ক্যানসারের ওষুধের দাম নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে বড় পদক্ষেপ করল কেন্দ্রীয় সরকার। ২,৭০০ টাকায় কেনা একটি ওষুধের দাম ২৭ হাজার টাকা পর্যন্ত রাখা হচ্ছে—সুপ্রিম কোর্টে এমন উদাহরণ উঠে আসার পরই ওষুধের বিপুল বাণিজ্যিক মার্জিন নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়। সেই প্রেক্ষাপটে ১৩৭টি নন-শিডিউলড অ্যান্টি-ক্যানসার ওষুধের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক মার্জিন ৩০ শতাংশে বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্র। সরকারের দাবি, এর ফলে কয়েকটি ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরো দাম (MRP) ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। নতুন দাম কার্যকর হবে ৯ নভেম্বর থেকে।
কেন্দ্রীয় রাসায়নিক ও সার মন্ত্রকের অধীন ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি (NPPA) ১৭ অক্টোবর এই সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করে। ড্রাগস প্রাইসেস কন্ট্রোল অর্ডার, ২০১৩-র ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় রয়েছে ১৩৭টি নন-শিডিউলড ক্যানসারের ওষুধ। তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইমিউনোথেরাপির ওষুধ, ডেনোসুম্যাব, পেগফিলগ্রাস্টিম এবং বেভাসিজ়ুম্যাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ।
২,৭০০ থেকে ২৭ হাজার: প্রশ্ন উঠেছিল কেন?
ক্যানসারের ওষুধের অস্বাভাবিক দাম নিয়ে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় বিষয়টি বিশেষ ভাবে উঠে আসে। আদালতে জানানো হয়েছিল, ২,৭০০ টাকায় সরবরাহ করা একটি ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরো দাম রাখা হয়েছে ২৭ হাজার টাকা। ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহের খরচের তুলনায় এত বিপুল ব্যবধান কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে আদালত।
NPPA-র বিশ্লেষণেও দেখা যায়, নন-শিডিউলড অ্যান্টি-ক্যানসার ওষুধে গড় বাণিজ্যিক মার্ক-আপ প্রায় ১৭০ শতাংশ। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা ৭০০ শতাংশ বা তারও বেশি। এই পরিস্থিতিতে ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আনতেই মার্জিন নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত বলে জানিয়েছে কেন্দ্র।
রোগীদের কতটা সাশ্রয় হবে?
সরকারের হিসাব, নতুন নিয়মে সংশ্লিষ্ট ওষুধগুলির দাম ২০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। রোগীদের বছরে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়ারও অনুমান করা হয়েছে। তবে সব ওষুধের দাম একই হারে কমবে না।
২৮ অক্টোবর প্রকাশিত সংশোধিত মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ১৩৭টি ওষুধের ৫৪৩টি ফর্মুলেশনের মধ্যে ১৪৬টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। ২১টির ক্ষেত্রে দাম কমেছে ১০০ টাকারও কম। অর্থাৎ, সরকারি সিদ্ধান্তের সুফল সব রোগী সমান ভাবে পাবেন না। কিছু ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য ভাবে কমলেও কিছু দামি ওষুধের ক্ষেত্রে কোনও পরিবর্তন হয়নি।
ফার্মা ও হাসপাতালের শেয়ারে প্রভাব?
সরকারের এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে ওষুধের সরবরাহ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়। এত দিন যে ওষুধগুলিতে পরিবেশক, পাইকারি বিক্রেতা, খুচরো দোকান বা হাসপাতালের ফার্মেসি তুলনামূলক বেশি মার্জিন পেত, সেখানে আয়ের পরিমাণ কমতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিশেষত ক্যানসার চিকিৎসার উপর নির্ভরশীল বেসরকারি হাসপাতালগুলির ফার্মেসি-সংক্রান্ত আয়ে চাপ তৈরি হতে পারে। তবে ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির উপর প্রভাব এক রকম হবে না। কারণ এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য উৎপাদনকারীর লাভের হার নয়, বরং সরবরাহ ও বিক্রির বিভিন্ন স্তরের বাণিজ্যিক মার্জিন নিয়ন্ত্রণ।
এখানে একটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। নন-শিডিউলড ওষুধের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে বছরে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ দাম বাড়ানোর সুযোগ ড্রাগস প্রাইসেস কন্ট্রোল অর্ডারে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনাও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না।
নজর ৯ নভেম্বরের দিকে
নতুন মূল্যতালিকা কার্যকর হওয়ার পর হাসপাতাল, ওষুধের দোকান ও সরবরাহকারীরা কতটা নিয়ম মেনে চলছেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। পুরনো স্টকের ওষুধের প্যাকেট ফিরিয়ে নেওয়া বা নতুন লেবেল লাগানো বাধ্যতামূলক নয়, তবে বিক্রির সময় সংশোধিত দাম কার্যকর করতে হবে বলে জানিয়েছে NPPA।
ক্যানসারের চিকিৎসার বিপুল খরচে বিপর্যস্ত পরিবারগুলির কাছে এই সিদ্ধান্ত কিছুটা স্বস্তি আনতে পারে। কিন্তু দাম কমানোর পাশাপাশি বাজারে নিয়মিত নজরদারি এবং ওষুধের সরবরাহ বজায় রাখা না গেলে সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।