Home খবর ইসলামাবাদে ট্রাম্প: যুদ্ধ থামানোর শেষ চালটা কি পাকিস্তানের হাতে?

ইসলামাবাদে ট্রাম্প: যুদ্ধ থামানোর শেষ চালটা কি পাকিস্তানের হাতে?

0 comments 2 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ইরান-আমেরিকা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২২ এপ্রিল। দ্বিতীয় দফা আলোচনার আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের মুখে পাকিস্তানের প্রশংসা। কূটনীতির নতুন কেন্দ্র হিসেবে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে ইসলামাবাদ।

এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় শহরটির নাম ইসলামাবাদ। একদিকে আমেরিকা, অন্যদিকে ইরান — দুই চিরবৈরী শক্তির মাঝে দাঁড়িয়ে পাকিস্তান যে মধ্যস্থতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তাকে এই শতাব্দীর অন্যতম সাহসী কূটনৈতিক উদ্যোগ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। সেই উদ্যোগের স্বীকৃতি এসেছে স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাফ জানিয়েছেন, ইসলামাবাদে চুক্তি সই হলে তিনি নিজে সেখানে যেতে প্রস্তুত।

সংঘাতের সূচনা

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইজরায়েল ও আমেরিকা যৌথভাবে ইরানে বিমান হামলা শুরু করে। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতাসহ বহু শীর্ষ কর্মকর্তা প্রাণ হারান। পাল্টা জবাবে ইরান ইজরায়েল, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং মার্কিন-মিত্র দেশগুলিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। পাশাপাশি বন্ধ করে দেওয়া হয় হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় কুড়ি শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র ধস নামে এবং এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি সংকট।

এই উত্তাল পরিস্থিতিতে মধ্যস্থতার হাত বাড়িয়ে দেয় পাকিস্তান। ২৩ মার্চ ইসলামাবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা আয়োজনের প্রস্তাব দেয়। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি ট্রাম্প, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি এবং মার্কিন বিশেষ দূত উইটকফকে এই আহ্বান জানান। প্রস্তাবটি ছিল সাহসী, প্রায় দুঃসাহসিক — কারণ সেই মুহূর্তে ওয়াশিংটন থেকে তেহরান, কোনো পক্ষই আলোচনার টেবিলে বসার মেজাজে ছিল না।

একুশ ঘণ্টার আলোচনা

অবশেষে ৮ এপ্রিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়। এরপরই শুরু হয় আসল পরীক্ষা। ১১ ও ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে বসে ঐতিহাসিক বৈঠক। আমেরিকার প্রতিনিধিদলে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার। ইরানের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। স্বাগতিক পাকিস্তানের পক্ষে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই প্রথমবারের মতো ওয়াশিংটন ও তেহরান এত উচ্চ পর্যায়ে সরাসরি মুখোমুখি হল। তিনটি দফায় — প্রথমটি পরোক্ষ, পরের দুটি সরাসরি, একটানা একুশ ঘণ্টা ধরে চলে আলোচনা। তবু শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

মূল অন্তরায় ছিল দুটি বিষয় — ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ। ভ্যান্স স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, ইরানকে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। কিন্তু তেহরান সেই শর্ত মেনে নিতে অস্বীকার করে। উভয় দেশের প্রতিনিধিরা ফিরে গেলেন নিজ নিজ দেশে, ইসলামাবাদ আবার শান্ত হয়ে এল — তবে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত বার্তা

আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরেও কূটনীতি থামেনি। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্প দিলেন এক অপ্রত্যাশিত বিবৃতি।

এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি পাকিস্তানে যেতে পারি। পাকিস্তান অসাধারণ কাজ করছে। ইসলামাবাদে চুক্তি সই হলে আমি হয়তো সেখানে যাব।” একই সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের উচ্চ প্রশংসা করে বলেন, তিনি “দারুণ কাজ করছেন।”

শুধু তাই নয়, ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন যুদ্ধ “প্রায় শেষের পথে।” নিউ ইয়র্ক পোস্টকে জানান, দ্বিতীয় দফা আলোচনা “আগামী দুই দিনের মধ্যেই” হতে পারে এবং সেটিও ইসলামাবাদে।

একজন ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য পাকিস্তান সফরের এই ইঙ্গিত নিছক শিষ্টাচারের ভাষা নয়। কূটনৈতিক মহলে এটিকে দেখা হচ্ছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি সংকেত হিসেবে।

মধ্যস্থতার গভীরতা কতটুকু

পাকিস্তানকে অনেকে ‘বার্তাবাহক’ বলে ছোট করে দেখছেন। কিন্তু বাস্তব চিত্র সেই ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও গভীর। কায়েদ-ই-আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইশতিয়াক আহমাদ এই সরলীকরণ খারিজ করে দিয়ে বলেন, বার্তাবাহক কেবল এক পক্ষের কথা অন্য পক্ষের কাছে পৌঁছে দেয়। কিন্তু পাকিস্তান এই আলোচনায় সময় ও কার্যসূচি নির্ধারণ, আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং প্রস্তাবের কাঠামো তৈরিতেও সক্রিয় ও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট নিজেও স্বীকার করেছেন, এই আলোচনায় পাকিস্তান ছিল “একমাত্র মধ্যস্থতাকারী।” বাক্যটি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর কূটনৈতিক তাৎপর্য অসাধারণ।

সময় কম, চাপ বেশি

আগামী দিনগুলো যে কঠিন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২২ এপ্রিল। ইতিমধ্যে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের সব বন্দর অবরোধ করে রেখেছে। তেহরানের অবস্থান হল, লেবাননে হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ না হলে কোনো চুক্তি সম্ভব নয়। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের পাল্টা অবস্থান — লেবানন প্রশ্ন এই আলোচনার আওতায় পড়ে না।

এই জটিল ও স্পর্শকাতর সমীকরণের মাঝে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, যুদ্ধবিরতি আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়া “অত্যন্ত সম্ভাব্য।” ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শরিফ দ্বিতীয় দফা বৈঠকের মাটি তৈরি করতে সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।

পরিপ্রেক্ষিত

ইসলামাবাদ আজ নিছক একটি দেশের রাজধানী নয় — এটি একটি সম্ভাবনার প্রতীক। দুটি পারমাণবিক-সক্ষম মহাশক্তির মধ্যে যুদ্ধ ও শান্তির ভবিষ্যৎ এই মুহূর্তে এই শহরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ট্রাম্প যদি সত্যিই ইসলামাবাদে পা রাখেন, তা হবে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়, হবে একটি যুগসন্ধির মুহূর্ত, ইতিহাসের পাতায় যার আলাদা একটি অধ্যায় লেখা হয়ে যাবে। সেই মুহূর্তের অপেক্ষায় এখন গোটা বিশ্ব।

 

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles