হামের টিকা-সংকটের নেপথ্যে কোথায় গলদ ছিল, তা জানতে তদন্ত কমিশন গঠন করল বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বুধবার, ৪ নভেম্বর জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে তিন সদস্যের কমিশনকে বলা হয়েছে টিকা কেনা ও বিতরণে বিলম্ব, অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে। তদন্তের আওতায় আসছে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের গোটা মেয়াদ, ২০২৪-এর ৮ অগস্ট থেকে ২০২৬-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি।

নির্বাচনের দু'দিন আগের চিঠি

বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের দু'দিন আগে, ১০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে চিঠি লিখেছিলেন ইউনিসেফের ঢাকা প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। বার্তা ছিল স্পষ্ট, টিকার জোগানে ঘাটতি আসন্ন। ফ্লাওয়ার্স পরে জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রককে এ নিয়ে পাঁচ থেকে ছ'টি চিঠি পাঠানো হয়েছিল, বৈঠক হয়েছিল অন্তত ১০টি। তাঁর দাবি, ২০২৫-এর অগস্টেই পররাষ্ট্র মন্ত্রকের সঙ্গে বৈঠকে ঘাটতি ও প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকির কথা তুলেছিলেন ইউনিসেফের উপ-নির্বাহী প্রধান টেড শাইবান।

ফেব্রুয়ারির চিঠিতে সতর্কতা শুধু হাম-রুবেলার টিকা নিয়ে ছিল না। পোলিও, টিটেনাস-ডিপথেরিয়া ও যক্ষ্মার টিকার জোগান নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ সংকটের আশঙ্কা ছিল নিয়মিত শিশু-টিকাকরণের একাধিক কর্মসূচি জুড়ে।

কিন্তু চিঠি ও বৈঠকের পর মন্ত্রকের অন্দরে কী হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। মজুতের নতুন হিসাব চাওয়া হয়েছিল কি না, বিকল্প পথে জরুরি জোগানের চেষ্টা হয়েছিল কি না, ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় পরবর্তী সরকারকে কী জানানো হয়েছিল, নথি ও সাক্ষ্যে মিলতে পারে এই প্রশ্নগুলির উত্তর। তদন্তে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে সাহায্য করার কথা জানিয়েছে ইউনিসেফ।

কেনার পদ্ধতি বদলের সময়েই কি ফাঁক?

বিডিনিউজ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ পর্যন্ত ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা কিনত বাংলাদেশ, খরচের বড় অংশ আসত উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার টিকা কেনার খরচ রাজস্ব বাজেটের আওতায় এনে উন্মুক্ত দরপত্রের পথে হাঁটে।

প্রশ্ন উঠছে, এই পদ্ধতি-বদলের মাঝের সময়টা সামলানো হয়েছিল কীভাবে। পুরনো ব্যবস্থায় জোগান কতদিন চলত, নতুন ব্যবস্থায় প্রথম চালান কবে আসার কথা, আর মাঝের সময়ের জন্য হাতে কত টিকা ছিল, এই তিনটি হিসাব জরুরি ছিল। সিদ্ধান্ত কবে হয়েছিল এবং দরপত্র ও সরবরাহের কোন ধাপে কতটা সময় গিয়েছে, সরকারি নথি মিলিয়েই তা দেখতে হবে।

আরও একটি বিষয় কমিশনের নজরে থাকবে। কেন্দ্রীয় গুদামে টিকা মজুত থাকলেও কোনও উপজেলায় নির্ধারিত দিনে টিকাদান বন্ধ থাকতে পারে। আবার টিকা পৌঁছলেও কর্মসূচি ব্যাহত হলে শিশুরা সময়ে ডোজ পায় না। বিডিনিউজ২৪ মনে করিয়েছে, ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানকে ঘিরে অস্থিরতা এবং টিকাদান কর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলনের প্রভাবও পড়েছিল। কোন এলাকায় কতদিন পরিষেবা বিঘ্নিত হয়েছিল, সেই তথ্যই প্রাদুর্ভাবের সময়রেখা বুঝতে সাহায্য করবে।

তদন্তের দাবি থেকে কমিশন: সরকারের অবস্থান বদল

কমিশন গঠনের আগে দফায় দফায় তদন্তের দাবি উঠেছিল। প্রথম আলো মে-র গোড়ায় হামের প্রাদুর্ভাবকে "প্রতিরোধযোগ্য" বলে বর্ণনা করে এবং টিকাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার কথা তুলে ধরে। ৯ মে এক গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী জানান, কেন এতগুলি শিশুর মৃত্যু হল এবং কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্তে দেখা হচ্ছে এবং ফল জানানো হবে। কাদের নিয়ে কমিটি এবং কবে গঠিত, সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি দেননি। প্রথম আলোর একটি মতামত-নিবন্ধে বলা হয়েছিল, ওই সময়ে বিএনপি সরকার দায়িত্বে না থাকলেও স্বচ্ছতার স্বার্থে এখন তাদের উচিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করা, যেখানে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরাও থাকতে পারেন।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের খবর অনুযায়ী, ১৮ মে হাইকোর্টে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদন করা হয়। দু'দিন পরে "তদন্ত কমিশন গঠনে হাইকোর্টের রুল"-এর খবর প্রকাশিত হয়। রিটে ড. ইউনূস-সহ ২৪ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছিল, যা আবেদনকারীর দাবি, আদালতের আদেশ নয়।

তবে ২১ জুন বিডিনিউজ২৪-এর খবর ছিল অন্যরকম। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার তখন বলেছিলেন, আগের সরকারের গাফিলতি সরকারের কাছে "স্পষ্ট", তাই নতুন করে তদন্তের প্রয়োজন তিনি দেখছেন না। সেই অবস্থান থেকে আনুষ্ঠানিক কমিশন গঠনে আসতে সময় লাগল প্রায় পাঁচ মাস।

১,২৬৯ মৃত্যু: হিসাবে দুই ভাগ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৪ নভেম্বর পর্যন্ত হিসাবে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে ১,২৬৯টি। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১০৫, আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ১,১৬৪। শেষ ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গ নিয়ে আরও ছ'জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। মোট সংখ্যা উল্লেখ করার সময় এই দুই শ্রেণির ফারাক মনে রাখা জরুরি।

বিডিনিউজ২৪-এর সময়রেখা অনুযায়ী প্রাদুর্ভাবের শুরু জানুয়ারিতে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে শিশুমৃত্যুর খবর বাড়তে থাকে। এপ্রিলের যৌথ বিবৃতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ জানায়, নিয়মিত টিকা বাদ পড়া ও অসম্পূর্ণ টিকাকরণের জেরে সমাজে ধীরে ধীরে রোগ-প্রতিরোধের ফাঁক তৈরি হয়েছিল। প্রকোপ বেশি এমন এলাকায় হাসপাতালে ভিড়, রোগীকে আলাদা রাখার সীমিত ব্যবস্থা এবং উপযুক্ত কেন্দ্রে রেফার করার সমস্যার কথাও বলেছিল দুই সংস্থা। ফ্লাওয়ার্সও মানছেন, টিকা সংগ্রহের সমস্যার পাশাপাশি আরও কয়েকটি কারণ প্রাদুর্ভাবে ভূমিকা নিয়েছে। জিয়াউদ্দিন হায়দারও মায়েদের অপুষ্টিকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। ফলে মৃত্যুর মোট সংখ্যা থেকে কোনও একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব আলাদা করে মাপা কঠিন।

ক্ষমতা বদলের পর জরুরি অভিযান

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ৫ এপ্রিল ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চঝুঁকির উপজেলায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান শুরু করে। প্রথম দফায় লক্ষ্য ছিল ছ'মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সি ১২ লক্ষেরও বেশি শিশু। ২০ এপ্রিল অভিযান গোটা দেশে ছড়ানোর কথা জানায় ইউনিসেফ। আগে টিকা নেওয়া থাকুক বা না থাকুক, ওই বয়সের প্রতিটি শিশুকে বিনামূল্যে একটি ডোজ দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। নিয়মিত টিকাকেন্দ্রের পাশাপাশি শহরে সন্ধ্যার সেশন এবং কম টিকাকরণের এলাকায় বাড়ি বাড়ি পৌঁছনোর পরিকল্পনাও রাখা হয়েছিল।

মে মাসে ইউনিসেফ প্রতিনিধি জানান, জাতীয় অভিযানে ১ কোটি ৮০ লক্ষ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছেছে বাংলাদেশ। কিন্তু নভেম্বরের সরকারি হিসাবে নতুন মৃত্যুর খবরও রয়েছে। দুই তথ্যের সময় ও মাপকাঠি আলাদা, আর অভিযানে কত ডোজ পড়েছে তা থেকে বোঝা যায় না কোন এলাকায় কত শিশু বাদ থেকে গেল। জরুরি অভিযানের পর নিয়মিত টিকাদান কতটা সচল ছিল এবং পরবর্তী সংক্রমণ কোথায় বেশি ছড়াল, এই হিসাবেই স্পষ্ট হবে বর্তমান সরকারের পদক্ষেপের ফল।

কমিশনে কারা, কী ক্ষমতা

কমিশনের প্রধান হাইকোর্ট বিভাগের প্রাক্তন বিচারপতি মামনুন রহমান। সদস্য বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনসের সভাপতি অধ্যাপক চিকিৎসক মওদুদ হোসেন আলমগীর এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ এন এম মঈনুল ইসলাম। ১৯৫৬ সালের তদন্ত কমিশন আইনে গঠিত এই কমিশন সংশ্লিষ্ট জায়গা পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। প্রশাসনিক সহায়তা ও ব্যয় বহন করবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি ঠেকাতে কী করণীয়, সেই সুপারিশও দিতে হবে কমিশনকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দরপত্রের ফাইল, টিকার মাসভিত্তিক মজুত, জেলা ও উপজেলা স্তরের বিতরণ-রেকর্ড এবং ইউনিসেফের চিঠির জবাব একসঙ্গে মেলালে স্পষ্ট হবে, কোন সিদ্ধান্তের পর কোথায় জোগান আটকাল। সেই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদানের তথ্য মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, জোগানে দেরির প্রভাব কতটা এবং মাঠপর্যায়ের পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার ভূমিকা কতটা। কমিশনের নির্ধারিত মেয়াদ ফেব্রুয়ারিতে শেষ হলেও মার্চের পর সংক্রমণ ও মৃত্যু কীভাবে বেড়েছে, তা বুঝতে পরবর্তী সময়ের স্বাস্থ্যতথ্যও প্রাসঙ্গিক।

শেষ পর্যন্ত রিপোর্টে সতর্কবার্তা পাওয়ার দিন থেকে পরের চালান পৌঁছনোর দিন পর্যন্ত ঘটনাক্রমের একটি স্পষ্ট সময়রেখা চাই। তাতেই বোঝা যাবে, ঘাটতি ঠেকানোর সুযোগ কোথায় ছিল, সিদ্ধান্ত কোন দফতরের হাতে ছিল এবং ভবিষ্যতে মজুত কমে এলে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কার।