চিত্তুরে এক দশকে ৪৯টি হাতির মৃত্যু, ১,১৬৬টি ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা চিহ্নিত; বিপজ্জনক ১৫০টি স্থানে এক মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ জেলাশাসকের
অন্ধ্রপ্রদেশের চিত্তুরে হাতির মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে বিদ্যুতের তার। ২০১৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে নথিভুক্ত ৪৯টি হাতির মৃত্যুর মধ্যে ৩২টিরই কারণ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া। অর্থাৎ, গত এক দশকে নথিভুক্ত হাতির মৃত্যুর প্রায় ৬৫ শতাংশই ঘটেছে বিদ্যুতের কারণে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বন দফতর ও বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাকে যৌথ ভাবে কাজ করার নির্দেশ দিলেন চিত্তুরের জেলাশাসক সুমিত কুমার।
গত শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, বন দফতর ও অন্ধ্রপ্রদেশ সাদার্ন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (এপিএসপিডিসিএল) আধিকারিকদের নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটির বৈঠক করেন জেলাশাসক। সেখানেই হাতির মৃত্যুর পরিসংখ্যান পর্যালোচনার পাশাপাশি বিপজ্জনক বিদ্যুৎ পরিকাঠামো চিহ্নিত করে দ্রুত মেরামতির নির্দেশ দেওয়া হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্য বন্যপ্রাণ সংরক্ষক রাহুল পাণ্ডে, মুখ্য বন সংরক্ষক (ব্যাঘ্র সংরক্ষণ প্রকল্প) সি. সেলভম এবং চিত্তুরের বিভাগীয় বনাধিকারিক জি. সুব্বুরাজ।
বন দফতরের সরেজমিন সমীক্ষায় পাঁচটি বনাঞ্চলে নিচু দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের তারের কারণে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মোট ১,১৬৬টি জায়গা। তালিকায় রয়েছে কুপ্পম, পালামানের, পুঙ্গানুর, চিত্তুর পূর্ব এবং চিত্তুর পশ্চিম বনাঞ্চল।
জেলাশাসক জানান, চিহ্নিত জায়গাগুলির মধ্যে ৪৮৪টিতে বিদ্যুতের তার মাটি থেকে মাত্র ছ’ফুট বা তারও কম উচ্চতায় ঝুলছে। ফলে হাতির সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা যথেষ্ট বেশি। এর মধ্যে ১৫০টি জায়গাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এক বছরেই মৃত্যু পাঁচ হাতির
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যাচ্ছে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানেও। শুধু ২০২৬ সালেই চিত্তুর অঞ্চলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পাঁচটি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ঘটনায় জড়িত ছিল বিদ্যুতের বেআইনি ব্যবহার। বন্যপ্রাণী শিকারের জন্য বিদ্যুৎবাহী ফাঁদ পাতা এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত পাম্পের মোটরে অবৈধ বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়ার মতো ঘটনা এই তালিকায় রয়েছে। বাকি দু’টি মৃত্যুর কারণ ছিল বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার পরিকাঠামোগত ত্রুটি।
গত ২৪ অক্টোবর চিত্তুর পশ্চিম বনাঞ্চলের চুক্কাভারিপল্লিতে একটি হাতির মৃত্যুর ঘটনাও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। জেলাশাসক জানিয়েছেন, ওই এলাকায় নিচু হয়ে ঝুলে থাকা বিদ্যুতের তারের বিপদ সম্পর্কে ২০২৩ সাল থেকেই একাধিক বার জানানো হয়েছিল। তা সত্ত্বেও সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এক মাসে বিপজ্জনক তার সরানোর নির্দেশ
বিপদের তালিকা তৈরি করেই দায়িত্ব শেষ করতে চাইছে না প্রশাসন। জেলাশাসক জানিয়েছেন, অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত ১৫০টি জায়গার সমস্যা এক মাসের মধ্যে মেটাতে হবে। আর মাটি থেকে ছ’ফুট বা তারও কম উচ্চতায় বিদ্যুতের তার রয়েছে, এমন ৪৮৪টি জায়গায় প্রয়োজনীয় সংশোধনের কাজ শেষ করতে হবে তিন মাসের মধ্যে।
এই লক্ষ্যে একাধিক পদক্ষেপ করা হবে। কোথাও বিদ্যুতের তারের উচ্চতা বাড়ানো হবে, কোথাও তারে নিরোধক আবরণ দেওয়া হবে। ট্রান্সফরমারের চারপাশে সুরক্ষামূলক বেড়া তৈরি, কৃষিকাজে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পৃথক ফিডার চালু এবং অবৈধ বিদ্যুৎ-সংযোগ শনাক্ত করতে নিয়মিত পরিদর্শন জোরদার করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিপদ শুধু বিদ্যুতের তারে নয়
হাতিদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরও একটি সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন জেলাশাসক। বনাঞ্চল সংলগ্ন কৃষিজমিতে থাকা খোলা কুয়োও বন্যপ্রাণীদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
সমীক্ষায় কৃষিকাজে ব্যবহৃত ৪৩০টি খোলা কুয়ো চিহ্নিত করা হয়েছে। তার মধ্যে ২৮৩টিতে কোনও ঢাকনা বা সুরক্ষামূলক ঘের নেই। ফলে হাতি-সহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী অসাবধানতাবশত কুয়োয় পড়ে গিয়ে বিপদের মুখে পড়তে পারে।
বিদ্যুতের তার থেকে খোলা কুয়ো—চিত্তুরের বন্যপ্রাণীদের সামনে বিপদের একাধিক উৎস। প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে চিহ্নিত সমস্যাগুলির সমাধান করা গেলে হাতির মৃত্যু অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব বলে আশা করা হচ্ছে। তবে শুধু পরিকাঠামোগত ত্রুটি মেরামত নয়, বেআইনি বিদ্যুৎ-সংযোগ ও বন্যপ্রাণী শিকারের জন্য বিদ্যুতের ব্যবহার বন্ধ করাও এখন সমান জরুরি।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।