হাইলাইটস:
- ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে বুরকিনা ফাসোর সামরিক সরকার।
- ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরের সরকার ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ‘নব্য ঔপনিবেশিক’ আচরণ ও দেশের স্বার্থবিরোধী তৎপরতার অভিযোগ তুলেছে।
- দুই দেশই সাত দিনের মধ্যে একে অপরের দূতাবাস ও কনস্যুলেট বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করছে।
- বুরকিনা ফাসোতে থাকা প্রায় আড়াই হাজার ফরাসি নাগরিক এবং ভিসা-সহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পরিষেবা সরাসরি প্রভাবিত হবে।
- পশ্চিম আফ্রিকায় ফ্রান্সের প্রভাব হ্রাসের ধারায় এটি একটি বড় কূটনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি পর্যন্ত বিশ্বের মাত্র দুটি দেশের সঙ্গে ফ্রান্সের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না—উত্তর কোরিয়া ও আফগানিস্তান। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসো। গত ২৬ জুন দেশটির সামরিক সরকার ঘোষণা করে, তারা ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করছে। সরকার এক বিবৃতিতে অভিযোগ করে, ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে বুরকিনা ফাসোর স্বার্থের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে এবং প্রকাশ্যেই ‘নব্য ঔপনিবেশিক’ নীতি অনুসরণ করছে।
ফরাসি কূটনৈতিক সূত্রগুলির দাবি, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ১৮ জুন বুরকিনা ফাসোতে নাগরিক স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের ওপর দমন-পীড়নের নিন্দা জানিয়ে যে প্রস্তাব গ্রহণ করে, তারই প্রতিক্রিয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন ফ্রান্সের মধ্য-ডানপন্থী নেতা ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য ক্রিস্তফ গোমার। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকেই ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হয়ে ওঠে। ক্ষমতায় এসে তিনি ‘জনগণের প্রগতিশীল বিপ্লব’-এর কথা ঘোষণা করেন এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় সার্বভৌমত্বকে সামনে রেখে ফ্রান্সবিরোধী অবস্থান নেন এবং অভিযোগ করেন, প্যারিস তাঁর সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছে।
এর আগে ২০২২ সালের শেষদিকে ফরাসি রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করা হয়। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে মোতায়েন প্রায় ৪০০ জন ফরাসি বিশেষ বাহিনীর সদস্যকেও চলে যেতে বাধ্য করা হয়। ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। অতীতে সুয়েজ সংকটের পর মিশর, সিরিয়া ও জর্ডন সাময়িকভাবে এই সম্পর্ক ভেঙেছিল। পরে তিউনিসিয়া, গিনি এবং রুয়ান্ডাও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একই পদক্ষেপ নিয়েছিল। তবে বুরকিনা ফাসোর এই সিদ্ধান্ত ফরাসি সরকারকে কার্যত অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলেছে।
জানা গেছে, যেদিন বুরকিনা ফাসোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফরাসি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে ডেকে এই সিদ্ধান্ত জানায়, সেদিনই প্যারিস তাঁর সহকারী নিয়োগের প্রক্রিয়া চালাচ্ছিল। বুরকিনা ফাসো ফ্রান্সকে সাত দিনের মধ্যে ওয়াগাডুগুতে দূতাবাস ও কনস্যুলেট বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ফ্রান্সও প্যারিসে বুরকিনা ফাসোর কূটনৈতিক দপ্তর বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যদিও দুই দেশের কূটনীতিকদের মতে, এত অল্প সময়ে এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা অত্যন্ত কঠিন। তাই সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধও জানিয়েছে ফ্রান্স।
ওয়াগাডুগুতে ফরাসি দূতাবাস ও কনস্যুলেটে বর্তমানে প্রায় ২০ জন কূটনৈতিক, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাকর্মী কর্মরত। তাঁদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি গোপন নথি ও সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি ধ্বংস করার প্রস্তুতিও চলছে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বুরকিনা ফাসোর সামরিক সরকার চারজন ফরাসি গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে আটক করেছিল। পরে এক বছর পর তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। সেই ঘটনার পরই ফরাসি বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা দূতাবাসে থাকা তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছিল।
দূতাবাস ও কনস্যুলেট বন্ধ হয়ে গেলে ভিসা প্রদানসহ সব ধরনের প্রশাসনিক পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাবে। ইতিমধ্যেই বুরকিনা ফাসোর নাগরিকদের জন্য ফরাসি ভিসা প্রদান অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। বুরকিনা ফাসোতে বসবাসকারী প্রায় আড়াই হাজার ফরাসি নাগরিক—যাঁদের অনেকেই দ্বৈত নাগরিক—আর নিজেদের দূতাবাসের সহায়তা পাবেন না। তাই ফ্রান্স এখন এমন একটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের সন্ধান করছে, যারা বুরকিনা ফাসোতে তাদের স্বার্থ রক্ষা, নাগরিকদের প্রশাসনিক সহায়তা এবং সম্পত্তির তদারকির দায়িত্ব নিতে পারে।
ওয়াগাডুগু শহরের কেন্দ্রস্থলে ফ্রান্সের মালিকানাধীন বিশাল দূতাবাস চত্বর, রাষ্ট্রদূতের বাসভবন এবং একাধিক সরকারি সম্পত্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামরিক সরকারের নজর এই সম্পত্তিগুলির ওপর রয়েছে বলে ফরাসি সূত্রের আশঙ্কা। তবে রাজধানীর খ্যাতনামা ফরাসি বিদ্যালয় সাঁ-একজুপেরি আপাতত এই কূটনৈতিক বিচ্ছেদের প্রভাবের বাইরে রয়েছে বলে বুরকিনা ফাসোর কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।