Table of Contents
ভূমিকা
ইরানের সঙ্গে চরম উত্তেজনার মাঝেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর স্বভাবসুলভ আত্মবিশ্বাস ও আক্রমণাত্মক মেজাজ বজায় রেখেছেন। সোমবার (৬ এপ্রিল) তিনি স্বীকার করেন যে পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত নাজুক। ইরানকে একটি চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন — ওয়াশিংটন সময় মঙ্গলবার রাত ৮টার মধ্যে ইরানকে একটি চুক্তিতে আসতে হবে। একদিকে আলোচনার দরজা খোলা রাখার নাটক, অন্যদিকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একটি পুরো দেশকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি — সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়া এখন এক মহাসংকটের মুখে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা নতুন নয়, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন মাত্রা নিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হুমকি দিচ্ছে, পেন্টাগন ইতিমধ্যে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো ক্রমশ সরু হয়ে আসছে। পারমাণবিক অস্ত্র, তেল সরবরাহ এবং আঞ্চলিক আধিপত্য — এই তিনটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে টানাপোড়েন চলছে, তা শুধু মার্কিন-ইরান দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়। এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে, ন্যাটো জোটে এবং ইজরায়েলসহ গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে।
৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. চরম সময়সীমা ও ধ্বংসের হুমকি ট্রাম্প ইরানকে মঙ্গলবার রাত ৮টার মধ্যে চুক্তিতে আসার চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। চুক্তি না হলে পরিণাম হবে ভয়াবহ — সামরিক বাহিনী এমন এক পরিকল্পনা তৈরি রেখেছে যা কার্যকর হলে মঙ্গলবার মধ্যরাতের মধ্যেই ইরানের প্রতিটি সেতু এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। ট্রাম্পের ভাষায়, “পুরো দেশ অচল হয়ে যাবে মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে।” বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে তিনি দাবি করেন, ইরানি জনগণ স্বাধীনতার জন্য এই কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত।
২. কূটনৈতিক অস্পষ্টতা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এই বিশাল হুমকির মাঝেও ট্রাম্প চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি — আলোচনার দায়িত্ব তিনি ছেড়ে দিয়েছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের ওপর। ইরানের উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে কোনো কথা না বলে তিনি উল্টো অভিযোগ করেছেন যে ইরানিরা নাকি ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারে না। অথচ বাস্তবে বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতায় ইরান নিয়মিত যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
৩. ট্রাম্পের তিনটি মূল অগ্রাধিকার ট্রাম্পের অবস্থান তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালী — যেকোনো চুক্তিতে সেখানে তেলের জাহাজ চলাচলের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকতে হবে; ইরান ‘টোল’ আদায়ের চেষ্টা করলে আমেরিকাও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে। দ্বিতীয়ত, ইজরায়েল সংযোগ — সংকটকালে তিনি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শ করছেন। তৃতীয়ত, পারমাণবিক অস্ত্র — ট্রাম্পের মতে, এই যুদ্ধের একমাত্র লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা।
৪. পেন্টাগনের আক্রমণাত্মক অবস্থান মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, সোমবার ইরানজুড়ে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিমান হামলা চালানো হয়েছে। বিধ্বস্ত হওয়া মার্কিন যুদ্ধবিমানের দুই পাইলটকে উদ্ধারের ঘটনাকে তিনি ধর্মীয় উপমায় ব্যাখ্যা করেছেন — পাইলটদের উদ্ধারকে যিশুর পুনরুত্থানের সঙ্গে তুলনা করে একে আমেরিকার জন্য এক ঐশ্বরিক বিজয় হিসেবে দাবি করেছেন।
৫. অভ্যন্তরীণ চাপ ও মিত্রদের সমালোচনা যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৩৮% বেড়ে গেছে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প বিরোধীদের ‘বোকা’ বলে আখ্যা দিয়ে নিজের যুদ্ধংদেহী অবস্থান অটুট রেখেছেন। পুরনো মিত্রদেরও তিনি ছাড় দেননি — NATO-কে ‘কাগুজে বাঘ’ বলে উপহাস করে দাবি করেছেন যে পুতিন ন্যাটোকে নয়, বরং আমেরিকাকেই ভয় পায়। সংবাদ সম্মেলনের শেষে তিনি অত্যন্ত খামখেয়ালিভাবে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রসঙ্গ টেনে আনেন এবং ডেনমার্ক বিক্রিতে রাজি না হওয়ায় বিরক্তি প্রকাশ করেন।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
ট্রাম্প এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন যেখান থেকে ফেরার পথ প্রায় বন্ধ। বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে জ্বালানি সংকট, মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং কূটনৈতিক দিকনির্দেশনার অভাব — সব মিলিয়ে এই সংকট কেবল মার্কিন-ইরান দ্বিপক্ষীয় বিবাদ নয়। হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হলে বিশ্বের তেল সরবরাহ বিপর্যস্ত হবে, যার ঢেউ এসে লাগবে বাংলাদেশসহ গোটা এশিয়ায়। এই মুহূর্তে কূটনীতি ও সামরিক শক্তির মাঝে যে সরু দড়ির উপর দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব, তা যেকোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে যেতে পারে।