হাইলাইটস:
- ভারত ও জাপানের মধ্যে সমুদ্র নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি।
- ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অবাধ, উন্মুক্ত ও নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার পক্ষে যৌথ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত।
- অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে নতুন সহযোগিতার রূপরেখা।
- দুই দেশের প্রথম প্রতিরক্ষা যৌথ-উন্নয়ন চুক্তি স্বাক্ষর।
- প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বললেন, “অস্থির আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ভারত ও জাপানকে ভাই-বোনের মতো একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে।”
বাংলাস্ফিয়ার: ভারত ও জাপান তাদের বিশেষ কৌশলগত ও বৈশ্বিক অংশীদারিত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এমন এক সহযোগিতা কাঠামো ঘোষণা করেছেন, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সমুদ্র নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। এই উদ্যোগকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈঠকের পর তাকাইচি বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অস্থির ও অনিশ্চিত। এই সময়ে ভারত ও জাপানের মতো গণতান্ত্রিক দেশগুলির মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা এবং পরিপূরক সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, দুই দেশকে “ভাই-বোনের মতো” সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যেখানে উভয়েই একে অপরের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যৌথ সমৃদ্ধির পথ তৈরি করবে।
বৈঠকে দুই দেশ সমুদ্র নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। ভারত মহাসাগর ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে নৌ-সহযোগিতা, সামুদ্রিক নজরদারি, নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সমন্বয় আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিশেষ করে নৌবাহিনীর জন্য রেডিও অ্যান্টেনা প্রযুক্তিতে যৌথ সহযোগিতার ঘোষণা দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
প্রথমবারের মতো ভারত ও জাপান যৌথভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উন্নয়নের একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। এতদিন প্রতিরক্ষা মহড়া ও প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা থাকলেও এবার যৌথ গবেষণা ও উৎপাদনের ক্ষেত্রও উন্মুক্ত হলো। এর ফলে ভবিষ্যতে দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
শুধু প্রতিরক্ষা নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছে দিল্লি ও টোকিও। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতা এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে যৌথ বিনিয়োগের জন্য একটি নতুন রূপরেখা গৃহীত হয়েছে। দুই দেশই মনে করছে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদারিত্ব অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেও সহযোগিতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাপানের উন্নত প্রকৌশল দক্ষতা এবং ভারতের সফটওয়্যার সক্ষমতাকে একত্রিত করে বিশ্বমানের উদ্ভাবন গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর, জাহাজ নির্মাণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতেও সহযোগিতা বাড়বে।
বৈঠকে জাপান ভারতের প্রতি নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছে। আগামী দশকে বিপুল জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অবকাঠামো, প্রযুক্তি, উৎপাদন এবং উদ্ভাবন খাতে নতুন গতি আনতে পারে। ইতিমধ্যেই ভারত জাপানের অন্যতম বড় বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে এবং দুই দেশের বাণিজ্যও ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইন্দো-প্যাসিফিক প্রসঙ্গেও দুই নেতা একই সুরে কথা বলেন। তারা অবাধ, উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক সামুদ্রিক ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। যদিও কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবু বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা ও নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
সব মিলিয়ে, এই শীর্ষ বৈঠক স্পষ্ট করে দিল যে ভারত ও জাপানের সম্পর্ক এখন আর শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিরক্ষা, সমুদ্র নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং কৌশলগত সমন্বয়ের বিস্তৃত ক্ষেত্রজুড়ে দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের পথে এগোচ্ছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের মধ্যে এই সম্পর্ক আগামী দিনে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।