ঘুম থেকে উঠেই পেট চোঁ চোঁ করছে না? তা বলে কি ডায়াবেটিসের ভয় পেতে হবে? একেবারেই নয়। সকালে খিদে না-পাওয়ার পিছনে থাকতে পারে রাতের খাবারের সময়, ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ কিংবা শরীরের নিজস্ব জৈব ছন্দ। রক্তে শর্করার ওঠানামাও কারও কারও ক্ষুধায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুধু সকালে খিদে না-পাওয়াকে ইনসুলিন প্রতিরোধ বা ডায়াবেটিসের লক্ষণ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
পিএসআরআই হাসপাতালের এন্ডোক্রিনোলজি ও ডায়াবেটোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট চিকিৎসক হিমিকা চাওলার কথায়, সকালে খিদে না-পাওয়ার অর্থ এই নয় যে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে নেই। বিপাকক্রিয়া, হরমোনের পরিবর্তন, ঘুমের মান, মানসিক চাপ এবং খাদ্যাভ্যাস—সব কিছুরই প্রভাব পড়ে ক্ষুধার উপর।
রাতের খাবারেও লুকিয়ে উত্তর!
রাতে পেট ভরে খেয়েছেন, কিংবা ঘুমোতে যাওয়ার ঠিক আগে খাবার খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে? তা হলে সকালে ঘুম ভাঙার পরেও পেট ভরা লাগতে পারে। চিকিৎসক চাওলা জানান, রাতে বেশি খাবার খেলে পরের দিন সকালে ক্ষুধা কম লাগা অস্বাভাবিক নয়।
শুধু খাবারের পরিমাণ নয়, কখন খাচ্ছেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত গভীর রাতে খাওয়া কিংবা অনিয়মিত সময়ে ভারী খাবার খাওয়ার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ক্ষুধার ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন এমন অভ্যাস চললে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উপরেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
ঘুম কম, ক্ষুধারও হেরফের
রাতের ঘুম ঠিকঠাক না-হলে শরীরের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন এবং মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় পরিবর্তন আসতে পারে। এর ফলে কারও খিদে বেড়ে যায়, কারও আবার কমে যায়। বিশেষ ধরনের খাবারের প্রতি আকর্ষণও বাড়তে পারে।
তবে এক দিন দেরিতে রাতের খাবার খাওয়া কিংবা এক রাত কম ঘুমোনো মানেই বিপাকক্রিয়ায় গোলমাল রয়েছে, এমন নয়। ক্ষুধার স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া, রাতে সুষম আহার করা এবং প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমোনোর পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
ডায়াবেটিসের সঙ্গে সম্পর্কটা কী?
ইনসুলিন প্রতিরোধ এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীরের কোষগুলি ইনসুলিনের প্রতি যথাযথ সাড়া দিতে পারে না। ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে শরীরের সমস্যা হয়। সময়ের সঙ্গে এই সমস্যা বাড়লে এবং শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে বা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে না-পারলে টাইপ ২ ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে।
কিন্তু সকালে খিদে না-পাওয়া ইনসুলিন প্রতিরোধ কিংবা ডায়াবেটিসের নির্ভরযোগ্য লক্ষণ নয়। চিকিৎসক চাওলার ব্যাখ্যা, রক্তে শর্করার ওঠানামা কিছু মানুষের ক্ষুধায় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে শুধু সকালের খিদে দেখে শরীরে বিপাকীয় সমস্যা রয়েছে কি না, তা বোঝা সম্ভব নয়।
কখন সতর্ক হবেন?
সকালে খিদে কম লাগা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উদ্বেগের কারণ নয়। সারা দিনে পর্যাপ্ত খাবার খেতে পারছেন, ওজন স্থিতিশীল রয়েছে এবং অন্য কোনও উপসর্গ নেই—এমন হলে সাধারণত দুশ্চিন্তার প্রয়োজন পড়ে না।
তবে ক্ষুধার পরিবর্তন দীর্ঘদিন ধরে চললে, বিশেষত তার সঙ্গে অন্য উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। যেমন—
কারণ ছাড়াই ওজন কমা: খাদ্যাভ্যাস বা শারীরিক পরিশ্রমে পরিবর্তন না-হওয়া সত্ত্বেও ওজন কমতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি: সব সময় দুর্বল লাগা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি হরমোনজনিত কিংবা বিপাকীয় সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
অতিরিক্ত তেষ্টা ও ঘন ঘন প্রস্রাব: রক্তে শর্করা বেড়ে গেলে এই উপসর্গগুলি দেখা দিতে পারে। কখনও দৃষ্টিও ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।
মাথা ঘোরা, ঘাম, কাঁপুনি বা বুক ধড়ফড়: কিছু ক্ষেত্রে এগুলি রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে। বিশেষত, যাঁরা ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর নির্দিষ্ট ওষুধ খান, তাঁদের সতর্ক থাকা জরুরি।
এই উপসর্গগুলি মানেই ডায়াবেটিস হয়েছে, এমন নয়। পরিপাকতন্ত্র, হরমোন কিংবা বিপাকক্রিয়ার অন্য সমস্যাতেও এমন হতে পারে। তাই উপসর্গ বারবার দেখা দিলে বা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
প্রয়োজন বুঝে চিকিৎসক খালি পেটে রক্তে গ্লুকোজের পরীক্ষা কিংবা এইচবিএ১সি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিতে পারেন। এইচবিএ১সি পরীক্ষার মাধ্যমে গত দুই থেকে তিন মাসের গড় রক্তে শর্করার মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
খিদে নেই, তবু কি প্রাতরাশ জরুরি?
সকালে খিদে না-পেলেই জোর করে ভারী প্রাতরাশ খেতে হবে, এমন কোনও নিয়ম নেই। চিকিৎসক চাওলার মতে, সারা দিনে প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা গেলে অনেকেই খিদে পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন।
তবে যাঁরা ডায়াবেটিসের জন্য ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ খান, তাঁদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা। কিছু ওষুধের প্রভাবে খাবার খেতে দেরি করলে কিংবা কোনও বেলার খাবার বাদ দিলে রক্তে শর্করা বিপজ্জনক মাত্রায় কমে যেতে পারে। তাই তাঁদের খাবারের সময়সূচি নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
আর প্রাতরাশ দেরিতে খেলেও পাতে যেন সুষম খাবার থাকে। শুধু মিষ্টি পানীয়, বিস্কুট বা অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করাজাতীয় খাবারের উপর নির্ভর না-করে প্রোটিন, আঁশ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে, এমন খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
মনে রাখবেন, সকালে খিদে না-পাওয়া নিজে কোনও রোগের প্রমাণ নয়। নিজের শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বুঝুন, নিয়মিত ঘুম ও খাবারের অভ্যাস বজায় রাখুন। আর ক্ষুধার পরিবর্তনের সঙ্গে অন্য উপসর্গ দেখা দিলে অনুমানের উপর নির্ভর না-করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।