মাল্টিভিটামিন খাচ্ছেন, সঙ্গে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর গামি, চুলের যত্নের ট্যাবলেট আর সর্দি-কাশির লজেন্সও? আলাদা আলাদা করে নিরীহ মনে হলেও, সব মিলিয়ে শরীরে ঢুকছে কতটা জিঙ্ক, তার হিসাব রাখছেন তো? অজান্তেই দৈনিক প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি জিঙ্ক গ্রহণ করলে বিপাকে পড়তে পারে শরীর। তামার ঘাটতি, রক্তাল্পতা, পেটের সমস্যা, এমনকি স্নায়ুর ক্ষতিও হতে পারে।
পুষ্টিবিদ কণিকা মলহোত্রার কথায়, “আলাদা করে কোনও বড়িকেই বিপজ্জনক মনে হয় না। কিন্তু শরীর আলাদা বড়ির হিসাব করে না, দেখে সারা দিনে মোট কতটা জিঙ্ক ঢুকছে।”
শরীরে কতটা জিঙ্ক দরকার?
রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সচল রাখা, ক্ষত সারানো এবং শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য জিঙ্ক অপরিহার্য। কিন্তু বেশি জিঙ্ক খেলেই যে শরীর বেশি উপকৃত হবে, এমন নয়।
মলহোত্রা জানান, ভারতের পুষ্টি-নির্দেশিকা এবং পশ্চিমি নির্দেশিকায় দৈনিক জিঙ্কের সুপারিশ করা পরিমাণে পার্থক্য রয়েছে। ভারতীয় খাদ্যাভ্যাসে শস্য ও ডালের উপস্থিতি বেশি। এগুলিতে থাকা ফাইটেট নামের প্রাকৃতিক যৌগ শরীরে জিঙ্কের শোষণ কমাতে পারে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইসিএমআরের সুপারিশে পুরুষদের দৈনিক প্রায় ১৭ মিলিগ্রাম এবং মহিলাদের ১৩ মিলিগ্রাম জিঙ্কের কথা বলা হয়েছে। পশ্চিমি নির্দেশিকায় এই পরিমাণ যথাক্রমে ১১ ও ৮ মিলিগ্রাম।
তবে শরীরের দৈনিক প্রয়োজন আর সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা এক নয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে খাবার ও সাপ্লিমেন্ট মিলিয়ে দৈনিক ৪০ মিলিগ্রাম জিঙ্ককে সাধারণত সহনীয় ঊর্ধ্বসীমা ধরা হয়। এটি কোনও লক্ষ্যমাত্রা নয়, বরং নিয়মিত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার সীমা।
তাই আরও একটি সাপ্লিমেন্ট যোগ করার আগে খাবার থেকেই জিঙ্কের জোগান বাড়ানোর চেষ্টা করা ভাল। কুমড়োর বীজ, তিল, ছোলা, রাজমা, কাজুবাদাম, দই, পনির, ডিম ও মাংস জিঙ্কের ভাল উৎস হতে পারে।
বেশি জিঙ্কে বিপদ কোথায়?
অতিরিক্ত জিঙ্ক গ্রহণের অন্যতম বড় সমস্যা হল শরীরে তামা বা কপারের ঘাটতি তৈরি হওয়া। জিঙ্ক বেশি থাকলে অন্ত্রে তামার শোষণ ব্যাহত হতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত জিঙ্ক গ্রহণ করলে শরীরে তামার মাত্রা কমে যেতে পারে।
এর পরিণতি কিন্তু সামান্য নয়। তামার ঘাটতি থেকে রক্তাল্পতা হতে পারে, কমে যেতে পারে শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যাও। গুরুতর ক্ষেত্রে স্নায়ুর ক্ষতি হয়ে হাত-পায়ে ঝিনঝিনি, অসাড়তা কিংবা হাঁটার সময় ভারসাম্য বজায় রাখতে অসুবিধা হতে পারে।
মলহোত্রার সতর্কবার্তা, অতিরিক্ত জিঙ্কের প্রভাবে এমন রক্তাল্পতা দেখা দিতে পারে, যা আয়রন দেওয়ার পরেও সহজে সারে না। কিছু ক্ষেত্রে স্নায়ুর ক্ষতিও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
এ ছাড়া বেশি জিঙ্ক খেলে বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা, বমি, ডায়েরিয়া এবং মুখে ধাতব স্বাদ হতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে ‘ভাল’ কোলেস্টেরল বা এইচডিএলের মাত্রাও প্রভাবিত হতে পারে।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর আশায় বেশি জিঙ্ক খাওয়ার প্রবণতাও বিপরীত ফল দিতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দীর্ঘদিন অত্যধিক মাত্রায় জিঙ্ক গ্রহণ রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার স্বাভাবিক কাজকর্মে বাধা দিতে পারে। অর্থাৎ, যে উদ্দেশ্যে সাপ্লিমেন্ট খাওয়া, অতিরিক্ত গ্রহণে সেই উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হতে পারে।
চার সাপ্লিমেন্টে ৬১ মিলিগ্রাম!
অজান্তে অতিরিক্ত জিঙ্ক গ্রহণের সহজ উপায় হল একই সঙ্গে একাধিক সাপ্লিমেন্ট খাওয়া। ধরুন, একটি মাল্টিভিটামিনে ১০ মিলিগ্রাম, রোগ প্রতিরোধক্ষমতার গামিতে ১৫ মিলিগ্রাম, চুল-ত্বক-নখের ট্যাবলেটে ১০ মিলিগ্রাম এবং দু’টি লজেন্সে ১৩ মিলিগ্রাম করে জিঙ্ক রয়েছে।
সব মিলিয়ে শুধু সাপ্লিমেন্ট থেকেই দৈনিক ৬১ মিলিগ্রাম জিঙ্ক শরীরে ঢুকছে। এর সঙ্গে খাবার থেকেও জিঙ্ক পাওয়া যাচ্ছে। ফলে মোট গ্রহণের পরিমাণ আরও বাড়ছে।
প্রোটিন পাউডার, পুষ্টি উপাদান মেশানো সিরিয়াল, চোখের স্বাস্থ্যের সাপ্লিমেন্ট এবং কিছু সর্দি-কাশির পণ্যেও জিঙ্ক থাকতে পারে। এমনকি দাঁতের বাঁধানো অংশ আটকে রাখার কিছু ক্রিমে জিঙ্ক থাকে। এই ধরনের ক্রিম অতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে তামার ঘাটতি ও স্নায়ুর সমস্যার সম্পর্কও পাওয়া গিয়েছে।
তাই শুধু প্রতিটি বোতলের গায়ে লেখা মাত্রা দেখে নিশ্চিন্ত হলে চলবে না। সব সাপ্লিমেন্ট মিলিয়ে দৈনিক মোট কতটা জিঙ্ক গ্রহণ করছেন, সেটিই আসল হিসাব।
কী কী লক্ষণে সতর্ক হবেন?
অতিরিক্ত জিঙ্ক গ্রহণের প্রথম দিকের লক্ষণগুলি অনেক সময় সাধারণ পেটের সমস্যার মতো মনে হয়। যেমন—
মুখে ধাতব স্বাদ।
বমি বমি ভাব বা বমি।
পেটে ব্যথা কিংবা ডায়েরিয়া।
খালি পেটে বড়ি খাওয়ার পর অস্বস্তি।
দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত জিঙ্ক গ্রহণ করলে তামার ঘাটতির লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ফ্যাকাশে ভাব, বারবার সংক্রমণ, হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অসাড়তা এবং হাঁটার সময় টলমল করা।
এই উপসর্গগুলির সঙ্গে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি বা অন্য সমস্যার লক্ষণের মিল থাকতে পারে। তাই শুধু উপসর্গ দেখে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কখনও রক্তকণিকার সংখ্যায় পরিবর্তন এলেও প্রথম দিকে তা স্পষ্ট ভাবে বোঝা যায় না।
অতিরিক্ত জিঙ্ক গ্রহণের সন্দেহ হলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট বা সিবিসি, রক্তে জিঙ্ক ও তামার মাত্রা এবং সেরুলোপ্লাজমিন পরীক্ষা করাতে পারেন।
নিজের সাপ্লিমেন্টের হিসাব রাখবেন কী ভাবে?
প্রথমেই আপনি যে সব সাপ্লিমেন্ট খান, সেগুলি এক জায়গায় রাখুন। মাল্টিভিটামিন, গামি, পাউডার, লজেন্স—কিছুই বাদ দেবেন না। প্রতিটি পণ্যের লেবেল পড়ে তাতে কতটা জিঙ্ক রয়েছে, তা লিখে রাখুন।
বিশেষ করে ‘এলিমেন্টাল জিঙ্ক’-এর পরিমাণ দেখুন। কারণ, লেবেলে কখনও জিঙ্ক সালফেটের মতো যৌগের মোট ওজন লেখা থাকে, যা থেকে শরীরে পাওয়া প্রকৃত জিঙ্কের পরিমাণ আলাদা হতে পারে। যেমন, ২২০ মিলিগ্রাম জিঙ্ক সালফেটের কোনও প্রস্তুতিতে প্রায় ৫০ মিলিগ্রাম এলিমেন্টাল জিঙ্ক থাকতে পারে। তবে যৌগ ও প্রস্তুতির ধরন অনুযায়ী পরিমাণ বদলায়।
এর পর সব সাপ্লিমেন্ট থেকে পাওয়া জিঙ্কের পরিমাণ যোগ করুন। খাবার থেকেও জিঙ্ক পাওয়া যায়, তাই সেটিও হিসাবে রাখা জরুরি।
দীর্ঘদিন ধরে দৈনিক মোট গ্রহণ ৪০ মিলিগ্রাম ছাড়িয়ে গেলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে আলোচনা করে সাপ্লিমেন্টের তালিকা পর্যালোচনা করুন। তবে এক দিন এই সীমা পেরোলেই বিষক্রিয়া হয়েছে, এমন নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে মাত্রা, গ্রহণের সময়কাল এবং ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার উপর।
কয়েক মাস ধরে বেশি মাত্রায় জিঙ্ক খেয়ে থাকলে চিকিৎসককে সাপ্লিমেন্টের তালিকা দেখান। তামার ঘাটতি পরীক্ষা করা প্রয়োজন কি না, জেনে নিন। নিজের সিদ্ধান্তে তামার সাপ্লিমেন্ট শুরু করবেন না।
ওষুধের সঙ্গেও হতে পারে সমস্যা
জিঙ্ক কিছু অ্যান্টিবায়োটিকের শোষণে বাধা দিতে পারে। বিশেষ করে টেট্রাসাইক্লিন ও কুইনোলোন শ্রেণির কিছু অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে জিঙ্ক একসঙ্গে গ্রহণ করলে ওষুধের কার্যকারিতা প্রভাবিত হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে কতটা ব্যবধান রাখতে হবে, তা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে জেনে নিন।
তবে জিঙ্কসমৃদ্ধ খাবার নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই। ডাল, বীজ, বাদাম ও দইয়ের মতো খাবার সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। উদ্বেগের মূল জায়গা হল প্রয়োজন ছাড়াই একাধিক সাপ্লিমেন্ট থেকে অতিরিক্ত জিঙ্ক গ্রহণ।
চিকিৎসকের পরামর্শে কোনও নির্দিষ্ট সমস্যার জন্য বেশি মাত্রায় জিঙ্ক খেলে নিজের সিদ্ধান্তে তা বন্ধ করবেন না। বরং ওই মাত্রা এখনও প্রয়োজন কি না, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করুন।
মনে রাখবেন, বেশি মানেই বেশি উপকার নয়। শরীরের প্রয়োজন মেটাতে জিঙ্ক জরুরি, কিন্তু অতিরিক্ত গ্রহণে পুষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তাই নতুন সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে পুরনো সাপ্লিমেন্টগুলির সঙ্গে তার উপাদান মিলিয়ে দেখুন। ছোট্ট এই অভ্যাসই অজান্তে অতিরিক্ত জিঙ্ক গ্রহণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।