বংশে উচ্চ কোলেস্টেরলের ইতিহাস রয়েছে? তা বলে রক্তে ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বাড়বেই, এমন নয়। জিনের প্রভাব থাকলেও প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস সেই ঝুঁকি কতটা প্রকাশ পাবে, তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। চেন্নাইয়ের ১,০২০ জন প্রাপ্তবয়স্কের উপর করা একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই ইঙ্গিত। গবেষকদের দাবি, যাঁদের বংশগত ভাবে এলডিএল বা ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি, তাঁদের মধ্যে নিম্নমানের খাদ্যাভ্যাস অনুসরণকারীদের মোট কোলেস্টেরল ও এলডিএলের মাত্রাও বেশি। কিন্তু মাঝারি বা উন্নত মানের খাদ্যাভ্যাস যাঁরা মেনে চলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক উল্লেখযোগ্য ছিল না।

অর্থাৎ, জিনের হাতে সবটা ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। খাবারের থালাতেও রয়েছে ঝুঁকি সামলানোর সুযোগ।

গবেষণায় কী উঠে এল?

গবেষণাপত্রটির অন্যতম লেখক, ডক্টর মোহনস ডায়াবেটিস স্পেশালিটিজ সেন্টার এবং মাদ্রাজ ডায়াবেটিস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ডা. ভি মোহনের কথায়, বিপাকজনিত রোগের ঝুঁকিতে জিনের প্রভাব থাকলেও খাদ্যাভ্যাস সেই ঝুঁকি কী ভাবে প্রকাশ পাবে, তা বদলে দিতে পারে। তাঁর মতে, উচ্চ কোলেস্টেরল বা ডায়াবেটিসের বংশগত প্রবণতা থাকলেও স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিয়ে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো সম্ভব।

‘লো ডায়েট কোয়ালিটি ইনক্রিজেস দ্য জেনেটিক রিস্ক অব হাই ব্লাড কোলেস্টেরল লেভেলস ইন এশিয়ান ইন্ডিয়ান অ্যাডাল্টস [কিউরস–১৬৫]’ শীর্ষক গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘প্লস ওয়ান’ সাময়িকীতে। চেন্নাইয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা ‘চেন্নাই আরবান রুরাল এপিডেমিয়োলজি স্টাডি’ বা কিউরসের তথ্যের ভিত্তিতে এই গবেষণা করা হয়েছে।

গবেষণায় অংশ নিয়েছিলেন ২৫ থেকে ৮০ বছর বয়সি ১,০২০ জন প্রাপ্তবয়স্ক—৪৫২ জন পুরুষ এবং ৫৬৮ জন মহিলা। গবেষকেরা তিনটি জিনগত ভিন্নতা পরীক্ষা করে অংশগ্রহণকারীদের সম্মিলিত বংশগত ঝুঁকির সূচক তৈরি করেন। পাশাপাশি, তাঁদের খাদ্যাভ্যাসের মান বিচার করা হয় ‘ইন্ডিয়ান ডায়েট কোয়ালিটি স্কোর’-এর সাহায্যে।

এই স্কোর তৈরির ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছিল আটটি খাদ্যগোষ্ঠী বা উপাদান—ডাল ও ডালজাতীয় শস্য, ফল ও শাকসব্জি, দুধজাত খাবার, সাদা চাল, ভোজ্য তেল ও চর্বি, খাবারে যোগ করা চিনি, বাড়তি নুন এবং পোলট্রির মাংস ও ডিম।

দেখা যায়, নিম্নমানের খাদ্যাভ্যাসের গোষ্ঠীতে বংশগত ঝুঁকির সূচক বেশি হলে মোট কোলেস্টেরল ও এলডিএলের মাত্রাও উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি ছিল। কিন্তু মাঝারি ও উন্নত মানের খাদ্যাভ্যাসের গোষ্ঠীতে এই পার্থক্য পরিসংখ্যানগত ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল না। অর্থাৎ, খাদ্যাভ্যাসের মান এবং বংশগত ঝুঁকির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে স্বাস্থ্যকর খাবার বংশগত ঝুঁকি পুরোপুরি মুছে দিতে পারে।

গবেষণায় বংশগত ঝুঁকির সূচকের সঙ্গে খালি পেটে রক্তে শর্করার মাত্রা এবং এইচবিএ১সি-র সম্পর্কও পাওয়া গিয়েছে। এইচবিএ১সি পরীক্ষায় আগের প্রায় দুই থেকে তিন মাসের গড় রক্তে শর্করার মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

জিন পরীক্ষা নয়, বদল আনুন থালায়

খাদ্যাভ্যাস বদলানোর জন্য জিন পরীক্ষার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই বলেই মনে করেন ডা. মোহন। তাঁর বক্তব্য, নির্দিষ্ট কিছু জিনগত ভিন্নতা উচ্চ কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কিন্তু সেই প্রবণতার পাশাপাশি মানুষ কী খাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

চেন্নাইয়ে গবেষণা হলেও ফলাফল শুধু তামিল জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এমন নয় বলে জানিয়েছেন তিনি। কিউরসের নমুনায় বিভিন্ন ভাষাভাষী ও সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছেন। তেলুগুভাষী, মাড়োয়ারি, জৈন, বাঙালি এবং উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাসিন্দারাও চেন্নাইয়ের জনসংখ্যার অংশ।

এ প্রসঙ্গে দেশজুড়ে পরিচালিত আইসিএমআর–ইন্ডিয়াব গবেষণার কথাও উল্লেখ করেছেন ডা. মোহন। বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যের সূচক নিয়ে করা সেই গবেষণায় আঞ্চলিক খাদ্যাভ্যাসের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও শর্করা গ্রহণ ও ডায়াবেটিসের মধ্যে একই ধরনের কিছু প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।

তাঁর বক্তব্য, প্রধান খাবার পাউরুটি, চাপাটি না সাদা ভাত—সেটিই একমাত্র বিবেচ্য নয়। শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় কতটা বেশি শর্করা খাওয়া হচ্ছে, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস কেমন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বেশি শর্করা, বিপাকে কী প্রভাব?

শরীরের শক্তির প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শর্করা খেলে তার অতিরিক্ত অংশ যকৃতে চর্বিতে রূপান্তরিত হতে পারে। এর ফলে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়তে পারে এবং রক্তে চর্বি পরিবহণকারী বিভিন্ন কণার গঠনেও পরিবর্তন আসতে পারে।

এই প্রক্রিয়ায় এলডিএল কণার বৈশিষ্ট্য বদলে গিয়ে ছোট ও ঘন কণা তৈরি হতে পারে, যা ধমনিতে চর্বির আস্তরণ জমার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। একই সঙ্গে ‘ভাল’ কোলেস্টেরল বা এইচডিএলের মাত্রাও কমতে পারে।

তবে বিষয়টি এতটা সরল নয় যে বেশি শর্করা খেলেই প্রত্যেকের এলডিএল বেড়ে যাবে। ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি থাকলেও মোট এলডিএল স্বাভাবিক থাকতে পারে। আবার এলডিএলের মাত্রা স্বাভাবিক দেখালেও কণার বৈশিষ্ট্য ঝুঁকির ইঙ্গিত দিতে পারে। কতটা ও কী ধরনের শর্করা খাওয়া হচ্ছে, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস এবং ব্যক্তির বিপাকীয় বৈশিষ্ট্যের উপর এই প্রভাব নির্ভর করে।

অতিরিক্ত শর্করা গ্রহণ ওজন বৃদ্ধি এবং ইনসুলিন প্রতিরোধের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তাই পরিশোধিত শস্যের কিছুটা বদলে গোটা শস্য, ডাল, শাকসব্জি এবং অন্যান্য আঁশসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী হতে পারে।

ভাত-রুটি বাদ নয়, বাছুন বুঝেশুনে

ডা. মোহনের মতে, অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করা গ্রহণ খাদ্যাভ্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গা। অতিরিক্ত পালিশ করা সাদা চালের বদলে বাদামি চাল এবং ময়দার বদলে গোটা গমের আটা বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে শুধু একটি শস্য বদলালেই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

রান্নার তেল বাছার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা জরুরি। নারকেল তেল, পাম তেল, ঘি ও মাখনে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি। অন্য দিকে, চিনাবাদাম, সর্ষে, তিল ও সূর্যমুখীর তেলে অসম্পৃক্ত চর্বি থাকে। সম্পৃক্ত চর্বির বদলে অসম্পৃক্ত চর্বি গ্রহণ করলে এলডিএল কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য হতে পারে।

তবে গবেষকেরা কোনও একটি নির্দিষ্ট খাবার বা তেলের প্রভাব আলাদা করে পরীক্ষা করেননি। তাঁরা বিচার করেছেন সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের মান। তাই কোনও একটি খাবারই গবেষণায় দেখা কোলেস্টেরলের পার্থক্যের জন্য দায়ী, এমন সিদ্ধান্ত টানা যাবে না।

গবেষণাপত্রের সহলেখক এবং ডক্টর মোহনস ডায়াবেটিস স্পেশালিটিজ সেন্টারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা. আর এম অঞ্জনার মতে, শরীরের স্বাস্থ্যে কোনও একটি খাবারের বদলে গোটা খাদ্যতালিকারই ভূমিকা রয়েছে। অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করা, মিষ্টি, চিনিযুক্ত পানীয় এবং সম্পৃক্ত চর্বি ও ট্রান্স ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার সীমিত রাখা প্রয়োজন। তাঁর পরামর্শ, খাবারের কোনও একটি গোষ্ঠী পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখার দিকে নজর দেওয়া উচিত।

থালার অর্ধেক থাকুক ফল-সব্জি

স্বাস্থ্যকর ভারতীয় খাবারের জন্য একটি সহজ পদ্ধতির কথা বলেছেন ডা. অঞ্জনা। তাঁর পরামর্শ, থালার অর্ধেক জুড়ে থাকুক ফল ও শাকসব্জি, যার মধ্যে সবুজ পাতাযুক্ত শাকও থাকবে। বাকি অর্ধেকের এক ভাগে থাকবে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং অন্য ভাগে শ্বেতসারবিহীন শাকসব্জি বা উপযুক্ত অন্যান্য খাবার। সঙ্গে রাখা যেতে পারে জল এবং দুধ বা দইয়ের মতো দুগ্ধজাত খাবার।

তবে এই অনুপাত সবার জন্য এক নয়। ব্যক্তির বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই, ডায়াবেটিসের উপস্থিতি এবং অন্যান্য পুষ্টিগত প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনতে হতে পারে।

যেখানে সম্ভব, কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নেওয়াও ভাল। ফলের রস বা প্যাকেটজাত ফলের পানীয়ের বদলে গোটা ফল খাওয়া বেশি উপকারী। গাজর, শসা ও টম্যাটোর মতো কাঁচা খাওয়ার উপযোগী সব্জি ভাল করে ধুয়ে খেতে হবে। অন্য সব্জি প্রয়োজনমতো রান্না করে নেওয়া যায়।

ডা. অঞ্জনার পরামর্শ, প্যাকেটজাত ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের উপর নির্ভরতা যতটা সম্ভব কমানো উচিত। তবে ব্যস্ত জীবনে সব সময় তা সম্ভব হয় না। তাই একেবারে নিখুঁত খাদ্যতালিকার পিছনে না ছুটে প্রতিদিনের খাবারে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনাই বাস্তবসম্মত পথ।

খাবারে নিয়ন্ত্রণ, প্রয়োজনে ওষুধও

খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনে কোলেস্টেরলের উন্নতি হতে পারে, কিন্তু তার মাত্রা ব্যক্তিভেদে আলাদা। ডা. অঞ্জনার মতে, খাবারের পরিবর্তন ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রায় বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এলডিএল বেশি হওয়ার পারিবারিক প্রবণতা থাকলে শুধু খাদ্যাভ্যাস বদলেই সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।

জীবনযাত্রার পরিবর্তন সত্ত্বেও কোলেস্টেরল বেশি থাকলে ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। এলডিএল সামান্য বেশি থাকলে খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের মাধ্যমে উন্নতি সম্ভব হলেও মাত্রা অনেক বেশি হলে চিকিৎসক ওষুধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তাই বংশে উচ্চ কোলেস্টেরলের ইতিহাস থাকলে নিয়মিত পরীক্ষা করানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঝুঁকি মূল্যায়ন করা জরুরি। কোলেস্টেরল নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি থাকলে শুধু খাবার বদলের ভরসায় চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।

শেষ কথা, জিনগত ঝুঁকি থাকলেও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা গুরুত্বপূর্ণ। তবে খাবারই সব সমস্যার সমাধান নয়। সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, প্রয়োজনমতো পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা—এই চারটির সমন্বয়েই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ তৈরি হতে পারে।