষা পেয়েও বিচারপতিরা সাহস দেখাতে না পারলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে তা আশা করা কঠিন।
এই পটভূমিতে স্মৃতিকথার বিবরণকে কেবল দুই সহকর্মীর ব্যক্তিগত বিরোধ হিসেবে দেখলে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে মূল প্রশ্নটি আড়ালে থেকে যায়। একই সঙ্গে কোনও এক পক্ষের স্মৃতিচারণকে সম্পূর্ণ ঘটনার বিকল্প করে তোলাও যথাযথ হবে না। কৌলের অভিযোগ এবং চন্দ্রচূড়ের প্রতিক্রিয়া পাশাপাশি রেখেই বিচার করতে হবে, সরকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ বজায় রাখার সময় বিচারবিভাগ নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা কতটা রক্ষা করতে পেরেছিল।