বাংলাস্ফিয়ার: আদিত্য ধর পরিচালিত ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ মুক্তি পেয়েছে গত উনিশে মার্চ এবং রিলিজের পর থেকেই স্পষ্ট — এটি ভারতীয় অ্যাক্শন থ্রিলারের চিরপরিচিত ছাঁচ ভাঙতে এসেছে। ভারতীয় সিনেমা দীর্ঘদিন ধরে আন্ডারওয়ার্ল্ডকে একটা স্টাইলাইজড গ্ল্যামারে মুড়ে পরিবেশন করে এসেছে – ডন মানেই ক্যারিশমা, ক্ষমতা আর এক ধরনের স্টাইলাইজড দাপট। কিন্তু এই ছবি সেই পুরনো ফর্মুলাকে নির্মমভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
এই ছবিতে ‘বড়ে সাহাব’—যার ভেতরে স্পষ্টভাবে দাউদ ইব্রাহিমের ছায়া—তিনি কোনো গ্ল্যামারাইজড কিংবদন্তি নন; বরং তিনি এক ঠান্ডা, হিসেবি, প্রায় অদৃশ্য শক্তি, যার উপস্থিতি ভয় তৈরি করে, ক্যাওয়াস নয়। ড্যানিশ ইকবাল এই চরিত্রটিকে অভিনয় করেননি, বরং তিনি যেন এই অন্ধকারে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন—তাঁর সংলাপ কম, চোখের ভাষা তীক্ষ্ণ, আর তাঁর নীরবতা সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এখানেই ছবির প্রথম বড় সাফল্য, এটি অপরাধকে আকর্ষণীয় করে না, বরং তার ভেতরের শূন্যতা ও নৃশংসতাকে সামনে আনে।
আদিত্য ধরের ডিরেকশনে ছবিটি কেবল একটি রিভেঞ্জ স্টোরি হয়ে থাকে না। এটি ধীরে ধীরে এক জটিল পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপে পরিণত হয়, যেখানে রাষ্ট্র, ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি এবং আন্ডারওয়ার্ল্ড — তিনটিই একে অপরের ছায়া হয়ে ওঠে। এখানে কেউ পুরোপুরি হিরো নয়, কেউ সম্পূর্ণ ভিলেনও নয়। সবাই গ্রে জোনে, আর এই গ্রেনেসের মধ্যেই ছবির আসল বক্তব্য লুকিয়ে। অডিয়েন্সকে কোনো সহজ উত্তর দেওয়া হয় না, বরং তাকে বাধ্য করা হয় অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে — ক্ষমতা কাদের হাতে, আর সেই ক্ষমতার প্রকৃত ব্যবহার কী? এই অ্যাপ্রোচই ছবিটিকে মেইনস্ট্রিম অ্যাকশন থ্রিলার থেকে আলাদা করে তুলেছে।
ছবির অ্যাকশন সিকোয়েন্সগুলোও সেই একই ফিলোসফি মেনে চলে। এখানে গানফাইট মানে কেবল ভিজ্যুয়াল স্পেক্টাকল নয়, বরং প্রতিটি মুহূর্তের একটা ডেফিনিট কনসিকোয়েন্স আছে, প্রতিটি কনফ্রন্টেশন যেন একেকটি স্ট্র্যাটেজিক মুভ, যেখানে ইমোশনের জায়গায় স্থান নিয়েছে হিসেবি প্ল্যানিং। ক্লাইম্যাক্সও কনভেনশনাল অর্থে বড় বা আড়ম্বরপূর্ণ নয়, বরং সাইকোলজিক্যালি ধাক্কা দেয় — এটি চোখের চেয়ে মস্তিষ্কে বেশি আঘাত করে। এই জায়গাতেই ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ তার সবচেয়ে বড় রিস্ক নিয়েছে, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফলভাবে উতরে গেছে।
তবে ছবিটি নিখুঁত নয়। সেকেন্ড হাফে ন্যারেটিভ কিছুটা অতিরিক্ত স্ট্রেচড হয়ে পড়ে। কিছু সাবপ্লট রেজোলিউশনের আগেই থেমে যায় এবং পলিটিক্যাল লেয়ারগুলোর জটিলতা সাধারণ দর্শকের কাছে কিছুটা দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। কিন্তু এই দুর্বলতাগুলোও এক অর্থে ছবির উচ্চাকাঙ্ক্ষারই ফল—এটি সহজ হতে চায়নি, বরং গভীর হতে চেয়েছে।
সামগ্রিকভাবে ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ কোনো ইজি এন্টারটেইনমেন্ট প্যাকেজ নয়। এটি এক ধরনের সিনেম্যাটিক ইনভেস্টিগেশন, যেখানে অপরাধ, রাষ্ট্র এবং মানুষের ভেতরের অন্ধকার একসূত্রে বাঁধা পড়েছে। এই ছবি আপনাকে তৃপ্তি দেবে না, বরং অস্বস্তি দেবে—আর সেই অস্বস্তিই তার সাফল্য। ড্যানিশ ইকবালের ‘বড়ে সাহাব’ দীর্ঘদিন মনে থাকবে, কারণ তিনি ভয় দেখান না—তিনি আপনাকে অনুভব করান, ভয় আসলে কেমন দেখতে হয়।
রেটিং: ৪/৫ — এই ছবি দেখতে গেলে শুধু চোখ নয়, মস্তিষ্ক নিয়েও বসতে হবে।