গণতন্ত্রের পরীক্ষা: বাংলায় ভোটের দিন, নির্বাচন কমিশনের সামনে এক অস্বস্তিকর আয়না

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: ২৩ এপ্রিল, পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি জেলায় ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটের ঘণ্টা বাজছে।
- প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে এবং ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ শেষে ৪ মে প্রকাশ পাবে ফলাফল।
- কিন্তু ভোটের বাক্স খোলার আগেই প্রশ্নটি উঠে গেছে — বাংলায় কি সত্যিই অবাধ, নির্ভীক ভোট হওয়া সম্ভব?
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: ২৩ এপ্রিল, পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি জেলায় ১৫২টি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটের ঘণ্টা বাজছে। প্রথম দফায় ১৫২টি আসনে এবং ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ শেষে ৪ মে প্রকাশ পাবে ফলাফল। কিন্তু ভোটের বাক্স খোলার আগেই প্রশ্নটি উঠে গেছে — বাংলায় কি সত্যিই অবাধ, নির্ভীক ভোট হওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নের ভার বহন করছে নির্বাচন কমিশন, রাজ্যের ৬ কোটিরও বেশি ভোটার এবং একটি রাজনৈতিক ইতিহাস যা হিংসা, ভয় আর পেশিশক্তির দীর্ঘ ছায়ায় ঢাকা।
মোট ৭ কোটি ৪ লক্ষেরও বেশি ভোটার এবার নথিভুক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩ কোটি ৬০ লক্ষ এবং মহিলা ভোটার ৩ কোটি ৪৪ লক্ষ। সংখ্যার বিচারে এ এক বিশাল গণতান্ত্রিক অনুশীলন। কিন্তু সেই অনুশীলনে সামিল হওয়ার পথটা কতটা মসৃণ, তা নিয়েই যত উদ্বেগ।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল ৮ দফায়। এবার মাত্র দুই দফায় গোটা রাজ্যের ভোট সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। দফার সংখ্যা কমানো মানে প্রতিটি দফায় অনেক বেশি বুথের উপর একসঙ্গে নজর রাখতে হবে কমিশনকে। এবং সেই বুথগুলির অনেকাংশই নিরাপত্তার বিচারে উদ্বেগজনক। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় সমস্ত বুথই এই মুহূর্তে ‘স্পর্শকাতর’ এবং তার মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রায় সাড়ে আট হাজার ‘অতি-স্পর্শকাতর’ বুথ।
এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে মাঠে নামানো হয়েছে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর বিশাল বহর। প্রথম দফার ভোটে সংবেদনশীল বুথগুলিতে বিশেষ নজর রাখতে সিআরপিএফ, বিএসএফ, সিআইএসএফ, এসএসবি এবং আইটিবিপি সহ ২,৪০০-এরও বেশি কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী অর্থাৎ প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার জওয়ান মোতায়েন করা হচ্ছে। সিআইএসএফ মহাপরিচালক প্রবীর রঞ্জন বলেছেন, “পশ্চিমবঙ্গে আমাদের মিশন স্রেফ নিরাপত্তার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। এটা ব্যালটের পবিত্রতা রক্ষার লড়াই।”
কেন্দ্রীয় বাহিনীর এই ব্যাপক উপস্থিতি একদিকে যেমন ভোটারদের মনে ভরসা জোগাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই প্রশ্ন তুলছে রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। নির্বাচন কমিশন পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে বলে দিয়েছে, আগে ভোট-অশান্তিতে যারা যুক্ত ছিল, তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে। পদক্ষেপে দেরি কেন, সেই প্রশ্নও তুলেছে কমিশন। শেষমেশ রাতারাতি তৎপরতা দেখাতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ — কোচবিহার, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ থেকে এক রাতেই গ্রেফতার করা হয়েছে ১৩৫ জন দাগি অপরাধীকে। এমন নজিরবিহীন একরাত্রির গ্রেফতারি প্রশ্ন তোলে — এই তৎপরতা যদি আজই সম্ভব ছিল, তাহলে আগে কেন হয়নি?
ভোটার তালিকা নিয়েও এবার তৈরি হয়েছে গভীর বিতর্ক। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন শুরুর পর প্রাথমিক খসড়ায় প্রায় ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জন ভোটারের নাম বাদ পড়ে। তথ্যগত অসংগতির কথা বলে তাঁদের নাম পরবর্তী শুনানি সাপেক্ষে ‘বিবেচনায়’ রাখা হয়। সিএএ এবং ভোটার তালিকার এই সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে মুসলিম সমাজ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে প্রবল উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচনী তালিকার চূড়ান্ত প্রকাশনার পর থেকে মনোনয়ন বন্ধ হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে প্রায় ৭ লক্ষ নতুন ভোটারের নাম যোগ করা হয়েছে ফর্ম-৬ আবেদনের মাধ্যমে। এই নতুন সংযোজন নিয়েও তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে, কারণ বিরোধীরা অভিযোগ করছেন — কোন কোন অঞ্চলে নাম বাদ গেছে আর কোথায় যোগ হয়েছে, তার একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক প্যাটার্ন রয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেস টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পর এবার চতুর্থবার সরকার গঠনের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। মূল লড়াই বিজেপির সঙ্গে, তবে একাধিক আসনে কংগ্রেস, সিপিআইএম, আইএসএফ ও অন্যান্য দলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকবে। এবারের সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ভবানীপুর থেকে লড়ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী, যিনি একইসঙ্গে নন্দীগ্রামেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রাজনৈতিক লড়াইয়ের মানচিত্র যতটা রঙিন, ততটাই জটিল এর সামাজিক পটভূমি। রাজ্যে এক ধরনের ধর্মীয় মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে — বামফ্রন্টের বিপর্যয়ের পর হিন্দুত্ববাদী শক্তির প্রসার এবং বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নিরাপত্তাহীনতার আবহ এই মেরুকরণকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এর পাশাপাশি রাজ্যের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ২০২৩ সাল থেকে স্থগিত, কর্মসংস্থানের অভাব তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে।
নির্বাচন কমিশন বারবার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন তাদের একমাত্র লক্ষ্য। ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সমস্ত বুথে ওয়েবকাস্টিং করা হবে। কিন্তু প্রযুক্তি আর কেন্দ্রীয় বাহিনীর বর্ম পরেও যে প্রশ্নটি রয়ে যায়, তা হল — গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা কি শুধু ভোটের দিনের, নাকি সেই দিনের আগে ও পরে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তারও? আজ বাংলার কোটি কোটি মানুষ ভোট দিতে বেরোচ্ছেন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল ৮ দফায়। এবার মাত্র দুই দফায় গোটা রাজ্যের ভোট সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। দফার সংখ্যা কমানো মানে প্রতিটি দফায় অনেক বেশি বুথের উপর একসঙ্গে নজর রাখতে হবে কমিশনকে। এবং সেই বুথগুলির অনেকাংশই নিরাপত্তার বিচারে উদ্বেগজনক। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের প্রায় সমস্ত বুথই এই মুহূর্তে ‘স্পর্শকাতর’ এবং তার মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে প্রায় সাড়ে আট হাজার ‘অতি-স্পর্শকাতর’ বুথ।
এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে মাঠে নামানো হয়েছে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর বিশাল বহর। প্রথম দফার ভোটে সংবেদনশীল বুথগুলিতে বিশেষ নজর রাখতে সিআরপিএফ, বিএসএফ, সিআইএসএফ, এসএসবি এবং আইটিবিপি সহ ২,৪০০-এরও বেশি কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী অর্থাৎ প্রায় ১ লক্ষ ৯০ হাজার জওয়ান মোতায়েন করা হচ্ছে। সিআইএসএফ মহাপরিচালক প্রবীর রঞ্জন বলেছেন, “পশ্চিমবঙ্গে আমাদের মিশন স্রেফ নিরাপত্তার গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। এটা ব্যালটের পবিত্রতা রক্ষার লড়াই।”
কেন্দ্রীয় বাহিনীর এই ব্যাপক উপস্থিতি একদিকে যেমন ভোটারদের মনে ভরসা জোগাচ্ছে, অন্যদিকে তেমনই প্রশ্ন তুলছে রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। নির্বাচন কমিশন পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে বলে দিয়েছে, আগে ভোট-অশান্তিতে যারা যুক্ত ছিল, তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করতে হবে। পদক্ষেপে দেরি কেন, সেই প্রশ্নও তুলেছে কমিশন। শেষমেশ রাতারাতি তৎপরতা দেখাতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ — কোচবিহার, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ থেকে এক রাতেই গ্রেফতার করা হয়েছে ১৩৫ জন দাগি অপরাধীকে। এমন নজিরবিহীন একরাত্রির গ্রেফতারি প্রশ্ন তোলে — এই তৎপরতা যদি আজই সম্ভব ছিল, তাহলে আগে কেন হয়নি?
ভোটার তালিকা নিয়েও এবার তৈরি হয়েছে গভীর বিতর্ক। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন শুরুর পর প্রাথমিক খসড়ায় প্রায় ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জন ভোটারের নাম বাদ পড়ে। তথ্যগত অসংগতির কথা বলে তাঁদের নাম পরবর্তী শুনানি সাপেক্ষে ‘বিবেচনায়’ রাখা হয়। সিএএ এবং ভোটার তালিকার এই সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে মুসলিম সমাজ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে প্রবল উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচনী তালিকার চূড়ান্ত প্রকাশনার পর থেকে মনোনয়ন বন্ধ হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে প্রায় ৭ লক্ষ নতুন ভোটারের নাম যোগ করা হয়েছে ফর্ম-৬ আবেদনের মাধ্যমে। এই নতুন সংযোজন নিয়েও তুমুল রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে, কারণ বিরোধীরা অভিযোগ করছেন — কোন কোন অঞ্চলে নাম বাদ গেছে আর কোথায় যোগ হয়েছে, তার একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক প্যাটার্ন রয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেস টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পর এবার চতুর্থবার সরকার গঠনের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। মূল লড়াই বিজেপির সঙ্গে, তবে একাধিক আসনে কংগ্রেস, সিপিআইএম, আইএসএফ ও অন্যান্য দলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকবে। এবারের সবচেয়ে আলোচিত প্রার্থী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি ভবানীপুর থেকে লড়ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী, যিনি একইসঙ্গে নন্দীগ্রামেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
রাজনৈতিক লড়াইয়ের মানচিত্র যতটা রঙিন, ততটাই জটিল এর সামাজিক পটভূমি। রাজ্যে এক ধরনের ধর্মীয় মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে — বামফ্রন্টের বিপর্যয়ের পর হিন্দুত্ববাদী শক্তির প্রসার এবং বাংলাদেশ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নিরাপত্তাহীনতার আবহ এই মেরুকরণকে আরও তীব্র করে তুলেছে। এর পাশাপাশি রাজ্যের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা ২০২৩ সাল থেকে স্থগিত, কর্মসংস্থানের অভাব তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে।
নির্বাচন কমিশন বারবার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন তাদের একমাত্র লক্ষ্য। ভোটের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সমস্ত বুথে ওয়েবকাস্টিং করা হবে। কিন্তু প্রযুক্তি আর কেন্দ্রীয় বাহিনীর বর্ম পরেও যে প্রশ্নটি রয়ে যায়, তা হল — গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা কি শুধু ভোটের দিনের, নাকি সেই দিনের আগে ও পরে যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তারও? আজ বাংলার কোটি কোটি মানুষ ভোট দিতে বেরোচ্ছেন সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



