২৩ এপ্রিলের ভোট এবং এসআইআরের ছায়া

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের ১৫২টি বিধানসভা আসনে যেদিন ভোট পড়ল, সেদিন ব্যালটের চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল একটাই — কে ভোট দিতে পারবেন, আর কে পারবেন…
- মুর্শিদাবাদের ইমরান হোসেন মাসের পর মাস রাত জেগে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভোটার তথ্য যাচাই করেছিলেন সরকারি কর্মী হিসেবে।
- অথচ চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখলেন তাঁর নিজের গ্রামের ৪৬০ জন বৈধ ভোটারের নাম উধাও — এর মধ্যে তাঁর নিজেরটিও।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের ১৫২টি বিধানসভা আসনে যেদিন ভোট পড়ল, সেদিন ব্যালটের চেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছিল একটাই — কে ভোট দিতে পারবেন, আর কে পারবেন না।
মুর্শিদাবাদের ইমরান হোসেন মাসের পর মাস রাত জেগে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ভোটার তথ্য যাচাই করেছিলেন সরকারি কর্মী হিসেবে। অথচ চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর দেখলেন তাঁর নিজের গ্রামের ৪৬০ জন বৈধ ভোটারের নাম উধাও — এর মধ্যে তাঁর নিজেরটিও।
এই একটি গল্পের মধ্যেই এবারের নির্বাচনের অন্তর্নিহিত সংকটের পুরো ছবি ধরা আছে।
৯১ লক্ষ নাম, একটি প্রক্রিয়া
স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর। নামটি শুনলে নিরীহ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ধারণা হয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম মুছে গেছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এর মধ্যে ৬০ লক্ষের বেশিকে মৃত বা অনুপস্থিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, আর ২৭ লক্ষ মামলা ট্রাইব্যুনালের সামনে বিচারাধীন ছিল। সারা রাজ্যজুড়ে এই ক্ষতির অংশ প্রথম দফার ১৫২টি আসনের উপরেও সমানভাবে পড়েছে।
ভূগোল এবং সংখ্যার রাজনীতি
সংখ্যাগুলো বলার আগে ভূগোলটা বোঝা দরকার। প্রথম দফার ১৫২ আসনের মধ্যে মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুর — এই তিনটি মুসলিম অধ্যুষিত জেলায় মোট ৪৩টি আসন। এই আসনগুলোতেই এসআইআরের আঘাত সবচেয়ে গভীর। মুর্শিদাবাদ জেলায় একাই চার লক্ষেরও বেশি নাম বাদ পড়েছে।
কিন্তু সংখ্যার চেয়েও উদ্বেগজনক হল বাদ পড়ার কারণটি। গবেষকরা বলছেন, মৃত্যু এবং ঠিকানা পরিবর্তন হল বাদ পড়ার সবচেয়ে বড় কারণ সামগ্রিকভাবে। কিন্তু মুসলিম ভোটারদের ক্ষেত্রে বাদ পড়ার প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ — নামের বানানে সামান্য পার্থক্য বা তথ্যের ছোট অসঙ্গতি। বাংলাভাষী মুসলিমদের একটি বড় অংশের মধ্যে যেহেতু নির্দিষ্ট পারিবারিক পদবির চল কম, সেহেতু এই অ্যালগরিদমিক ফিল্টার তাঁদের উপর অসামঞ্জস্যভাবে পড়েছে।
সংখ্যাটা আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র ভিত্তিতে বাদ পড়া ২৭ লক্ষ ভোটারের মধ্যে প্রায় ১৭ লক্ষই মুসলিম সম্প্রদায়ের।
এবং এই প্রক্রিয়ার একটি যন্ত্রণাদায়ক ফলাফলও ধরা পড়েছে সুনির্দিষ্ট আসনে। মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর কেন্দ্রে আগে হিন্দু-মুসলিম ভোটারের অনুপাত ছিল ৪৬:৫৪। এসআইআরের পর সেটি দাঁড়িয়েছে ৫২:৪৮। একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কেন্দ্র কার্যত রাতারাতি হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেছে।
শুধু মুসলিম নয়, ক্ষতি আরও গভীরে
কিন্তু এসআইআরের প্রভাব শুধু মুসলিম ভোটারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় আর এখানেই এর রাজনৈতিক হিসাবটা জটিল হয়ে পড়ে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণ বলছে, তফশিলি জাতির ভোটাররা, বিশেষত মতুয়া সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। একইভাবে মহিলা ভোটার এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসী শ্রমিকরাও এই তালিকা ছাঁটাইয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রথম দফার আসনগুলোতে পুরুষের তুলনায় মহিলা ভোটারের অনুপাত লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তৃণমূলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভোটব্যাঙ্কের একটি অংশ হল গ্রামীণ মহিলারা যাঁরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার এবং স্বাস্থ্যসাথীর সুবিধাভোগী।
এই বিন্দুতে এসে বিজেপি এবং তৃণমূল, দুই দলের হিসাবই উলটে যায়।
বিজেপির ফ্রেম এবং মতুয়া অন্তর্বিরোধ
বিজেপির কাছে এসআইআর ছিল একটি বার্তা, একটি ফ্রেম। দলটি এই প্রক্রিয়াকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ ভোটার সাফ করার ন্যায্য উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছে। তার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে সিএএ এবং সীমান্ত সুরক্ষার বয়ান। তাত্ত্বিকভাবে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা কমলে বিজেপির পক্ষে হিন্দু ভোটের সংহতি ঘটানো সহজ হওয়ার কথা।
বিজেপির নির্বাচনী প্রচার ছিল দিল্লি থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত, এবং অর্থ ও জনশক্তি উভয় দিক থেকেই ব্যাপক বিনিয়োগে সাজানো। হিন্দু ভোটকে একত্রিত করার কৌশল নিয়ে উত্তরবঙ্গ ও সীমান্তবর্তী এলাকায় দলের সাংগঠনিক ভিত আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে মজবুত হয়েছে।
কিন্তু এখানেই মতুয়া প্রশ্নটি বিজেপির পায়ে কাঁটা হয়ে বেঁধেছে। মতুয়া সম্প্রদায় পূর্ববঙ্গ থেকে আসা হিন্দু উদ্বাস্তু। এসআইআরে মতুয়াদের একটি অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, কারণ তাঁদের নিজেদেরও নাগরিকত্বের ইতিহাস জটিল। বিজেপি তাঁদের কাছে সিএএর মাধ্যমে নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু একই সময়ে যে এসআইআর প্রক্রিয়াটি বিজেপি সমর্থন করেছে, সেটি তাঁদের ভোটার তালিকা থেকেও মুছে দিয়েছে। এই অন্তর্বিরোধটি গোপন থাকেনি।
তৃণমূলের সুবিধা এবং সংকট
তৃণমূলের দিক থেকে হিসাবটা আলাদা। যে জেলা ও আসনগুলোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মনে করছেন যে তাঁরা অসামঞ্জস্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, সেখানে তৃণমূলের পক্ষে ভোটের সংহতি বাড়ছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা। প্রচলিত যে অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি বিজেপির পক্ষে কাজ করার কথা ছিল, সেটিকে কিছুটা হলেও ঢেকে দিচ্ছে এই আশ্রয়ের রাজনীতি।
তৃণমূল এসআইআরকে কেন্দ্রের রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার পরিচয় রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। এই বয়ান মুসলিম ভোটারদের মধ্যে অত্যন্ত কার্যকর।
কিন্তু তৃণমূলের সমস্যা অন্যত্র। প্রথম দফার ১৫২টি আসনের মধ্যে ২০২১ সালে তৃণমূল জিতেছিল ৯২টিতে, বিজেপির দখলে ছিল ৫৯টি। অর্থাৎ এই দফায় তৃণমূলের হারাবার বেশি, বিজেপির পাওয়ার সুযোগ বেশি। মহিলা ভোটারের হ্রাস তৃণমূলের একটি মূল ভিত্তিকেই সরু করে দিয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অভিবাসী শ্রমিকরা যাঁরা পুরনো বাসস্থানে নথিভুক্ত থেকেও বাস্তবে অন্যত্র আছেন, তাঁরাও এই প্রক্রিয়ায় ভোটাধিকার হারিয়েছেন। এই শ্রেণিটি মূলত গরিব, ঐতিহাসিকভাবে তৃণমূলের সমর্থক।
গণতন্ত্রের বড় প্রশ্ন
সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত এই বিষয়টি গড়িয়েছে, এবং এসআইআর এখন ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে বৃহত্তর প্রশ্নের কেন্দ্রে। নির্বাচন কমিশন নিজেই এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হয়ে উঠেছে বলে পর্যবেক্ষকরা মন্তব্য করছেন।
কাঠামোগত নকশার বিচারে এসআইআর থেকে বিজেপির সুবিধা পাওয়ার কথা। নির্দিষ্ট আসনে মুসলিম ভোটারের অনুপাত কমলে হিন্দু ভোটের সংহতিতে ফল বদলে যেতে পারে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতি কখনো নকশামাফিক চলে না। এসআইআরের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া — মুসলিম ভোটারদের একজোট হওয়া, তৃণমূলের রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া — সেই গাণিতিক সুবিধার একটি বড় অংশ খেয়ে নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আর মতুয়া ও মহিলা ভোটারের ক্ষতি বিজেপির হিন্দু ভোট সংহতির হিসাবেও ফাটল ধরিয়েছে।
৪ঠা মে ফল বেরোনোর আগে পর্যন্ত চূড়ান্ত কথাটা বলা যাবে না। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট যে এবারের ভোটে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা শুধু কে জিতবে তা নয়, বরং কতজন জেতার সুযোগই পেলেন না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



