Home খবর ‘আরশোলা’ বিতর্কে কাঠগড়ায় প্রধান বিচারপতি

‘আরশোলা’ বিতর্কে কাঠগড়ায় প্রধান বিচারপতি

0 comments 4 views
A+A-
Reset

সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনোনয়নের শুনানিতে CJI সূর্য কান্তের মন্তব্যে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া

বাংলাস্ফিয়ারঃ ভারতীয় বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে ১৫ মে, ২০২৬ তারিখটি সম্ভবত একটি অপ্রীতিকর অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি (CJI) সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চে একটি মামুলি মামলার শুনানি চলাকালীন যে মন্তব্য উঠে এসেছে, তা বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্তরে এক তীব্র বাদানুবাদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঘটনা কী ছিল?

একজন আইনজীবী যখন নিজেকে ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’ হিসেবে মনোনীত করার দাবি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, ঠিক তখনই প্রধান বিচারপতির ক্ষোভ আছড়ে পড়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর এক বিশেষ অংশের ওপর। ঘটনাটি ঠিক কী ছিল? জনৈক আইনজীবী দিল্লির হাইকোর্ট থেকে সিনিয়র তকমা পাওয়ার জন্য ‘পার্সুইং’ বা তদবির করছিলেন। পেশাগত আচরণের এই ধরনটি প্রধান বিচারপতির পছন্দ হয়নি। শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সেই আবেদনকারীকে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করেন।

কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা যখন ব্যক্তিগত স্তর পেরিয়ে বৃহত্তর বেকার যুবসমাজকে লক্ষ্য করে ধাবিত হয়, তখনই তা বিতর্কের জন্ম দেয়। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, দেশে এমন কিছু বেকার যুবক রয়েছেন যারা কর্মসংস্থান না পেয়ে বা পেশায় জায়গা করতে না পেরে ‘আরশোলা’র মতো আচরণ করছেন। তাঁর মতে, এই যুবকদের একটি অংশ পরবর্তীতে মিডিয়া কর্মী, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট বা আরটিআই (RTI) কর্মী হয়ে ওঠেন এবং ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ শানান।

এই ‘আরশোলা’ এবং ‘পরজীবী’ (Parasites) শব্দ দুটির প্রয়োগ একজন শীর্ষ আদালতের বিচারপতির মুখ থেকে আসায় জনমানসে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে।

সংখ্যার কথা বলছে অন্য গল্প

ভারতের শ্রম মন্ত্রকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত যুবকদের একটি বড় অংশ যখন কাজের খোঁজে দিশেহারা, তখন তাঁদেরকে ‘আরশোলা’র সঙ্গে তুলনা করা কতটা যুক্তিযুক্ত, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

CBI তদন্তের ইঙ্গিত, ভুয়ো ডিগ্রি নিয়ে উদ্বেগ

প্রধান বিচারপতি ওই আইনজীবীর ফেসবুকের ভাষার প্রতিও ইঙ্গিত করেন এবং বলেন, ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ করা যদি কারোর নেশা হয়ে দাঁড়ায়, তবে তিনি সিনিয়র হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না।

বিচারপতির এই দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে আরও একটি গুরুতর বিষয় উঠে এসেছে। তিনি প্রকাশ্য আদালতে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই-কে নির্দেশ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যাতে কালো কোট পরিহিত আইনজীবীদের ডিগ্রির সত্যতা যাচাই করা হয়। তাঁর আশঙ্কা, বর্তমানে বার কাউন্সিল ভোটের রাজনীতির কারণে অনেক ভুয়ো ডিগ্রিধারী আইনজীবীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে।

বিচারপতির এই কড়া মনোভাব থেকে স্পষ্ট যে, তিনি বিচার ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ শুদ্ধিকরণ চাইছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে সেই ভাষা নিয়ে, যা দিয়ে তিনি এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ব্যক্ত করেছেন।

গণতন্ত্রের স্তম্ভকে খাটো করা?

সাংবাদিকতার দলিলে এই ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এটি কেবল একটি আইনি শুনানি ছিল না। এটি ছিল বিচার বিভাগের উচ্চস্তর থেকে সমাজের নিচুতলার ক্ষোভের প্রতি এক ধরনের কঠোর প্রতিক্রিয়া।

সাধারণত বিচারকদের পরিমিত ভাষা এবং নিরপেক্ষ অবস্থানই তাঁদের শক্তির উৎস। কিন্তু যখন শীর্ষ আদালতের মঞ্চ থেকে বেকারত্বকে সামাজিক অবক্ষয় বা পরজীবী আচরণের সমার্থক করে তোলা হয়, তখন তা গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ অর্থাৎ মিডিয়া এবং তথ্য জানার অধিকারের (RTI) মতো সাংবিধানিক হাতিয়ারের গুরুত্বকেও খাটো করে দেখায়।

সমালোচকরা বলছেন, আরটিআই বা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিজম সবসময় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘অহেতুক’ আক্রমণ নয়; বরং অনেক সময় তা অস্বচ্ছতাকে সামনে আনার একমাত্র পথ।

প্রতিবাদের ঝড়, তারপর ক্ষমা

প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সাধারণ মানুষ এবং আইনজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, পেশাগত অসততার শাস্তি অবশ্যই হওয়া উচিত, কিন্তু তার জন্য সামগ্রিক যুবসমাজ বা বেকারত্বকে কলঙ্কিত করা সংবিধানের মর্যাদাহানি করে।

দিনের শেষে ওই আইনজীবী ক্ষমা চেয়ে তাঁর পিটিশন প্রত্যাহার করে নিলেও, ‘আরশোলা’ বিতর্কটি বিচারবিভাগের ইতিহাসের নথিতে এক গভীর ক্ষত হিসেবে থেকে গেল।

এই ঘটনাটি আবার মনে করিয়ে দেয়, শব্দের ভার অনেক সময় তলোয়ারের চেয়েও তীক্ষ্ণ আর সেই শব্দ যদি দেশের সর্বোচ্চ ন্যায়ালয় থেকে আসে, তবে তার প্রতিধ্বনি সমাজকে দীর্ঘকাল বিদ্ধ করে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles