Home খবর ঝড়ের আগের শান্তি, তেলের দাম বাড়বে অবিশ্বাস্যহারে?

ঝড়ের আগের শান্তি, তেলের দাম বাড়বে অবিশ্বাস্যহারে?

0 comments 2 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ারঃ পেট্রোলিয়ামের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ-সংকট দ্রুত আরও বড় হয়ে উঠছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই প্রায় ২০০ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ থেকে হারিয়ে গেছে — যা বিশ্বের বার্ষিক তেল সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশ। প্রণালীটি যত দিন বন্ধ থাকবে, প্রতিদিন ঘাটতি আরও ১ কোটি ৪০ লক্ষ ব্যারেল করে বাড়বে। আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা থেমে যাওয়ায় শিগগিরই প্রণালী খোলার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না।

তবু তেলের বাজার এখন অবাক করার মতো শান্ত। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০৫ ডলারে নেমে এসেছে, যদিও এপ্রিল মাসে তা প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পরে দাম যেখানে ১২৯ ডলারে উঠেছিল, তার থেকেও এখনকার দাম কম। বাজারে এই মুহূর্তে যতটুকু অতিরিক্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে সেটা সত্যিকারের — কিন্তু এতে স্বস্তি পাওয়ার কারণ নেই। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বড় জ্বালানি-সংকট দেখা দিতে পারে।

দুই অপ্রত্যাশিত ত্রাণকর্তা

এই মুহূর্তে দুটি দেশ বিশ্বকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

প্রথমটি আমেরিকা। দেশটি এখন প্রতিদিন ৯০ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল রপ্তানি করছে — গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৪০ লক্ষ ব্যারেল বেশি। আমেরিকার তেল কোম্পানিগুলো দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিয়ে বিদেশের বাজারে বেশি দামে তেল বিক্রি করছে। পাশাপাশি সরকার মার্চ মাস থেকে জাতীয় তেলের মজুত (স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ) থেকে তেল ছাড়তে শুরু করেছে, যা দেশের ভেতরের সরবরাহে চাপ না ফেলেই রপ্তানি বাড়াতে সাহায্য করছে।

দ্বিতীয় দেশটি চীন। দেশটি গত বছরের তুলনায় প্রতিদিন ৪৫ লক্ষ ব্যারেল কম তেল আমদানি করছে। একদিকে দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চাহিদা কমেছে, অন্যদিকে সরকার শোধনাগারগুলোকে বাইরে তেল বিক্রি বন্ধ করে নিজের মজুত ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে। এতে বিদেশি তেলের উপর চীনের নির্ভরতা কমে গেছে।

এই দুই দেশের পদক্ষেপ এবং গরিব দেশগুলোতে জ্বালানি রেশনিং — এই সব মিলিয়ে বাজার এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু হরমুজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে সামনে বড় ঝড় আসছে।

মজুত ফুরিয়ে আসছে, বিপদ ঘনাচ্ছে

যুদ্ধ শুরুর সময় বিশ্বে তেলের মজুত ছিল গত দশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চের কাছাকাছি। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল না আসায় দেশগুলো যখন নিজের মজুত ভাঙতে শুরু করেছে, তখন জুন মাসের মধ্যেই সেই ভাণ্ডার ইতিহাসের সবচেয়ে নিচে নেমে যেতে পারে। যুদ্ধের আগে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অতিরিক্ত রপ্তানির ফলে সমুদ্রে যে বিপুল পরিমাণ তেলের ভাসমান মজুত তৈরি হয়েছিল, তার বড় অংশই ইতিমধ্যে ফুরিয়ে এসেছে। আমেরিকা ও চীনের জাতীয় ভাণ্ডারও চিরকাল চলবে না, দরিদ্র দেশগুলির সামান্য মজুতের কথা তো ছেড়েই দেওয়া যায়।

তখন ধনী দেশগুলোর বেসরকারি মজুতও কমতে শুরু করবে। আর সেই মুহূর্তে দাম হঠাৎ করে অনেক বেড়ে যেতে পারে কারণ মজুত যেমন কম থাকবে, তেমনি সেটা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অসমানভাবে ছড়িয়ে থাকবে।

প্রথম ধাক্কা পড়বে পরিশোধিত জ্বালানিতে — ডিজেল, পেট্রল ও বিমান জ্বালানিতে। এগুলোর মজুত ইতিমধ্যেই দ্রুত কমছে এবং দাম অপরিশোধিত তেলের চেয়ে অনেক বেশি হারে বাড়ছে। মজুত আরও কমলে দাম আরও অনেক উপরে উঠবে।

চীনের বাজারে ফেরার আশঙ্কা

চীনের হাতে এখন প্রায় ১২০ কোটি ব্যারেল মজুত রয়েছে, তাই তারা কয়েক মাস আমদানি না করেও চলতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা নিজেদের নিরাপত্তা-ভাণ্ডার ধরে রাখতেও চাইবে। ফলে এক পর্যায়ে তাদের আবার বাজার থেকে তেল কিনতে হতে পারে — আর তখন দামের উপর চাপ আরও বাড়বে।

ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বাড়তে পারে বিপদ

আরেকটি বড় ঝুঁকি হল ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধৈর্যচ্যুতি। দেশের মজুত যখন কমতে থাকবে এবং রপ্তানি বাড়তে থাকবে, বিশেষত যদি পেট্রলের দাম গ্যালন প্রতি ৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়, তখন ট্রাম্প ও তাঁর “আমেরিকা ফার্স্ট” সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠবেন। ২০২২ সালে এই ধরনের মূল্যবৃদ্ধি শুধু সাধারণ মানুষের পকেটে টান দেয়নি, প্রেসিডেন্ট বাইডেনের জনপ্রিয়তাও কমিয়ে দিয়েছিল।

ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ভাবছে। যদি সত্যিই তা করা হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত লাফিয়ে উঠবে। আমেরিকার যেসব উপকূলীয় এলাকা আমদানির উপর নির্ভরশীল, সেগুলো বেশি দামে কিনতে বাধ্য হবে এবং অন্য দেশগুলোর পাল্টা ব্যবস্থার শিকার হতে পারে। আমেরিকার শোধনাগারগুলোও লাভ কমে যাওয়ায় উৎপাদন কমাবে।

 

বিশ্ব অর্থনীতি এখন ঝড়ের মাঝে একটু শান্ত জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু নিরাপদ তীরে পৌঁছাতে এখনও অনেক পথ বাকি। আমেরিকার একটি ভুল সিদ্ধান্তই গোটা বিশ্ব অর্থনীতিকে উল্টে দিতে পারে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles