‘জ্ঞানেশ কুমার চোর’, তোপ মমতার; ইন্ডিয়া বৈঠক থেকে দেশজুড়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ আন্দোলনের ডাক

যা জানা জরুরি
- নির্বাচন সংক্রান্ত সমস্যাগুলি তুলে ধরতে বিরোধী নেতারা ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাইবেন বলে জানালেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে।
- বুধবার নয়াদিল্লিতে বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার বৈঠক থেকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি দেশজুড়ে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
- তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি ফের তোলেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নির্বাচন সংক্রান্ত সমস্যাগুলি তুলে ধরতে বিরোধী নেতারা ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাইবেন বলে জানালেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। বুধবার নয়াদিল্লিতে বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার বৈঠক থেকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি দেশজুড়ে আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি ফের তোলেন। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, “ওরা বাংলায় লুট করেছে। আমরা নির্বাচন কমিশনে গিয়েছি, সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছি। এখন সব প্রকাশ্যে এসে গিয়েছে। জ্ঞানেশ কুমার চোর। উনি ইভিএম পুড়িয়েছেন। ওঁকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে। আসুন, গণতন্ত্রকে বাঁচাই। আমাদের জোরালো দাবি, জ্ঞানেশ কুমারকে সরানো না হলে এই আন্দোলন মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে। ইভিএম পোড়ানো হল কেন?”
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, “সব দলই একমত যে নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ ও জ্ঞানেশ ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর আঘাত হেনেছেন। যাঁরা ভারতের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছেন, তাঁদের শাস্তি নিশ্চিত করব আমরা।”
আন্দোলনের কর্মসূচি ব্যাখ্যা করে খাড়গে বলেন, “দেশের মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সকলের জন্য আমরা একটি কর্মসূচি তৈরি করেছি। ২ থেকে ৮ অক্টোবর দেশের সব জেলায় ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ মিছিল করব। ৬ অক্টোবর বিরোধী দলের সব সাংসদ দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দফতর পর্যন্ত মিছিল করবেন। দেশকে বাঁচানোয় বিশ্বাস করলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সংসদের উভয় কক্ষের সব সাংসদ এতে যোগ দেবেন।”
খাড়গে বলেন, ভারতের গণতন্ত্রে দেশের মানুষই যাতে চূড়ান্ত ও প্রশ্নাতীত কর্তৃত্বের অধিকারী থাকেন, তা নিশ্চিত করাই বিরোধীদের কাজ। জোটের শরিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁদের “ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালটে ভোটগ্রহণের” দাবি তোলা উচিত।
এর কিছুক্ষণ আগে, ২০টি শরিক দলের উপস্থিতিতে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিরোধীদের ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন খাড়গে। তিনি বলেন, “স্বচ্ছতার জায়গা গোপনীয়তাকে নিতে দেব না আমরা। আমাদের প্রজাতন্ত্রের মৌলিক নীতি—এক ব্যক্তি, এক ভোট, এক মূল্য—দুর্বল হতে দেব না।”
খাড়গের তুলে ধরা দাবিগুলির মধ্যে ছিল, ভবিষ্যতের নির্বাচনে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর আগের ভোটার তালিকা ব্যবহার করা। তিনি বলেন, “ভোটার তালিকার প্রতিটি সংশোধন প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা চাই। এর মধ্যে থাকতে হবে বিধানসভা কেন্দ্র ও বুথভিত্তিক নাম সংযোজন, বিয়োজন এবং সংশোধনের তথ্য।”
তিনি আরও বলেন, “দ্বিতীয়ত, কোনও বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আগে যথাযথ নোটিস, কারণ জানানো এবং কার্যকর আপিলের ব্যবস্থা থাকতে হবে।”
এসআইআর এবং অন্যান্য অনিয়ম সংক্রান্ত সব মামলার শুনানি সুপ্রিম কোর্টে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দাবিও জানান খাড়গে।
তাঁর কথায়, “তৃতীয়ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, প্রয়োজনীয় নথির ঘাটতি বা সচেতনতার অভাবে কোনও যোগ্য ভোটার যাতে বাদ না পড়েন, তার সুরক্ষা চাই। চতুর্থত, ইভিএমের পরিবর্তে ব্যালটে ভোটগ্রহণ করতে হবে।”
“প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং এমন একটি নির্বাচন কমিশন চাই, যার প্রতি রাজনৈতিক পরিসরের সব পক্ষের আস্থা থাকবে,” বলেন খাড়্গে।
তৃণমূল সূত্রের খবর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বৈঠকে শরিকদের বলেছেন, গোটা এসআইআর প্রক্রিয়া “চরম অব্যবস্থার মধ্যে” সম্পন্ন হয়েছে। ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং বিজেপির “স্বৈরাচার”-এর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “আমি এখন বাড়ি থেকে বেরোতে পারি না।”
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে, দলের প্রাক্তন সভাপতি সনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী, এআইসিসি-র সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ ও কে সি বেণুগোপাল, তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সমাজবাদী পার্টি, সিপিআই, সিপিআই(এম), এনসিপি (শরদ পওয়ার), শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে)-সহ বিভিন্ন দলের নেতারা।
কংগ্রেসের বক্তব্য, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য মোদী সরকারের কথিত “ভোট চুরির ছক”-সহ সংবিধানের উপর “বারবার আক্রমণ”-এর বিরুদ্ধে বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ।
জয়রাম রমেশ এক্সে লেখেন, “ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক সবে শুরু হয়েছে। অংশগ্রহণকারী দলগুলি হল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস, এনসিপি (শরদ পওয়ার), শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে), আরজেডি, সিপিআই(এম), সিপিআই, জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশনাল কনফারেন্স, জম্মু ও কাশ্মীর পিডিপি, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা, সিপিআই-এমএল, ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ, কেরল কংগ্রেস (এম), এমডিএমকে, ভিসিকে, আরএসপি, কেরল কংগ্রেস (জে) এবং অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লক।”
তিনি আরও লেখেন, “মোদী সরকারের বারবার আক্রমণের হাত থেকে ভারতের সংবিধানকে রক্ষা করতে এই দলগুলি এবং অন্য বিরোধী দলগুলি ঐক্যবদ্ধ। এই আক্রমণের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হল ক্ষমতায় টিকে থাকতে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে ভোট চুরির ষড়যন্ত্র।”
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের অভিযোগ এবং এই প্রক্রিয়ায় খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিরোধী দলগুলি তাঁর পদত্যাগের দাবিতে সরব।
দশ মাসে এসআইআর সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী অন্তত ১৪ বার নথিভুক্ত আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, তাঁদের অজ্ঞাতে অথবা তাঁদের সুপারিশ ছাড়াই ওই সিদ্ধান্ত ও নির্দেশগুলি জারি করা হয়েছিল।
এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে নিজেদের দুই কমিশনারের তোলা আপত্তিতে চাপের মুখে পড়ে নির্বাচন কমিশন। বুধবার যেসব রাজ্যে এসআইআর শেষ হয়েছে, সেখানে কমিশনের ইসিআইনেট অ্যাপ্লিকেশন পোর্টালে ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্তির বিধিবদ্ধ আবেদনপত্র, ফর্ম ৬ থেকে এসআইআর সংক্রান্ত সংযোজিত ঘোষণাটি সরিয়ে দেওয়া হয়।
এর আগে ইন্ডিয়া জোটের বৈঠক হয়েছিল চলতি বছরের জুনে। বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার করে সেই বৈঠকে জোটের সদস্যরা নিট-সিবিএসই বিতর্কে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সর্বসম্মতভাবে। জুনের সেই বৈঠকের পর দেশের রাজনীতিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে রয়েছে প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তর এবং অন্যান্য জায়গায় বিক্ষোভ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



