Home খবর ফলতার পরীক্ষা: সংকটে অদৃশ্য নেতা

ফলতার পরীক্ষা: সংকটে অদৃশ্য নেতা

0 comments 3 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: রাজনীতিতে নেতার প্রকৃত চরিত্র সাধারণ দিনে বোঝা যায় না। বোঝা যায় সংকটের সময়। সভামঞ্চে ভিড়ের সামনে হাত নাড়া, জয়ের মিছিলে হাসিমুখে হাঁটা, অনুগামীদের উল্লাসে ভেসে থাকা—এসব নেতৃত্বের অলংকার হতে পারে, কিন্তু পরীক্ষাপত্র নয়। পরীক্ষার আসল মুহূর্ত তখনই আসে যখন পরিস্থিতি প্রতিকূল, সংগঠনের ভিত নড়বড়ে, আর জনমানসে সন্দেহ ঢুকতে শুরু করেছে। তখন একজন নেতা কী করেন—সামনের সারিতে দাঁড়ান, না আড়ালে সরে যান, সেখানেই তাঁর রাজনৈতিক স্নায়ুর আসল পরীক্ষা।

এই কারণেই ফলতা উপনির্বাচনের বর্তমান পরিস্থিতি এত তাৎপর্যপূর্ণ। কেন্দ্রটি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসভা এলাকার অন্তর্গত। প্রার্থী জাহাঙ্গিরকে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর ঘনিষ্ঠ এবং রাজনৈতিক “দক্ষিণ হস্ত” বলেই চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে এই নির্বাচন অভিষেকের কাছে শুধু আরেকটি উপনির্বাচন হওয়ার কথা ছিল না; এটি হওয়ার কথা ছিল ব্যক্তিগত মর্যাদার লড়াই। কারণ কোনও শক্তিশালী আঞ্চলিক নেতার সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু পদ নয়, নিজের এলাকায় তার সাংগঠনিক কর্তৃত্বের ধারণা।

অনুপস্থিতি যখন বার্তা হয়ে ওঠে

কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের চোখে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হয়ে উঠেছে অন্য কিছু—অভিষেকের দৃশ্যমান অনুপস্থিতি। তিনি যেন প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু না হয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রান্তে সরে গেছেন। এই অনুপস্থিতি কেবল শারীরিক নয়; এটি প্রতীকি। এবং রাজনীতিতে প্রতীক অনেক সময় বাস্তবের চেয়েও শক্তিশালী।

প্রশ্নটি কেবল “কেন গেলেন না” নয়। প্রশ্ন হল, একজন নেতা কেন এমন সময়ে সামনে আসতে দ্বিধা করেন? এর উত্তর অনেক স্তরে খুঁজতে হয়।

ঝুঁকি এড়ানোর রাজনীতি

প্রথম কারণ হতে পারে রাজনৈতিক ঝুঁকি-পরিহার। অনেক নেতা মনে করেন, পরিস্থিতি অনুকূল না হলে নিজের মুখ কম দেখানোই ভালো। হার হলে দায়ও কম পড়বে। অর্থাৎ তাঁরা বিজয়ের কৃতিত্ব নিতে প্রস্তুত থাকেন, কিন্তু পরাজয়ের মালিকানা নিতে চান না। কর্পোরেট ভাষায় একে বলা যায় “রিস্ক ইন্স্যুলেশন”; রাজনীতির ভাষায় এটি আত্মরক্ষামূলক নেতৃত্ব।

দ্বিতীয় কারণ হতে পারে আত্মবিশ্বাসের সংকট। শক্তিশালী নেতারা সাধারণত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আরও বেশি দৃশ্যমান হন। কারণ তাঁরা জানেন, সংগঠনের কর্মীদের মনোবল তখন নেতার উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে। ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থার পরে প্রবল জনরোষের মধ্যেও জনসভা করেছেন। নরেন্দ্র মোদী কঠিন নির্বাচনী পরিস্থিতিতেও প্রচারের কেন্দ্রেই থেকেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রাম আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়েও রাস্তায় ছিলেন। কারণ তাঁরা বুঝতেন, সংকটের মুহূর্তে নেতার শরীরী উপস্থিতি নিজেই একটি রাজনৈতিক বার্তা।

সেই তুলনায় যদি কোনও নেতা কঠিন সময়ে ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যান, তবে কর্মীদের মনে একটি বিপজ্জনক সংকেত পৌঁছয়—”উপরের তলা নিজেই নিশ্চিত নয়।” রাজনীতিতে মনোবল যেমন সংক্রামক, ভয়ও তেমনই সংক্রামক।

সংকটেই আসল পরীক্ষা

ইংরেজি প্রবাদ—”When going gets tough, the tough get going”—আসলে শুধু সাহসের কথা বলে না। এটি বলে নেতৃত্বের মনস্তত্ত্বের কথা। সত্যিকারের কঠিন মানুষ মানে সেই ব্যক্তি যিনি সংকটের কেন্দ্রে নিজের উপস্থিতি বাড়ান। কারণ তিনি জানেন, নেতার কাজ কেবল নির্দেশ দেওয়া নয়, বিপদের সময় প্রতীক হয়ে ওঠা।

অবশ্য বাস্তব রাজনীতিতে বিষয়টি সবসময় এত সরল নয়। আইনি চাপ, নিরাপত্তা আশঙ্কা, অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বা কৌশলগত হিসাব থেকেও কোনও নেতা কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারেন। কখনও কখনও “লো-প্রোফাইল” থাকা একটি সচেতন কৌশলও হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হল, রাজনীতিতে জনমানসের ধারণাই শেষ পর্যন্ত বাস্তব হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ কারণ বিশ্লেষণ করে না; তারা দৃশ্য দেখে। আর দৃশ্য যদি হয়—সংকটকালে নেতা নেই, তবে সেটি দ্রুত “পলায়ন” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ভারতীয় রাজনীতিতে সাহসের মূল্য

বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেতার ব্যক্তিগত সাহস একটি বড় গুণ হিসেবে দেখা হয়। এখানে নেতা শুধু প্রশাসক নন; তিনি অনেক সময় যোদ্ধা-চরিত্র। তাই বিপদের সময় ময়দান ছেড়ে যাওয়া বা দূরে থাকা জনমানসে গভীর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

আরও একটি সূক্ষ্ম দিক আছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছে থাকলে অনেক নেতা এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন যেখানে প্রতিটি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত, নিরাপদ এবং অনুকূল। কিন্তু রাজনীতির প্রকৃতি স্বভাবতই অনিশ্চিত। যখন প্রথমবার বাস্তব প্রতিরোধ, বিদ্রোহ বা জনঅসন্তোষ সামনে আসে, তখন অনেকের মানসিক প্রস্তুতি থাকে না। ফলে তাঁরা সংঘর্ষ এড়াতে চান।

রাজনৈতিক মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় “অ্যাভয়েড্যান্ট লিডারশিপ টেন্ডেন্সি”—সংঘাতের মুহূর্তে সরাসরি মোকাবিলার বদলে দূরত্ব তৈরি করা। সব নেতা সমানভাবে মুখোমুখি লড়াইয়ের জন্য তৈরি হন না। কেউ সংকটে আরও আক্রমণাত্মক হন, কেউ আবার আড়ালে থেকে পরিস্থিতি সামলাতে চান। কিন্তু গণতান্ত্রিক জনরাজনীতিতে দ্বিতীয় ধরনের নেতৃত্ব প্রায়ই দুর্বলতার ছাপ ফেলে।

চরিত্রের পরীক্ষা

ফলতার নির্বাচন তাই কেবল একটি উপনির্বাচন নয়। এটি এক ধরনের চরিত্র-পরীক্ষাও। কারণ রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত মানুষ নেতার বক্তৃতা নয়, তাঁর আচরণ মনে রাখে। কঠিন সময়ে তিনি সামনে ছিলেন, না অদৃশ্য—এই স্মৃতি দীর্ঘস্থায়ী হয়।

এবং ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, জনতা নেতার ভুল ক্ষমা করতে পারে, পরাজয়ও ক্ষমা করতে পারে; কিন্তু ভয়কে খুব কমই ক্ষমা করে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles