হাইলাইটস:

  • ক্ষমতা হারালেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসে ভাটা নেই
  • দলের একাংশ তাঁকে ভাঙনের জন্য দায়ী করলেও তিনি এখনও আক্রমণাত্মক
  • উত্তরাধিকার, সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক তাঁর শক্তির মূল উৎস
  • কিন্তু সেই শক্তির ভিত্তি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নড়বড়ে

বাংলাস্ফিয়ার: রাজনীতিতে একটি পুরনো প্রবাদ আছে—ক্ষমতা চলে গেলে নেতার আসল শক্তি বোঝা যায়। ক্ষমতায় থাকাকালীন হাজার লোক আপনার সামনে মাথা নোয়াবে। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পরেও যদি লোকজন আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে আপনার হাতে এখনও কিছু আছে।

এই সূত্র ধরেই আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি প্রশ্ন ঘুরছে—অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এত আত্মবিশ্বাসের উৎস কোথায়?

দল বিপর্যস্ত। বিধায়করা দল ছাড়ছেন। সাংগঠনিক বিদ্রোহ প্রকাশ্যে এসেছে। একের পর এক আইনি ও তদন্তজনিত চাপ তৈরি হয়েছে। দলের ভেতর থেকেই অভিযোগ উঠছে যে ভুল রাজনৈতিক কৌশল এবং অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের কারণে তৃণমূলের এই দুরবস্থা। তবুও প্রকাশ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কখনও প্রতিরক্ষামূলক মনে হয় না। বরং প্রায়শই দেখা যায় তিনি আক্রমণাত্মক, দৃঢ় এবং আত্মবিশ্বাসী।

এর কারণ শুধু ব্যক্তিগত স্বভাব নয়। এর পেছনে রয়েছে অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা।

প্রথমত, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় শুধুমাত্র একজন নেতা নন; তিনি একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রতীক।

ভারতের আঞ্চলিক দলগুলিতে রক্তের সম্পর্কের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। সমাজবাদী পার্টিতে অখিলেশ যাদব, শিবসেনায় উদ্ধব ঠাকরে, এনসিপিতে সুপ্রিয়া সুলে—প্রত্যেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে রাজনৈতিক উত্তরাধিকার একটি আলাদা শক্তি তৈরি করে। তৃণমূল কংগ্রেসেও অভিষেক বহুদিন ধরেই সেই অবস্থানে রয়েছেন।

দলের অধিকাংশ কর্মী ও নেতা গত এক দশক ধরে তাঁকে ভবিষ্যতের মুখ হিসেবেই দেখেছেন। ফলে তিনি কোনও সাধারণ সাংগঠনিক পদাধিকারী নন, বরং একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কেন্দ্র। এই অবস্থান তাঁকে এমন এক রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস দেয়, যা শুধুমাত্র সাংসদ বা সাধারণ নেতার ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা নিজস্ব ক্ষমতার পরিকাঠামো।

তৃণমূলের দ্বিতীয় পর্ব, বিশেষ করে ২০১৯ সালের পর, দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কেন্দ্রে ছিলেন অভিষেক। যুব সংগঠন, সামাজিক মাধ্যম, নির্বাচনী কৌশল, প্রার্থী নির্বাচন—সব ক্ষেত্রেই তাঁর প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

রাজনীতিতে ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক একটি অদৃশ্য সম্পদ। বহু নেতা, জনপ্রতিনিধি, জেলা পর্যায়ের সংগঠক এবং নির্বাচনী ম্যানেজার তাঁদের রাজনৈতিক উত্থানের জন্য অভিষেকের প্রতি কৃতজ্ঞ। ফলে দল দুর্বল হলেও এই নেটওয়ার্ক রাতারাতি ভেঙে যায় না। অনেক সময় একটি রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর চেয়ে অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের জাল অনেক বেশি শক্তিশালী হয়। অভিষেকের ক্ষেত্রেও সেটাই সত্য।

তৃতীয়ত, তিনি এখনও বিশ্বাস করেন যে রাজনৈতিক যুদ্ধ শেষ হয়নি।

রাজনীতিতে পরাজয় মানেই সমাপ্তি নয়। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৭ সালে ক্ষমতা হারিয়েছিলেন। মাত্র তিন বছরের মধ্যে তিনি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও একাধিকবার রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা হয়েছেন, কিন্তু ফিরে এসেছেন।

এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে অনেক নেতা মনে করেন, সবচেয়ে বিপজ্জনক কাজ হল নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা। ফলে পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক, প্রকাশ্যে আত্মবিশ্বাস দেখানোও এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল। কারণ রাজনীতিতে সমর্থকরা শক্তির প্রতি আকৃষ্ট হয়, দুর্বলতার প্রতি নয়।

চতুর্থত, অভিষেকের রাজনৈতিক ভাষা ও প্রজন্মগত অবস্থান।

তৃণমূলের পুরনো নেতৃত্বের তুলনায় অভিষেক নিজেকে আধুনিক, তথ্যনির্ভর এবং প্রযুক্তিবান্ধব রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তরুণ কর্মীদের একটি অংশ এখনও মনে করে তিনি পুরনো তৃণমূল সংস্কৃতির বিকল্প।

এই ধারণা বাস্তবে কতটা সঠিক, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু রাজনীতিতে বাস্তবের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হল ধারণা বা perception। অভিষেকের ক্ষেত্রে সেই ধারণা এখনও পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।

পঞ্চমত, সংকটের সময়েও তিনি জানেন যে দলের কেন্দ্রীয় চরিত্র এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে।

তৃণমূলে বহু নেতা এসেছেন, গিয়েছেন। কেউ মন্ত্রী হয়েছেন, কেউ সাংসদ হয়েছেন, কেউ জেলা সভাপতি হয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলের চূড়ান্ত রাজনৈতিক বৈধতার উৎস একজনই—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

যতদিন মমতা প্রকাশ্যে অভিষেককে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান না করছেন, ততদিন তাঁর রাজনৈতিক ওজন পুরোপুরি কমে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

অর্থাৎ অভিষেকের আত্মবিশ্বাসের একটি বড় অংশ তাঁর নিজের শক্তি থেকে এলেও, আরেকটি বড় অংশ আসে মমতার রাজনৈতিক ছাতার নিচে থাকার কারণে।

তবে এই ছবির উল্টো দিকও আছে।

আত্মবিশ্বাস আর অতি-আত্মবিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য খুব সূক্ষ্ম।

তৃণমূলের বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে দলের ভেতরে অনেকে অভিষেকের রাজনৈতিক শৈলীকে দায়ী করছেন। অভিযোগ উঠেছে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অতিরিক্তভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। পুরনো নেতাদের গুরুত্ব কমেছিল। বিরোধী মতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

এই অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট—দলের একটি বড় অংশ এখন আর আগের মতো নিঃশর্তভাবে তাঁর পাশে নেই।

আর সেখানেই তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।

যে আত্মবিশ্বাস একসময় ছিল উত্থানের জ্বালানি, সেটাই কি আজ সংকটের কারণ হয়ে উঠছে?

রাজনীতির ইতিহাসে এমন উদাহরণ কম নেই। বহু নেতা নিজের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তিকে অতিরিক্ত মূল্যায়ন করে শেষ পর্যন্ত বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।

আজ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে সেই পরীক্ষাই। তিনি কি সত্যিই এখনও তৃণমূলের ভবিষ্যৎ? নাকি তিনি এমন এক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী, যাঁর ক্ষমতার চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু হয়েছে মাত্র? এই প্রশ্নের উত্তর আজ কেউ জানে না।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মবিশ্বাসের উৎস শুধু ব্যক্তিগত চরিত্র নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে উত্তরাধিকার, সংগঠন, নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক স্মৃতি এবং ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া।

কিন্তু রাজনীতির নির্মম নিয়মও একই সঙ্গে সত্য—উত্তরাধিকার আপনাকে মঞ্চে তুলে দিতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দর্শক ধরে রাখতে হলে নিজের অভিনয়েই ভরসা করতে হয়।

এবং পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য সেই কঠিন অঙ্কটাই এখন শুরু হয়েছে।