বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প নতুন কিছু নয়। এই রাজ্যে চাল, সাইকেল, বই, পোশাক, স্বাস্থ্যবিমা, বৃত্তি—সবই বহুদিন ধরে ভোট-রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু গতকাল বিজেপি মন্ত্রিসভার যে সিদ্ধান্তটি সামনে এল, তা যেন সেই পুরনো ধারাকেই আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। সিদ্ধান্ত হল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে যাঁরা লক্ষ্মীর ভান্ডার পেতেন, তাঁরা সবাই নতুন “অন্নপূর্ণা যোজনা”-র আওতায় চলে আসবেন। শুধু তাই নয়, পুরনো ভাতার অঙ্ক ১৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ করারও ইঙ্গিত মিলেছে।
প্রথম শ্রবণে এই ঘোষণাকে উদার, মানবিক, নারী-সমর্থক বলেই মনে হতে পারে। রাজনৈতিক সমাবেশে হাততালি পড়বে, সামাজিক মাধ্যমে উচ্ছ্বাস দেখা যাবে, বহু পরিবার স্বস্তির কথাও বলবে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক দায়িত্ববোধের দিক থেকে বিষয়টি একটু গভীরভাবে দেখলেই এক ভয়ঙ্কর প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়—একটি ঋণে ডুবে থাকা রাজ্য কি আদৌ এই ধরনের প্রায় সর্বজনীন নগদ ভাতা দেওয়ার সামর্থ্য রাখে?
আরও বড় প্রশ্ন হল—এটি কি জনকল্যাণ, না কি সরাসরি ভোট কেনার এক সাংবিধানিক রূপ?
ভারতের বহু রাজ্যে মহিলাদের জন্য নগদ সহায়তার প্রকল্প আছে। মধ্যপ্রদেশে লাডলি বেহেনা, মহারাষ্ট্রে মঝি লাডকি বহিন, কর্নাটকে গৃহলক্ষ্মী, তামিলনাড়ুতে কলাইঞার মাগলির উরিমাই থোগাই—তালিকা দীর্ঘ। কিন্তু এই প্রকল্পগুলির প্রায় সবকটিতেই একটি মৌলিক শর্ত থাকে। কোথাও আয়সীমা আছে, কোথাও পরিবার-পিছু সীমা আছে, কোথাও করদাতা বা সরকারি কর্মচারীদের বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র অন্তত নীতিগতভাবে এই কথা স্বীকার করে যে সরকারি সাহায্য মূলত প্রয়োজনের ভিত্তিতে হওয়া উচিৎ।
পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ্মীর ভান্ডার সেই জায়গাতেই ব্যতিক্রম। এখানে কার্যত “মহিলা” হওয়াটাই প্রধান যোগ্যতা। আপনি দরিদ্র কি না, আপনার সংসারে প্রকৃত আর্থিক সঙ্কট আছে কি না, আপনি ইতিমধ্যেই অন্য সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন কি না—এসব প্রশ্ন প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রকল্পটি ধীরে ধীরে এক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি না হয়ে রাজনৈতিক সর্বজনীন অনুদানে পরিণত হয়েছে।
এ যেন রাষ্ট্র বলছে—“আপনি নাগরিক নন, আপনি ভোটার; আর ভোটার হিসেবে আপনার মাসোহারা ধার্য করা হল।”
সমস্যা হল, এই ধরনের সর্বজনীন নগদ বিতরণ এমন এক সময়ে করা হচ্ছে যখন পশ্চিমবঙ্গের আর্থিক অবস্থা নিজেই গভীর সঙ্কটে। রাজ্যের ঋণের পরিমাণ ইতিমধ্যেই কয়েক লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। প্রতি বছর বিপুল অঙ্কের অর্থ শুধু সুদ মেটাতেই চলে যাচ্ছে। উন্নয়নমূলক প্রকল্প, শিল্প, পরিকাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা—সব ক্ষেত্রেই অর্থাভাব স্পষ্ট। বহু দপ্তরে নিয়োগ বন্ধ, বহু প্রকল্পে বকেয়া, গ্রামীণ রাস্তাঘাট থেকে হাসপাতাল—সব জায়গাতেই অর্থসংকটের ছাপ।
এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠতেই পারে—একটি কার্যত খালি কোষাগার নিয়ে সরকার কি সত্যিই “রাজকীয় দানশীলতা” দেখাতে পারে?
কারণ রাষ্ট্রের টাকা কোনও জাদুর ভাণ্ডার থেকে আসে না। সরকার নিজে টাকা উৎপাদন করে না। টাকা আসে করদাতার পকেট থেকে, ঋণ থেকে, বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর দায় চাপিয়ে। ফলে আজ যদি রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা নগদ ভাতায় বিলিয়ে দেওয়া হয়, তার মূল্য শেষ পর্যন্ত দেবে সেই সাধারণ মানুষই—হয় বাড়তি করের মাধ্যমে, নয় মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে, নয়তো উন্নয়ন থমকে যাওয়ার মাধ্যমে।
এখানেই বিজেপি সরকারের নতুন সিদ্ধান্তটি আরও বিতর্কিত হয়ে উঠছে। কারণ তারা শুধু পুরনো প্রকল্প বজায় রাখছে না, বরং তার আর্থিক বোঝা আরও বাড়াচ্ছে। যে ভাতা মমতার আমলে ছিল ১৫০০ টাকা, সেটি দ্বিগুণ করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এখন সামান্য অঙ্ক কষলেই বোঝা যায়, এই সিদ্ধান্তের আর্থিক অভিঘাত কত ভয়াবহ হতে পারে।
ধরা যাক উপভোক্তার সংখ্যা কয়েক কোটি। প্রত্যেককে মাসে অতিরিক্ত কয়েকশো বা হাজার টাকা দিলেই বছরে তার পরিমাণ দাঁড়াবে বহু হাজার কোটি টাকায়। এই বিপুল অর্থ কোথা থেকে আসবে?
সরকার কি নতুন শিল্প এনেছে? কর-আদায় কি হঠাৎ বিস্ময়করভাবে বেড়ে গেছে? রাজ্যের অর্থনীতি কি এমন দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে যে এই অতিরিক্ত দায় অনায়াসে বহন করা সম্ভব? না কি কেন্দ্র বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ দিয়েছে?
কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই।
অর্থাৎ প্রথমে ঘোষণা, পরে হিসাব—এই পুরনো ভারতীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। যেন অর্থনীতি নয়, নির্বাচনী মনস্তত্ত্বই একমাত্র বিবেচ্য।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, এই ধরনের রাজনীতি ধীরে ধীরে নাগরিক সমাজের চরিত্রও বদলে দেয়। একটি সুস্থ গণতন্ত্রে মানুষ সরকারের কাছে কাজ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, পরিকাঠামো, শিল্প, সুযোগ—এসব দাবি করে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নগদ ভাতাভিত্তিক রাজনীতি চলতে থাকলে নাগরিক ধীরে ধীরে “অধিকারসম্পন্ন অংশগ্রহণকারী” থেকে “সরকারি অনুদাননির্ভর গ্রহীতা”-য় পরিণত হন।
এটি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, সাংস্কৃতিক সমস্যাও।
কারণ এতে কর্মসংস্থান তৈরির ওপর চাপ কমে যায়। সরকার ভাবে, চাকরি দিতে না পারলেও মাসে কিছু টাকা দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষোভ ঠেকানো যাবে। ফলত শিল্পনীতি, বিনিয়োগ, উৎপাদন, দক্ষতা বৃদ্ধি—এসব কঠিন প্রশ্ন আড়ালে চলে যায়। নগদ ভাতা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক শর্টকাট।
আরও একটি সূক্ষ্ম বিপদ আছে। যখন কোনও প্রকল্প প্রায় সর্বজনীন হয়ে যায়, তখন প্রকৃত দরিদ্র এবং তুলনামূলক স্বচ্ছল মানুষের মধ্যে পার্থক্য মুছে যায়। ফলে সীমিত সরকারি সম্পদ ছড়িয়ে পড়ে এমন বহু মানুষের মধ্যে, যাঁদের হয়তো বাস্তবে সেই সহায়তার প্রয়োজন ততটা নেই। এর ফলে যাঁদের সত্যিই জরুরি সাহায্য দরকার, তাঁদের জন্য বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কমে যায়।
রাষ্ট্রের কাজ কি সবার হাতে সমান টাকা তুলে দেওয়া, না কি যাঁরা সবচেয়ে দুর্বল তাঁদের সবচেয়ে বেশি সহায়তা করা?
এই মৌলিক নীতিগত প্রশ্নটি আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রায় অনুপস্থিত।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, যে বিজেপি এতদিন “খয়রাতি রাজনীতি” বলে তৃণমূলকে আক্রমণ করত, তারাই আজ কার্যত একই মডেলকে আরও বড় আকারে গ্রহণ করছে। শুধু নাম পাল্টেছে, অঙ্ক বেড়েছে, কিন্তু দর্শন একই রয়ে গেছে। যেন রাজনৈতিক দল বদলেছে, কিন্তু ভোট-অর্থনীতির চরিত্র বদলায়নি।
ফলে আজ পশ্চিমবঙ্গের সামনে এক গভীর দ্বন্দ্ব দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতি। একদিকে নগদ ভাতার রাজনৈতিক নেশা, অন্যদিকে উৎপাদনশীল অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতা।
প্রশ্ন হল, এই পথের শেষ কোথায়?
কারণ ইতিহাস বলছে, দীর্ঘদিন ধরে ধার করে কল্যাণনীতি চালালে একসময় হিসাব মেলাতেই হয়। তখন হয় কর বাড়ে, নয় ঋণসঙ্কট তৈরি হয়, নয় উন্নয়ন থেমে যায়। বিশ্বের বহু দেশ এই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছে। অর্থনীতির নির্মম সত্য হল—কোনও রাষ্ট্র চিরকাল নিজের সামর্থ্যের বাইরে খরচ চালাতে পারে না।
আর তাই আজ অন্নপূর্ণা যোজনাকে ঘিরে প্রকৃত বিতর্কটি শুধু রাজনৈতিক নয়। এটি আসলে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দর্শনের প্রশ্ন। রাজ্য কি উৎপাদন, শিল্প, কর্মসংস্থান ও পরিকাঠামোর পথে হাঁটবে, না কি ক্রমশ নগদ ভাতানির্ভর এক স্থায়ী নির্বাচনী অর্থনীতিতে পরিণত হবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দশকের বাংলা নির্ধারণ করবে।