হাইলাইটস
- সুযোগ গ্রহণ করা এবং সুবিধাবাদী হয়ে ওঠার মধ্যে ব্যবধান অনেক সময় খুবই সূক্ষ্ম।
- ব্যক্তি, রাজনীতি, ব্যবসা কিংবা সমাজ—সব ক্ষেত্রেই এই দ্বন্দ্ব চিরন্তন।
- ভালো ভবিষ্যৎ চাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সেই ভবিষ্যতের জন্য সব নীতি বিসর্জন দেওয়া কি গ্রহণযোগ্য?
- ইতিহাস দেখায়, সুযোগসন্ধানীরা অনেক সময় সফল হয়, কিন্তু বিশ্বাস হারালে সেই সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
বাংলাস্ফিয়ার: “Opportunity and opportunism have a fine line… everyone wants a good future”— বাক্যটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ মনে হলেও এর ভিতরে লুকিয়ে আছে আধুনিক সমাজ ও রাজনীতির অন্যতম বড় নৈতিক প্রশ্ন। মানুষ কি শুধুই নিজের ভবিষ্যতের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়, নাকি সিদ্ধান্তের সঙ্গে কিছু মূল্যবোধও জড়িয়ে থাকে? কোথায় শেষ হয় বাস্তববাদ, আর কোথা থেকে শুরু হয় সুবিধাবাদ?
আজকের পৃথিবীতে এই প্রশ্নের গুরুত্ব আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি।
কারণ আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে সাফল্যকে প্রায়শই নীতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কে কোথায় পৌঁছল, কতটা ক্ষমতা পেল, কতটা অর্থ উপার্জন করল—এসবই যেন সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি। ফলে সুযোগ আর সুবিধাবাদের সীমারেখা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
একজন কর্মচারী যদি ভালো বেতনের চাকরির জন্য প্রতিষ্ঠান বদলান, সেটি সুযোগ গ্রহণ। কিন্তু তিনি যদি প্রতিষ্ঠানের গোপন তথ্য সঙ্গে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থায় চলে যান, তখন বিষয়টি সুবিধাবাদে পরিণত হয়। একজন রাজনীতিক যদি নিজের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন রাজনৈতিক পথ বেছে নেন, সেটি একরকম। কিন্তু ক্ষমতার হাওয়া বুঝে রাতারাতি অবস্থান বদলে ফেললে প্রশ্ন উঠবেই।
সমস্যা হল, এই সীমারেখা সব সময় স্পষ্ট নয়।
প্রত্যেক মানুষই নিজের জীবনে উন্নতি চায়। নিরাপত্তা চায়। ভালো আয়, ভালো সামাজিক অবস্থান, পরিবারের জন্য ভালো ভবিষ্যৎ—এসব মানবিক আকাঙ্ক্ষা। তাই সুযোগের সন্ধান করা কোনও অপরাধ নয়। বরং সভ্যতার অগ্রগতির বড় অংশই তৈরি হয়েছে মানুষের নতুন সুযোগ খোঁজার মধ্য দিয়ে।
গ্রামের মানুষ শহরে এসেছে সুযোগের খোঁজে। বিজ্ঞানী নতুন গবেষণা করেছেন সুযোগের খোঁজে। উদ্যোক্তা নতুন ব্যবসা শুরু করেছেন সুযোগের খোঁজে। অভিবাসীরা দেশ ছেড়েছেন সুযোগের খোঁজে।
কিন্তু সুযোগ যখন কেবল ব্যক্তিগত লাভের সমার্থক হয়ে যায়, তখনই শুরু হয় সমস্যা।
রাজনীতির দিকে তাকালেই বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট বোঝা যায়। নির্বাচনের আগে বা পরে দলবদল নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক হয়। দলবদলকারী নেতারা সাধারণত বলেন, তাঁরা মানুষের স্বার্থে বা উন্নয়নের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সমালোচকেরা বলেন, এটি আসলে ক্ষমতার কাছে যাওয়ার পথ।
সত্যিটা অনেক সময় মাঝখানে থাকে।
কারণ কোনও রাজনৈতিক কর্মী সত্যিই মনে করতে পারেন যে তাঁর পুরনো দল আর কার্যকর নয়। আবার একই সঙ্গে এটাও সত্যি হতে পারে যে নতুন দলে গেলে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে। ফলে সিদ্ধান্তের পেছনে আদর্শ ও স্বার্থ—দুটিই কাজ করতে পারে।
এই দ্বৈততাই সুযোগ এবং সুবিধাবাদের বিতর্ককে জটিল করে তোলে।
ব্যবসার জগতেও একই চিত্র। কোনও সংস্থা যদি বাজারের পরিবর্তন বুঝে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করে, সেটি দূরদর্শিতা। কিন্তু যদি মুনাফার জন্য শ্রমিকদের স্বার্থ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, পরিবেশ ধ্বংস করে বা ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করে, তখন তা সুবিধাবাদ।
কর্পোরেট ইতিহাসে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যেখানে স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য নেওয়া সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ধ্বংস করেছে। কারণ অর্থ হারালে তা ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু বিশ্বাস হারালে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।
মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কেও একই সত্য প্রযোজ্য।
বন্ধুত্ব, প্রেম কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই আমরা এমন মানুষ দেখি যারা পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে পাশে থাকে, কিন্তু প্রতিকূল সময়ে সরে যায়। তারা প্রায়ই নিজেদের সিদ্ধান্তকে বাস্তববাদ বলে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাঁদের কাছে সেটি সুবিধাবাদ হিসেবেই ধরা পড়ে।
এই কারণেই সুযোগ আর সুবিধাবাদের পার্থক্য নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হল—আনুগত্য ও বিশ্বাস।
কেউ যদি নিজের উন্নতির জন্য পথ বদলান, কিন্তু পুরনো সম্পর্ক বা প্রতিশ্রুতিকে সম্মান করেন, তবে সমাজ সাধারণত তাঁকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। কিন্তু কেউ যদি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠেই সেই সিঁড়িকে লাথি মারেন, তখন তাঁর সাফল্যও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের সিদ্ধান্ত সাধারণত তিনটি বিষয়ে নির্ভর করে—স্বার্থ, মূল্যবোধ এবং পরিস্থিতি। এই তিনটির ভারসাম্যই নির্ধারণ করে কোনও পদক্ষেপ সুযোগ গ্রহণ, নাকি সুবিধাবাদ।
যখন স্বার্থ ও মূল্যবোধের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকে, তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হয়। কিন্তু যখন মূল্যবোধ পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে শুধু স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তখন সুবিধাবাদের অভিযোগ ওঠে।
আধুনিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। আজ সাফল্যের গল্প দ্রুত ছড়ায়, কিন্তু সেই সাফল্যের পেছনের নৈতিক মূল্যায়ন প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে। ফলে মানুষ ফলাফল দেখে, প্রক্রিয়া দেখে না।
কে কত দ্রুত উপরে উঠল, সেটাই খবর। কীভাবে উঠল, সেটি অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। এই সংস্কৃতি সুবিধাবাদকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে। কারণ বার্তা স্পষ্ট—জয়ী হও, বাকিটা পরে দেখা যাবে।
কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা ভিন্ন।
ইতিহাসে অনেক সফল মানুষ আছেন যাঁরা কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজের অবস্থান বদলাননি। আবার এমনও অনেকে আছেন যাঁরা বারবার পক্ষ বদলে ক্ষমতার কাছাকাছি থেকেছেন। প্রথম শ্রেণির মানুষ হয়তো সব সময় দ্রুত সাফল্য পাননি, কিন্তু তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ অনেক সময় ক্ষমতা পেয়েছেন, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন।
বিশ্বাসযোগ্যতা এমন এক সম্পদ যা কোনও ব্যাংকে জমা থাকে না, কিন্তু সমাজে তার মূল্য অপরিসীম।
সুতরাং “everyone wants a good future”—এই কথাটি নিঃসন্দেহে সত্য। পৃথিবীতে এমন মানুষ খুব কমই আছেন যাঁরা ভালো ভবিষ্যৎ চান না। প্রশ্ন হল, সেই ভবিষ্যতের জন্য আমরা কী মূল্য দিতে প্রস্তুত?
যদি উন্নতির পথে এগোনোর সময় আমরা নীতি, সম্পর্ক, প্রতিশ্রুতি এবং সততাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করি, তাহলে সুযোগের পথ খুব দ্রুত সুবিধাবাদের পথে গিয়ে মিশে যায়। আর যদি উন্নতির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে কিছু নৈতিক সীমারেখা বজায় রাখতে পারি, তাহলে সেই পথকে সুযোগ গ্রহণ বলা যায়।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি কোনও আইন বা সংবিধানের প্রশ্ন নয়; এটি চরিত্রের প্রশ্ন। কারণ সুযোগ জীবনের দরজা খুলে দেয়, কিন্তু চরিত্র নির্ধারণ করে সেই দরজা দিয়ে আমরা কীভাবে প্রবেশ করব।
এই কারণেই সুযোগ এবং সুবিধাবাদের মধ্যে দূরত্ব খুব কম হলেও, তাদের নৈতিক তাৎপর্যের ব্যবধান অনেক বড়। একজন মানুষ সফল হলেন কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন হল—তিনি সফল হতে গিয়ে কী হারালেন?
অনেক সময় ভবিষ্যৎ জিতে যায়, কিন্তু মানুষ হেরে যায়। আর সেই হারটাই ইতিহাস সবচেয়ে দীর্ঘদিন মনে রাখে।