Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: ভারতীয় সংবিধানের অন্যতম মৌলিক দর্শন হল রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষ হবে। রাষ্ট্র কোনও বিশেষ ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা করবে না, কোনও ধর্মীয় সম্প্রদায়কে আলাদা সুবিধা দেবে না, আবার কাউকে বৈষম্যের শিকারও করবে না। এই নীতির অর্থ ধর্মহীনতা নয়; বরং রাষ্ট্রের সমদূরত্ব। সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ইমাম ও পুরোহিত ভাতা প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক শুধু অর্থনৈতিক নয়, গভীরভাবে সাংবিধানিকও।
সম্প্রতি নতুন বিজেপি সরকার এই ভাতা ব্যবস্থা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে এই সিদ্ধান্ত বিতর্কিত হতে পারে, কিন্তু সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ প্রশ্নটা মূলত এই—একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কি শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে সরকারি ভাতা দিতে পারে?
যেখান থেকে শুরু
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে ইমাম ভাতার সূচনা হয়েছিল প্রবল রাজনৈতিক প্রচারের মধ্য দিয়ে। যুক্তি ছিল, গ্রামের বহু মসজিদের ইমাম অত্যন্ত কম আয়ে জীবনযাপন করেন, তাঁদের আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া দরকার। মানবিক যুক্তি হিসেবে কথাটা শুনতে সুন্দর। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কঠিন বাস্তব হল—মানবিকতা যদি ধর্মভিত্তিক হয়ে যায়, তবে তা আর নিরপেক্ষ থাকে না। তখন প্রশ্ন উঠবেই, দরিদ্র পুরোহিত কেন পাবেন না? গির্জার ফাদার কেন পাবেন না? গুরুদ্বারের গ্রন্থী কেন বাদ যাবেন?
সেখানেই এই নীতির মৌলিক অসঙ্গতি প্রকাশ্যে আসে।
আদালতের রায় ও পিছনের দরজা
কলকাতা হাইকোর্টও সেই অসঙ্গতিই ধরেছিল। আদালত স্পষ্ট বলেছিল, সরাসরি সরকারি কোষাগার থেকে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কর্মীদের ভাতা দেওয়া সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের পরিপন্থী। এই রায় ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত আসলে শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাতিল করেনি; রাষ্ট্রের চরিত্র সম্পর্কে একটি মৌলিক সীমারেখা টেনে দিয়েছিল।
কিন্তু এখানেই শেষ হয়নি ঘটনা। অভিযোগ ওঠে, সরকার পরে ওয়াকফ বোর্ডকে ব্যবহার করে পিছনের দরজা দিয়ে সেই ভাতা কার্যত চালু রাখে। অর্থাৎ সরকার সরাসরি না দিলেও, সরকার-নিয়ন্ত্রিত একটি সংস্থার মাধ্যমে একই কাজ চলতে থাকে। আইনের ভাষায় একে বলা যায় “সার্কামভেনশন”—আদালতের রায়কে পাশ কাটিয়ে যাওয়া।
এই প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। কারণ আদালতের নির্দেশকে প্রকাশ্যে অস্বীকার না করেও কার্যত নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়।
ভোটের হিসাব, সংবিধানের সীমা
এই নীতির মধ্যে এক ধরনের ভোটভিত্তিক পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি ছিল। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বহুদিন ধরেই অভিযোগ ছিল, ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সরকারি সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ইমাম ভাতা সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছিল। কারণ এটি দরিদ্র মানুষের জন্য কোনও সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প ছিল না। এটি ছিল ধর্মীয় পরিচয়-নির্ভর ভাতা।
এখানে একটা মৌলিক পার্থক্য বোঝা জরুরি। রাষ্ট্র যদি দরিদ্র নাগরিকদের জন্য আর্থিক সহায়তা দেয়, সেটা কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্র যদি বলে—”আপনি অমুক ধর্মের ধর্মীয় কর্মী বলেই টাকা পাবেন”, তাহলে তা সরাসরি ধর্মভিত্তিক পৃষ্ঠপোষকতা।
সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলে। ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। আর ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনও নাগরিককে এমন কর দিতে বাধ্য করা যাবে না যার অর্থ কোনও বিশেষ ধর্মের প্রসার বা রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবহৃত হবে। এই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় কর্মীদের সরাসরি সরকারি ভাতা সবসময়ই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
দুটি ভুলে সমতা আসে না
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার পরে যখন পুরোহিত ভাতাও চালু করে, তখন অনেকেই বলেছিলেন—দেখুন, এবার তো সমতা এল। কিন্তু বাস্তবে এটি সমস্যার সমাধান করেনি; বরং অসাংবিধানিকতাকে দ্বিগুণ করেছে। কারণ একটি ভুলকে আরেকটি ভুল দিয়ে “ভারসাম্যপূর্ণ” করা যায় না।
ধরা যাক, রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিল কোনও একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেওয়া হবে। পরে সমালোচনার মুখে পড়ে অন্য ধর্মগুলোকেও অনুদান দেওয়া হল। তাতে কি রাষ্ট্র হঠাৎ ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে যায়? না। বরং রাষ্ট্র আরও গভীরভাবে ধর্মীয় ক্ষেত্রে প্রবেশ করে। ভারতের সংবিধান রাষ্ট্রকে ধর্মীয় প্রতিযোগিতার ময়দানে নামতে বলেনি।
করদাতার টাকা, ধর্মীয় বেতন
আরও একটি বাস্তব প্রশ্ন আছে। পশ্চিমবঙ্গ বহু বছর ধরেই বিপুল ঋণের বোঝায় জর্জরিত। সেখানে করদাতার টাকা দিয়ে ধর্মীয় ভাতা চালানো কতটা যুক্তিসঙ্গত? একজন সাধারণ শ্রমিক, শিক্ষক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কেন তার করের অর্থ কোনও বিশেষ ধর্মীয় পেশার জন্য ব্যয় হতে দেখবেন? বিশেষ করে যখন সেই অর্থ শিক্ষা বা স্বাস্থ্য খাতে ব্যবহার করা যেত?
এই সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে সমাজকেও বিপজ্জনক পথে নিয়ে যায়। কারণ তখন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়—”ওরা পাচ্ছে, আমরা কেন পাব না?” ফলত রাষ্ট্র কল্যাণের প্রতিষ্ঠান না হয়ে উঠে দাবিদাওয়া মেটানোর ধর্মীয় বাজারে পরিণত হয়।
রাষ্ট্রের কাজ মন্দির-মসজিদের পুরোহিত বা ইমামের বেতন নির্ধারণ করা নয়। রাষ্ট্রের কাজ নাগরিকের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা
সীমারেখা যখন ঝাপসা
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতারা এই বিপদের কথা জানতেন বলেই ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাকে এত গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল বিভাজনের রাজনীতি কেমন ভয়াবহ হতে পারে। তাই সংবিধান রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিল।
আজকের ভারতে সেই সীমারেখা বারবার ঝাপসা হচ্ছে। কখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ তোষণ, কখনও সংখ্যালঘু তোষণ—দুই দিক থেকেই রাষ্ট্রকে ধর্মীয় পরিচয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
এখানেই নতুন বিজেপি সরকারের সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তারা অন্তত নীতিগতভাবে বলছে, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এই ধরনের ভাতা দেওয়া হবে না। অবশ্য বিজেপির সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলতেই পারেন—দলটি নিজে কি সর্বদা ধর্মনিরপেক্ষতার একই মানদণ্ড মেনে চলে? সেই বিতর্ক আলাদা। কিন্তু একটি সিদ্ধান্তের সাংবিধানিক মূল্যায়ন করতে গেলে তার নিজস্ব গুণাগুণ বিচার করতে হয়।
ইমাম ও পুরোহিত ভাতা বাতিলের সিদ্ধান্ত তাই শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়। এটি আসলে একটি বৃহত্তর প্রশ্নের দিকে আঙুল তোলে—ভারত কি নাগরিক-ভিত্তিক রাষ্ট্র থাকবে, নাকি ক্রমশ ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক সুবিধা বণ্টনের রাষ্ট্রে পরিণত হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের ভারতীয় গণতন্ত্রের চরিত্র নির্ধারণ করবে।