পটভূমি: বাংলায় সংঘের তিন অধ্যায়

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাংগঠনিক দুর্বলতা কারো অজানা নয়। দলের নিজস্ব কোনো শিকড় নেই মাঠে, নেই প্রশিক্ষিত ক্যাডার। এই শূন্যস্থানটাই পূরণ করে আসছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ — নিঃশব্দে, পদ্ধতিগতভাবে এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায়।
সাংবাদিক স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য তাঁর Mission Bengal: A Saffron Experiment গ্রন্থে বাংলায় আরএসএসের যাত্রাকে তিনটি পর্বে ভাগ করেছেন। প্রথম পর্ব ১৯৩৯ থেকে ১৯৫৩, দ্বিতীয় ও দীর্ঘতম পর্ব ১৯৫৩ থেকে ২০০৮, আর তৃতীয় পর্ব ২০০৯ থেকে আজ পর্যন্ত — ক্রমাগত উত্থানের পর্ব।
তৃতীয় পর্বটির শুরু হয় ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচনের পর, যখন বামফ্রন্ট ৪২টি আসনের মধ্যে মাত্র ১৫টি পায়। সেই মুহূর্ত থেকেই সংঘের সব শাখাসংগঠনকে বলা হয় বিস্তারে মনোযোগ দিতে, কারণ বামফ্রন্ট সরকারের পতন তখন কেবল সময়ের অপেক্ষা।

শাখার সংখ্যায় বিস্ফোরণ

পরিসংখ্যান কথা বলে। ২০১৩ থেকে ২০১৭ — মাত্র চার বছরে বাংলায় সংঘের শাখার সংখ্যা ৭৫০ থেকে বেড়ে ১,৫০০ হয়ে যায়, অর্থাৎ দ্বিগুণ। ২০২০ সালে এই সংখ্যা পৌঁছায় ১,৬০০-তে, যা বাংলায় আরএসএসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
এরপরও থামেনি। ২০২৩ থেকে ২০২৫-এর মধ্যে কেবল মধ্যবঙ্গ প্রান্তেই শাখার সংখ্যা ১,৩২০ থেকে বেড়ে ১,৮২৩ হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গ প্রান্তে ১,২০৬ থেকে বেড়ে ১,৫৬৪, উত্তরবঙ্গ প্রান্তে ১,০৩৪ থেকে ১,১৫৩। সব মিলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের তেরো বছরে বাংলার তিনটি প্রান্তে মোট ৩,৫০০ শাখা গড়ে উঠেছে।

ভৌগোলিক কৌশল: চারটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল

আরএসএসের বিস্তার এলোমেলো নয়, অত্যন্ত পরিকল্পিত। সংঘ চারটি পিছিয়ে পড়া অঞ্চলকে তাদের সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে — পশ্চিমাঞ্চল বা জঙ্গলমহল, উত্তরবঙ্গ, সুন্দরবনের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ, এবং বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চল।
লক্ষণীয়ভাবে, সংঘের এই তৃণমূলস্তরের কাজের ভৌগোলিক অবস্থান ও বিজেপি যে এলাকাগুলিতে সবচেয়ে বেশি নির্বাচনী অগ্রগতি করেছে — দুটো মানচিত্র প্রায় হুবহু মিলে যায়।
দক্ষিণবঙ্গেই এখন ৯০০-রও বেশি শাখা, বিশেষত উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা, হুগলি, বীরভূম, হাওড়া, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরে। সীমান্ত জেলাগুলিতে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সংঘের সক্রিয়তা সবচেয়ে বেশি।

শুধু শাখা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক জাল

শাখার বাইরে আরও গভীর কাজ চলছে অঙ্গসংগঠনগুলির মাধ্যমে। আরএসএসের অঙ্গসংগঠন — বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (১৯৬৪), বিদ্যা ভারতী (১৯৭০-এর দশক), বনবাসী কল্যাণ আশ্রম (১৯৮০-র শুরুতে), একল অভিযান (১৯৮৯), সেবা ভারতী (১৯৮০-র শেষে) — এরা বামফ্রন্ট আমলেও থেমে থাকেনি। এরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আদিবাসী কল্যাণের ছদ্মবেশে সমাজে প্রোথিত হয়েছে।
বর্তমানে বাংলায় আরএসএস পরিচালিত ৩৩৬টি বিদ্যালয় চলছে, যেখানে ৮৮,০০০-রও বেশি ছাত্রছাত্রী পড়ে। দক্ষিণবঙ্গে এর পরিচালক সংগঠনের নাম বিবেকানন্দ বিদ্যা পরিষদ, উত্তরবঙ্গে বিদ্যা ভারতী উত্তর বঙ্গ। ২০১১ সালে আরএসএস অনুপ্রাণিত সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রকল্প ছিল ২০০-র কম, ২০২০ সালে সেটা দাঁড়িয়েছে ৪৫০-এ, আর ২০২৪-এর হিসেবে ৬০০ ছাড়িয়েছে।

মমতার শাসনে সংঘের সুযোগ

এই বিস্তারের একটি বিশেষ প্রেক্ষাপট রয়েছে। বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনে সাম্প্রদায়িকতা ছিল একটি ট্যাবু, আর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধ আরএসএসকে রুখে রেখেছিল। কিন্তু মমতার আমলে সেই আদর্শগত প্রতিরোধ শিথিল হয়। মমতার সরকারের তথাকথিত সংখ্যালঘু-তোষণ নীতি আরএসএসকে হিন্দু ভোটারদের মধ্যে বিক্ষোভ সংগঠিত করার সুযোগ দিয়েছে।
আরএসএস কার্যকর্তাদের কথায়, ১৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী তরুণরা দলে দলে সংঘে যোগ দিচ্ছে, কারণ তারা মনে করছে মমতা সরকারের নীতিতে তাদের “অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা” বিপন্ন।

২০২৬-এর ভোটে নীরব সক্রিয়তা

আরএসএস নিজেই স্বীকার করেছে যে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তারা সক্রিয় ভূমিকা নিতে চায়। এর আগে মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা এবং দিল্লিতে সংঘের নেটওয়ার্ক যেভাবে বিজেপিকে সাহায্য করেছে, বাংলায় তেমনটাই পরিকল্পনা।
২০১৪ সালের পর বিজেপি বুঝেছিল তার জনপ্রিয় সমর্থন আছে কিন্তু সেই সমর্থনকে ভোটে রূপান্তরিত করার সাংগঠনিক শক্তি নেই। সেই ঘাটতি পূরণ করেছে আরএসএস — রাজ্য থেকে তৃণমূলস্তর পর্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ সংগঠকদের পাঠিয়ে।
এই “নীরব সক্রিয়তা”র কৌশলটি বহুস্তরীয়। প্রথমত, শাখার মাধ্যমে প্রতিদিন সাংগঠনিক সংহতি বজায় রাখা এবং ভোটারদের কাছে পৌঁছানো। দ্বিতীয়ত, ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তনের বিষয়টিকে — বিশেষত সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে হিন্দু জনসংখ্যা হ্রাসের দাবিকে — রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরে হিন্দু ঐক্যের নামে ভোট সংহত করার চেষ্টা। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সেবাকাজের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া আস্থার সম্পর্ককে ভোটের মৌসুমে কাজে লাগানো।

সীমাবদ্ধতা ও প্রতিবন্ধক

তবে এই কৌশলের বিরুদ্ধে বাধাও কম নয়। গবেষকরা দেখাচ্ছেন যে রাজনৈতিক হিন্দুত্ব এবং সাংস্কৃতিক হিন্দুত্বের মধ্যে একটি বিভাজন আছে। বাংলায় বিজেপির নির্বাচনী পারফরম্যান্স বারবার হোঁচট খেয়েছে, কিন্তু আরএসএস ও তার অঙ্গসংগঠনগুলি তাদের শাখা ও সামাজিক কাজের মাধ্যমে বিস্তার অব্যাহত রেখেছে। তৃণমূলের কল্যাণমুখী রাজনীতি, বাঙালি পরিচিতির রাজনীতি, এবং আরএসএসকে বাইরের সংগঠন হিসেবে দেখার প্রবণতা — এই তিনটি বিষয় সংঘের বিস্তারকে সরাসরি ভোটে রূপান্তর করার পথে বড় প্রতিবন্ধক।
একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কোনো অঞ্চলে আরএসএস অনুপ্রাণিত সংগঠনের উপস্থিতি মানেই সেখানে বিজেপির ভোট নিশ্চিত নয়। মানুষ নানা কারণে এই সংগঠনগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়, সকলকে সংঘের আদর্শের অনুগামী ভাবা যায় না।

উপসংহার

পশ্চিমবঙ্গে আরএসএসের বিস্তার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প, যার শিকড় বাংলার সমাজের মধ্যে ক্রমশ গভীর হচ্ছে। ২০২৬-এর নির্বাচনে এই সাংগঠনিক কাঠামো বিজেপির পক্ষে একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে — বিশেষত সীমান্তবর্তী ও উপজাতি-অধ্যুষিত অঞ্চলে। কিন্তু বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিজস্বতা, মমতার জনকল্যাণমূলক প্রশাসনিক বার্তা, এবং বিজেপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল — এই তিনটি চ্যালেঞ্জ সংঘের এই নেটওয়ার্ককে বিধানসভা আসনে পরিণত করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে কিনা, সেটাই এই ভোটের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।​​​​​​​​​​​​​​​​