বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনের মুখে ছয় সদস্যের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করল সরকার। রবিবার, ১ নভেম্বর শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এই ঘোষণা করে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানান। কিন্তু বোর্ড গঠনের খবরেও বিক্ষোভ থামেনি। ঢাকা ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর এসেছে।

শ্রমিকদের দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়ে ৩০ হাজার বাংলাদেশি টাকা করতে হবে। বর্তমানে তা ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ দাবি পূরণ হলে ন্যূনতম মজুরি বর্তমানের দ্বিগুণেরও বেশি হবে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, খাবার, বাড়িভাড়া, যাতায়াত এবং চিকিৎসার খরচ যেভাবে বেড়েছে, তাতে চালু বেতনে সংসার চালানো কঠিন। মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় তাঁদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমশ কমছে।

রবিবার ঢাকার মিরপুরের ব্যস্ত সড়কে শ্রমিকদের অবস্থান ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায়। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, অবরোধ সরাতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়; বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ছোড়ে। গাজিপুরেও মহাসড়ক অবরোধে যান চলাচল ব্যাহত হয়। শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। বেশ কিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়।

নতুন বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়েছে জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা বিচারক শেখ আশফাকুর রহমানকে। নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ। মালিক ও শ্রমিকপক্ষের সাধারণ প্রতিনিধি যথাক্রমে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের আসিফ আইয়ুব এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। পোশাকশিল্পের দু’পক্ষের প্রতিনিধিও রয়েছেন।

পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র পরিচালক এ বি এম শামসুদ্দিন মালিকপক্ষের প্রতিনিধিত্ব করবেন। শ্রমিকদের প্রতিনিধি হয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার। শ্রম মন্ত্রক পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগগুলি জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বোর্ডের চেয়ারম্যানকে।

তবে বোর্ড গঠন মানেই মজুরি বেড়ে যাওয়া নয়। নতুন বেতন কত হবে, কবে থেকে কার্যকর হবে, তা এখনও নির্ধারিত হয়নি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বোর্ডের প্রথম বৈঠক কবে হবে কিংবা সংশোধিত মজুরি কাঠামো কবে ঘোষণা করা হবে, সে সম্পর্কেও তখন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে শ্রমিকদের দাবির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এখনও বাকি।

এর আগের দিনও আশুলিয়া, গাজিপুর এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনে উৎপাদন ব্যাহত হয়। শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, মজুরি বোর্ড দ্রুত গঠনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আবেদন করা হলেও সরকার সময় নিয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি উত্তরায় শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে মিরপুরসহ অন্য শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। শনিবার আশুলিয়ার প্রায় ৩০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করে।

পোশাকশিল্পে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি সংশোধন হয়েছিল ২০২৩ সালে। তখন আট হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে সাড়ে বারো হাজার টাকা করা হয়; কার্যকর হয় ডিসেম্বরে। পরবর্তী শ্রম আইন সংশোধনে মজুরি পর্যালোচনার ব্যবধান পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। শ্রমিক নেতারা চাইছিলেন, ডিসেম্বরের আগেই বোর্ড গড়ে নতুন মজুরি নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হোক।

সরকারের উদ্বেগ, দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকলে রফতানির চালান এবং বিদেশি ক্রেতাদের অর্থপ্রদান বিলম্বিত হতে পারে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ কাজ করেন; রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এই খাত থেকে। ফলে শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব শুধু কারখানায় সীমাবদ্ধ নেই, বৈদেশিক আয় ও অর্থনীতির উপরেও চাপ তৈরি করছে।

মালিকপক্ষের বক্তব্য, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে মজুরি বৃদ্ধি সামলানো কঠিন। অন্যদিকে শ্রমিকেরা ন্যায্য মজুরি চাইছেন। এই দুই অবস্থানের মধ্যে সমাধান খোঁজার দায়িত্ব এখন নতুন বোর্ডের। তবে রবিবারের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করেছে, শুধু বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনের অবসান ঘটানো যায়নি।