ক্যানসারের ওষুধের সংশোধিত সর্বোচ্চ খুচরো মূল্যের (এমআরপি) যে তালিকা জাতীয় ওষুধ মূল্য নির্ধারণ কর্তৃপক্ষ (এনপিপিএ) প্রকাশ করেছে, তা ওষুধের অতিরিক্ত দাম ধার্য করা এবং রোগীদের শোষণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ এই অভিযোগ করেছেন জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের কর্মীরা।
কেন্দ্রীয় রাসায়নিক ও সার মন্ত্রকের ওষুধ দফতরের অধীন এনপিপিএ ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ৫৪৩টি ব্র্যান্ডের ওষুধের সংশোধিত এমআরপি-র তালিকা প্রকাশ করেছে। নতুন দাম কার্যকর হবে ৯ নভেম্বর থেকে।
বুধবার কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “সংস্থাগুলি ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ পর্যন্ত যে তথ্য জমা দিয়েছে, তার ভিত্তিতে সংশোধিত মূল্যতালিকা তৈরি হয়েছে। তফসিলবহির্ভূত ক্যানসারের ওষুধের সংশোধিত দাম প্রস্তুতকারকেরা জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই তালিকা হালনাগাদ করা হবে।”
এর আগে, ১৭ অক্টোবর জনস্বার্থে ১৩৭টি তফসিলবহির্ভূত ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রে ‘ট্রেড মার্জিন র্যাশনালাইজেশন’ বা টিএমআর ঘোষণা করেছিল এনপিপিএ। ওষুধের বিপণন ও বণ্টনের বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত মার্জিন নিয়ন্ত্রণ, ক্যানসারের চিকিৎসার খরচ কমানো এবং রোগীদের কাছে ওষুধ আরও সহজলভ্য করাই এর উদ্দেশ্য। প্রস্তুতকারকদের সংশোধিত মূল্যতালিকা এনপিপিএ-র কাছে জমা দিতে বলা হয়েছিল।
এই ১৩৭টি ওষুধের মধ্যে রয়েছে কুড়িটিরও বেশি ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইমিউনোথেরাপির ওষুধ; স্তন ও প্রস্টেট ক্যানসারের রোগীদের জন্য ব্যবহৃত ডেনোসুম্যাব; ক্যানসার রোগীদের নিউট্রোপেনিয়া, অর্থাৎ রক্তে নিউট্রোফিল নামের শ্বেতরক্তকণিকার ঘাটতি প্রতিরোধে ব্যবহৃত পেগফিলগ্রাস্টিম; এবং কোলন, ডিম্বাশয় ও জরায়ুমুখের ক্যানসারের চিকিৎসায় অনুমোদিত বেভাসিজুম্যাব।
ওষুধের সহজলভ্যতার দাবিতে কাজ করা সংগঠন জনস্বাস্থ্য অভিযান ইন্ডিয়া (জেএসএ ইন্ডিয়া) জানিয়েছে, উৎপাদনব্যয়ের ভিত্তিতে মূল্যনিয়ন্ত্রণ চালু হলে ওষুধের দাম আরও কমানো এবং মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা রোখা সম্ভব। তাদের বক্তব্য, শুধু বাণিজ্যিক মার্জিন নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। জীবনদায়ী ক্যানসার চিকিৎসা রোগীর নাগালে থাকতে হবে তাঁর চিকিৎসাগত প্রয়োজনের ভিত্তিতে, টাকা দেওয়ার ক্ষমতার ভিত্তিতে নয়।
এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানিয়েছে, “উদাহরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, প্যালবোসিক্লিবের একটি ব্র্যান্ডের ঘোষিত এমআরপি প্যাকেটপিছু প্রায় ৪০,৪২১ টাকা থেকে কমে হয়েছে ২,৭২০ টাকা। অন্য দিকে, থায়োটেপার দাম ভায়ালপিছু প্রায় ৮০,০৭২ টাকা থেকে নেমে হয়েছে ৭,১৫০ টাকা। এত বিপুল মূল্যহ্রাস ওষুধ সংস্থাগুলির দাম নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। এর মধ্যে ভারতের বড় জেনেরিক ক্যানসারের ওষুধ প্রস্তুতকারকেরাও রয়েছেন। অভিযোগ, তাঁরা বিপণন ও বণ্টনের স্তরে বিপুল মার্জিনের সুযোগ দিয়েছেন, অথচ রোগীদের কাছে ওষুধের দাম অধরাই থেকে গিয়েছে।”
সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, পেটেন্টের আওতায় থাকা বেশ কিছু ক্যানসারের ওষুধের দাম এখনও অস্বাভাবিক বেশি। তাদের অভিযোগ, টিএমআর নীতি ওষুধকে রোগীদের আর্থিক নাগালের মধ্যে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। তার উপর, ‘পেশেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম’ বা রোগী সহায়তা কর্মসূচির অধীনে বিনামূল্যে দেওয়া ওষুধকে হিসাবের বাইরে রাখায় এই নীতি থেকে রোগীদের সম্ভাব্য সুবিধা আরও সীমিত হয়েছে।
জেএসএ-র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই নীতির হিসাবপদ্ধতিতেও গভীর ত্রুটি রয়েছে। স্টকিস্ট যে দামে ওষুধ কেনেন, সেই ‘প্রাইস টু স্টকিস্ট’ বা পিটিএস-এর উপর ৪২.৮ শতাংশ বাড়তি দাম ধার্য করার অনুমতি আসলে অতিরিক্ত মার্জিনকেই বৈধতা দেয়। বিশেষ করে এমন একটি সরবরাহব্যবস্থায়, যেখানে অনেক ক্ষেত্রেই মাত্র এক বা দু’জন মধ্যবর্তী ব্যবসায়ী থাকেন, অথবা সরাসরি হাসপাতালে ওষুধ বিক্রি হয়। ওষুধ মূল্য নিয়ন্ত্রণ আদেশ বা ডিপিসিও কাঠামোর আওতায় তফসিলভুক্ত ওষুধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ১৬ শতাংশ মার্জিনের মতো অনেক কম হারে বাড়তি দাম ধার্য করার অনুমতি দিলে রোগীরা আরও বেশি উপকৃত হতেন।”
সংগঠনটির বক্তব্য, এক বার এমআরপি কমালেই সমস্যার সমাধান হবে না। মার্জিনের উপর স্থায়ী এবং কার্যকর ভাবে প্রয়োগযোগ্য ঊর্ধ্বসীমা, নিয়মিত নজরদারি ও এনপিপিএ-র যাচাই ছাড়া অতিরিক্ত দাম নেওয়ার প্রবণতা বহাল থাকতে পারে, অথবা আবার ফিরে আসতে পারে।
সরবরাহব্যবস্থা ও বিভিন্ন বণ্টনপথে ওষুধের দামের তথ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের ব্যবস্থাও এনপিপিএ-কে আরও শক্তিশালী করতে হবে বলে জানিয়েছে জেএসএ। তাদের মতে, পর্যাপ্ত স্বাধীন যাচাই ছাড়া সংস্থাগুলিকেই সংশোধিত এমআরপি হিসাব করে জমা দেওয়ার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
এমওসি ক্যানসার কেয়ারের মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট তন্বী সিংহ বলেন, ক্যানসারের চিকিৎসায় নানা ধরনের ব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। ওষুধের খরচ বেশি হলে রোগীরা চিকিৎসা শুরু করতে দেরি করতে পারেন, নির্ধারিত ডোজ বাদ দিতে পারেন, এমনকি চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই বন্ধ করে দিতে পারেন। এর প্রতিটিই চিকিৎসার ফলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তাঁর কথায়, “ওষুধের খরচ কমানো অত্যন্ত জরুরি। এতে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সহজ হয়, চিকিৎসাজনিত আর্থিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা কমে এবং রোগীরা নির্ধারিত চিকিৎসা সম্পূর্ণ করতে পারেন। তবে শুধু দামের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া যথেষ্ট নয়। চিকিৎসাকে আর্থিক ভাবে নাগালের মধ্যে আনার ক্ষেত্রে অর্থবহ ও পর্যাপ্ত উন্নতি তখনই হবে, যখন মূল্যনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আরও বেশি মানুষকে বিমার আওতায় আনা হবে, সরকারি চিকিৎসা-ব্যয় পরিশোধের প্রকল্পগুলি সম্প্রসারিত হবে, গুণমানসম্পন্ন জেনেরিক ও বায়োসিমিলার ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়বে, রোগী সহায়তা কর্মসূচিগুলি শক্তিশালী হবে এবং দেশজুড়ে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার চিকিৎসা আরও সহজলভ্য হবে।”
বেঙ্গালুরুর কিমস হাসপাতালের ম্যাকস-রেনোভা অনকোলজি ইনস্টিটিউটের অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সন্দীপ নায়েক বলেন, “সরকার যে মূল্যনিয়ন্ত্রণ চালু করেছে, তা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে কম দামে জীবনদায়ী ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রি করাও যাতে আর্থিক ভাবে কার্যকর থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।”
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।