Home খবর বন্দে মাতরম বিতর্ক: দেশপ্রেম কি আদেশে হয়?

বন্দে মাতরম বিতর্ক: দেশপ্রেম কি আদেশে হয়?

0 comments 7 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: সরকারি সাহায‍্যপ্রাপ্ত সব মাদ্রাসায় প্রার্থনা সঙ্গীত হিসেবে বন্দে মাতরম গানের ছ’টি স্তবক গাওয়া বাধ‍্যতামূলক করা হয়েছে। এটা কী তালিবানি ফতোয়া নয়? একজন হিন্দু ছাত্রকে যদি তার স্কুলের প্রার্থনাসভায় আল্লাই একমাত্র উপাস‍্য বলতে বাধ‍্য করা হয় তখন কী হবে?  প্রশ্নটি দুটি স্তরে বিচার করা দরকার — সাংবিধানিক এবং সামাজিক-রাজনৈতিক।

সাংবিধানিক প্রশ্ন

ভারতের রাষ্ট্রীয় জীবন ও জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে বন্দে মাতরম অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। স্বাধীনতা আন্দোলনে গানটির ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও সত্য যে গানটির সম্পূর্ণ রূপে মাতৃভূমিকে দেবী দুর্গারূপে কল্পনা করা হয়েছে। সেই কারণে বহু মুসলিম সংগঠন ও ধর্মীয় নেতা দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। স্বাধীনতার আগে থেকেই এই বিতর্কের শিকড়। শেষ পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি হয়েছিল — প্রথম দুটি স্তবককে “জাতীয় গান” হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, কারণ সেই অংশে ভূখণ্ড-নির্ভর ভাষা বেশি, স্পষ্ট দেবীপূজার ইঙ্গিত কম।

এখানেই মূল প্রশ্ন: রাষ্ট্র কি কোনও ছাত্রকে এমন কিছু গাইতে বাধ্য করতে পারে, যা তার ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে?

সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্মাচরণের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেয়, যার মধ্যে “না বলা” বা “না গাওয়া”-র অধিকারও বহুবার আদালত স্বীকার করেছে।

এই প্রসঙ্গে বিজো ইমানুয়েল বনাম কেরল রাজ্য মামলাটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। জেহোভাস উইটনেস সম্প্রদায়ের কয়েকজন ছাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে অস্বীকার করেছিল। তারা অসম্মান করেনি, কেবল দাঁড়িয়ে ছিল। সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল, কাউকে জোর করে গান গাওয়ানো যাবে না। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য আর বাধ্যতামূলক উচ্চারণ এক জিনিস নয়।

সুতরাং কোনও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানে ছয়টি স্তবক গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হলে এবং অস্বীকারে শাস্তির বিধান রাখা হলে, তা সাংবিধানিক পরীক্ষায় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। রাষ্ট্রের কাজ দেশপ্রেম জাগানো, নির্দিষ্ট ভক্তিভাষা চাপিয়ে দেওয়া নয়।

উল্টো আয়নার প্রশ্ন

“একজন হিন্দু ছাত্রকে যদি আল্লাহই একমাত্র উপাস্য বলতে বাধ্য করা হয়, তখন কী হবে?” — এই প্রশ্নটি ইচ্ছাকৃতভাবে উল্টো আয়না দেখায়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নীতিটা উভয় ক্ষেত্রেই এক হওয়া উচিত। কোনও মুসলিম ছাত্রকে দেবীরূপী মাতৃভূমির বন্দনা গাইতে বাধ্য করা যেমন সমস্যাজনক, তেমনই কোনও হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান বা নাস্তিক ছাত্রকে “আল্লাহ ছাড়া আর কোনও উপাস্য নেই” বলতে বাধ্য করাও সমানভাবে অসাংবিধানিক। রাষ্ট্রীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধর্মীয় আনুগত্য আদায়ের জায়গা নয়।

বিতর্কের সূক্ষ্ম দিক

এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্যের প্রশ্নও রয়েছে। বন্দে মাতরমের সমর্থকেরা বলবেন, এটি কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের উপাসনামন্ত্র নয়, জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতির প্রতীক। বিরোধীরা পাল্টা বলবেন, প্রতীকের ভাষাটিই হিন্দু দেবীমূর্তির উপর দাঁড়িয়ে, তাই মুসলিম একেশ্বরবাদের সঙ্গে সংঘাত অনিবার্য। অর্থাৎ বিতর্কটি কেবল দেশপ্রেম বনাম দেশদ্রোহের নয়; আসল প্রশ্ন হলো জাতীয় প্রতীক কতটা ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া উচিত।

“তালিবানি ফতোয়া” শব্দবন্ধটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তীব্র। তালিবান শাসন ধর্মীয় মতকে বলপ্রয়োগে চাপিয়ে দেয়, ভিন্নমতকে দমন করে। ভারতের বাস্তবতা সেখান থেকে আলাদা — এখানে আদালত, মৌলিক অধিকার এবং বিচারিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু কোনও সরকার যদি সংখ্যাগরিষ্ঠের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বাধ্যতামূলক রাষ্ট্রীয় আচারে রূপান্তরিত করতে চায়, তাহলে সমালোচকেরা সেটিকে সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী চাপ হিসেবে দেখবেনই।

গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা এখানেই — দেশপ্রেম কি স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ হবে, নাকি প্রশাসনিক আদেশ? রাষ্ট্র কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, চেতনা নয়।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles