Home খবর ক্ষমতার নকশা এখনও আঁকা হচ্ছে

ক্ষমতার নকশা এখনও আঁকা হচ্ছে

0 comments 4 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ারঃ পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিকতা সারা হলেও, প্রকৃত অর্থে সরকার এখনও পূর্ণতা পায়নি। ব্রিগেড প‍্যারেড গাউন্ডে অনেক ঘটা করে মুখ্যমন্ত্রী সহ মাত্র ছয়জন মন্ত্রী শপথ নেওয়ার পরে যে দৃশ্যটি তৈরি হয়েছে, তা ভারতের সাধারণ রাজনৈতিক রীতির সঙ্গে খুব একটা মেলে না। সাধারণত ক্ষমতার পরিবর্তনের পরে নতুন সরকার দ্রুত পূর্ণ মন্ত্রিসভা ঘোষণা করে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বার্তা দিতে চায়। এখানে ঠিক উল্টোটা ঘটেছে। বাকিরা “অপেক্ষমান”। আর সেই অপেক্ষাই এখন রাজ্যের রাজনৈতিক করিডরে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ।

এই বিলম্ব নিছক প্রশাসনিক জটিলতা নয় বলেই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক। কারণ, কোনও সরকার যখন মাত্র হাতে গোনা কয়েকজনকে নিয়ে কাজ শুরু করে, তখন সেটি সাধারণত দুটি ইঙ্গিত দেয়। প্রথমত, ক্ষমতার কেন্দ্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার লড়াই পর্দার আড়ালে তীব্রভাবে চলছে।

নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সামনে সমস্যাও কম নয়। দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতি করার পরে প্রশাসন চালানো এক জিনিস, আর একটি বিপুল রাজ্যযন্ত্রকে নতুনভাবে সাজানো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, প্রশাসনিকভাবে ক্লান্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে চাপগ্রস্ত রাজ্যে মন্ত্রিসভা গঠন শুধু পদ বণ্টনের প্রশ্ন নয়; এটি ক্ষমতার স্থাপত্য নির্মাণের কাজ।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে প্রতিনিধিত্ব। বিজেপির জয়ের পিছনে উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল, শহরতলি, মতুয়া অধ্যুষিত এলাকা, এমনকি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কিছু অঞ্চলেও ভোটের অদ্ভুত পুনর্বিন্যাস ঘটেছে। ফলে নতুন সরকারকে এমন একটি মন্ত্রিসভা তৈরি করতে হবে যেখানে অঞ্চল, জাতিগত পরিচয়, সাংগঠনিক আনুগত্য, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক বার্তা—সব একসঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এই কাজটি সহজ নয়।

দলের একাংশ চাইছে পুরনো সংগঠক এবং দীর্ঘদিনের অনুগতদের পুরস্কৃত করা হোক। অন্য অংশ চাইছে প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন “টেকনোক্র্যাট” ধাঁচের মুখ সামনে আনা হোক, যাতে সরকার শুরু থেকেই দক্ষতার বার্তা দিতে পারে। আবার দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেরও নিজস্ব হিসাব রয়েছে। কারণ পশ্চিমবঙ্গ এখন শুধু একটি রাজ্য নয়; এটি জাতীয় রাজনীতির প্রতীকী যুদ্ধক্ষেত্র। ফলে মন্ত্রিসভার প্রতিটি নাম জাতীয় স্তরেও বার্তা বহন করবে।

এই কারণেই শোনা যাচ্ছে, প্রতিটি মন্ত্রিত্ব নিয়ে বহুস্তরীয় আলোচনা চলছে। কে স্বরাষ্ট্র পাবে, কে অর্থ, কে শিক্ষা, কে ভূমি—এসব শুধু প্রশাসনিক বিভাগ নয়, এগুলি ক্ষমতার স্নায়ুকেন্দ্র। বিশেষত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য দপ্তর নিয়ে আলাদা সতর্কতা রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে আলোচনা। গত সরকারের সময়ে এই দুই ক্ষেত্র নিয়েই সবচেয়ে বেশি জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ফলে নতুন সরকার এখানে ভুল বার্তা দিতে চায় না।

আবার একটি বাস্তব সমস্যা রয়েছে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে দ্রুত বড় হয়েছে, কিন্তু সেই বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব স্তরে অভিজ্ঞ প্রশাসনিক মুখ তৈরি হয়নি। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বক্তৃতা, আন্দোলন এবং নির্বাচনী কৌশলই মুখ্য ছিল। কিন্তু সরকার চালাতে দরকার ফাইল, নীতি, আমলাতন্ত্র এবং ক্রমাগত সমন্বয়। ফলে অনেক সম্ভাব্য মন্ত্রীকে নিয়ে প্রশ্ন উঠছে—তাঁরা কি প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে পারবেন?

এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী আপাতত ছোট মন্ত্রিসভা রেখে নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করতে চাইছেন বলেও মনে করছেন অনেকে। এতে সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া যায়, এবং ভুল মানুষকে তাড়াহুড়ো করে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর দেওয়ার ঝুঁকি কমে। ভারতের রাজনীতিতে এর উদাহরণ নতুন নয়। অনেক মুখ্যমন্ত্রী প্রথমে “কোর টিম” তৈরি করে পরে ধাপে ধাপে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ করেছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি আলাদা, কারণ এখানে জনতার প্রত্যাশা অত্যন্ত উঁচু।

নতুন সরকারের সামনে ইতিমধ্যেই একাধিক জরুরি প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে—রাজ্যের আর্থিক ঘাটতি, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, শিল্প বিনিয়োগ ফেরানো, স্বাস্থ্য অবকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন। এই অবস্থায় পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা না থাকলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ধীর হতে পারে। আমলাতন্ত্রও তখন অপেক্ষার মোডে চলে যায়। কোন মন্ত্রী আসছেন, কোন নীতি বদলাবে, কার নির্দেশ চূড়ান্ত—এসব স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক যন্ত্র সাধারণত সাবধানী হয়ে থাকে।

তবে রাজনৈতিক দিক থেকে এই বিলম্বের একটি সুবিধাও আছে। এতে নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে “চূড়ান্ত বিচারক” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। সবাই অপেক্ষা করছে তাঁর সিদ্ধান্তের জন্য। অর্থাৎ সরকার শুরু হওয়ার মুহূর্তেই ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়, সেটি স্পষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের জোট রাজনীতি বা আঞ্চলিক গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে ভোগা বহু দলে এই ধরনের নিয়ন্ত্রিত বিলম্ব ইচ্ছাকৃতভাবেও করা হয়।

রাজনৈতিক মহলে আরও একটি আলোচনা চলছে—কিছু গুরুত্বপূর্ণ নামকে নিয়ে এখনও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের চূড়ান্ত সম্মতি আসেনি। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভিতরে বিভিন্ন গোষ্ঠী বহুদিন ধরেই সক্রিয়। নির্বাচনের পরে সেই গোষ্ঠীগত টানাপড়েন আরও দৃশ্যমান হয়েছে। ফলে মন্ত্রিসভা শুধু প্রশাসনিক দল নয়, এটি আসলে শক্তির ভারসাম্যের নকশা।

এই কারণেই এখন রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যটি কোনও জনসভা নয়, বরং অপেক্ষা। রাজভবনের শপথমঞ্চ আপাতত অসম্পূর্ণ। এবং সেই অসম্পূর্ণতাই হয়তো বলে দিচ্ছে যে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও ক্ষমতার প্রকৃত বিন্যাস এখনও তৈরি হচ্ছে।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles