ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করার দাবিতে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ দ্বিতীয় দিনেও তীব্র আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের নাশকতা রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। সোমবার (২ নভেম্বর) সকালে সচিবালয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে যারা বিশৃঙ্খলা ও ষড়যন্ত্রমূলক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাবে, তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
সোমবার সকালে সচিবালয়ে পোশাকশিল্প মালিকদের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠক শেষে তিনি স্পষ্ট জানান, সরকার শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও সুযোগ-সুবিধার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং উৎপাদন ও রপ্তানি সচল রাখতে কাজ করছে। তবে আন্দোলনের নামে কেউ যদি আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, সড়ক অবরোধ করে যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, তবে সরকার তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না।
নাওজোরে পুলিশের তিন গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর
সোমবার দুপুরের দিকে গাজীপুরের নাওজোর এলাকায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ বাধে। এ সময় পুলিশের তিনটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং অপর দুটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। একই সঙ্গে কয়েকটি বাস ও ট্রাকও ভাঙচুর করা হয়।
এর আগে রবিবার কালিয়াকৈরের সফিপুর এলাকায় পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়েছিল এবং কোনাবাড়ীতে একটি পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
সোমবারের সংঘর্ষের সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নাওজোর এলাকায় হামলার শিকার হন সময় টিভির প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপারসন। এ সময় তাঁদের ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। এর আগেও পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের ওপর হামলা, মারধর ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
আশুলিয়ায় কভার্ড ভ্যানে আগুন ও নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ
সোমবার দুপুরের দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকার নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে একটি কভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগ করা হয়। শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মো. মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ওই গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। নরসিংহপুর, নিশ্চিন্তপুর ও কাঠগড়া এলাকার বহু কারখানায় অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ছুটি ঘোষণা করা হয়। এদিকে নরসিংহপুরে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে দুজনকে আটক করেছে আশুলিয়া থানা পুলিশ।
অন্যদিকে, সোমবার দুপুরে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার করার দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ ও অবরোধ করেন নারায়ণগঞ্জের বেশ কিছু পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এর ফলে ওই সড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ও মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত
সোমবার সকাল থেকেই কালিয়াকৈরের সফিপুর, চন্দ্রা, পল্লীবিদ্যুৎ এবং গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া বাইপাস, কোনাবাড়ী ও সালনা এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে অবরোধের কারণে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে গিয়ে পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এ সময় ইটের আঘাতে বিজিবির এক সদস্য আহত হন।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন জানিয়েছেন, সোমবারের শ্রমিক আন্দোলনের মুখে গাজীপুর অঞ্চলে ১৫০টির বেশি কারখানা বন্ধ বা ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
রবিবারের ঘটনায় প্রায় চার হাজার আসামি
গত রবিবার (১ নভেম্বর) গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, কাশিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ওই সব ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মোট তিনটি মামলা দায়ের করেছে (দুটি শিল্প পুলিশ ও একটি গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ)। শিল্প পুলিশ জানিয়েছে, রবিবারের ওই মামলাগুলোতে মোট প্রায় চার হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে এবং এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ স্পষ্ট জানিয়েছে যে, এই মামলা ও গ্রেপ্তারের হিসাব শুধুমাত্র রবিবারের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
শ্রমিকদের দাবি ও সরকারের নতুন মজুরি বোর্ড
আন্দোলনরত শ্রমিকদের প্রধান দাবি হলো—বর্তমান বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সংগতি রেখে ন্যূনতম মাসিক মজুরি অবিলম্বে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে। শ্রমিক নেতা হযরত বিল্লাল গণমাধ্যমকে জানান, অপ্রতুল মজুরি এবং বিভিন্ন কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে নানা বাধার কারণে শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। তবে সহিংসতার দায় সাধারণ ও শান্তিকামী শ্রমিকদের ওপর চাপানো উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উল্লেখ্য, শ্রমিকদের এই লাগাতার আন্দোলনের মুখে সরকার এরই মধ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করে সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। সরকার আশা করছে আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত এই সংকটের সুরাহা হবে, তবে জনজীবন ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।