খবর

সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের দশ বছর: বদলেছে জঙ্গি তৎপরতার ভূগোল, পাল্টেছে ভারতের প্রত্যাঘাতের কৌশল

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: দশ বছর আগে, ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে অভিযান চালিয়েছিল ভারতীয় সেনা।
  • সেনাবাহিনী সেই অভিযানকে নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে তাদের প্রথম সমন্বিত ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বলে বর্ণনা করেছিল।
  • ১৮ সেপ্টেম্বর উরির কাছে সেনাবাহিনীর ব্রিগেড সদর দফতরে জঙ্গি হামলার জবাবেই ওই অভিযান চালানো হয়।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: দশ বছর আগে, ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে অভিযান চালিয়েছিল ভারতীয় সেনা। সেনাবাহিনী সেই অভিযানকে নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে তাদের প্রথম সমন্বিত ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বলে বর্ণনা করেছিল। ১৮ সেপ্টেম্বর উরির কাছে সেনাবাহিনীর ব্রিগেড সদর দফতরে জঙ্গি হামলার জবাবেই ওই অভিযান চালানো হয়। উরির হামলায় ১৯ জন সেনা নিহত হয়েছিলেন।

সেনাবাহিনীর প্যারা স্পেশাল ফোর্সেসের দলগুলি আকাশপথে নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে পির পাঞ্জাল পর্বতমালার উত্তর ও দক্ষিণে সাতটি জঙ্গি লঞ্চপ্যাডে আঘাত হানে। কামানের গোলাবর্ষণের আড়ালে চালানো ওই অভিযানে আনুমানিক ৩৫ থেকে ৫০ জন জঙ্গি নিহত হয়। সেনাদের সঙ্গে ছিল অস্ত্রশস্ত্র, রকেট লঞ্চার, অগ্নিনিক্ষেপক ও গ্রেনেড। এর আগেও ভারতীয় সেনা সীমান্ত পেরিয়ে অভিযান চালিয়েছিল। তবে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ চালানোর কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করার ঘটনা সেটিই প্রথম।

তার দশ বছর পরে জঙ্গিদমন অভিযান, সীমান্ত পেরিয়ে প্রত্যাঘাত এবং জম্মু ও কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি—সব ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে বলে প্রতিরক্ষা আধিকারিকেরা ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে জানিয়েছেন।

এক আধিকারিক বলেন, “উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের তুলনায় উপত্যকা এখন অনেকটাই শান্ত। কিন্তু বিপদ এখন আরও ছড়িয়ে রয়েছে, তা শনাক্ত করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে এবং ক্রমশ জম্মু অঞ্চলের দুর্গম ভূখণ্ডে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।” সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ৩২২টি জঙ্গি তৎপরতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল। নিহত হয়েছিল ১৫০ জন জঙ্গি এবং ৮২ জন নিরাপত্তাকর্মী। তুলনায় ২০২৫ সালে সন্ত্রাস-সম্পর্কিত ঘটনার সংখ্যা ছিল ১২; নিহত হন ১৬ জন নিরাপত্তাকর্মী।

ভৌগোলিক অবস্থানের নিরিখেও পরিবর্তন স্পষ্ট। সংঘাত পর্যবেক্ষণ ও সংকটের মানচিত্র তৈরির কাজে যুক্ত স্বাধীন, অলাভজনক সংস্থা এসিএলইডি—আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা—জানিয়েছে, ২০২৫ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে জঙ্গিদের হিংসাত্মক তৎপরতার ৬০ শতাংশেরও বেশি ঘটেছে জম্মু বিভাগে। ২০১৮ সালে এই হার ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। সংস্থাটির মতে, এর আংশিক কারণ জম্মুর বিভিন্ন এলাকার দুর্গম অরণ্য ও পার্বত্য ভূপ্রকৃতি এবং ২০২০–২১ সালের ভারত-চিন সীমান্ত সংকটের পরে সেনা মোতায়েনের বিন্যাসে পরিবর্তন।

আর এক আধিকারিক বলেন, “২০১৬ সালে শহর ও আধা-শহরাঞ্চলকেন্দ্রিক জঙ্গি তৎপরতা, পাথর ছোড়ার ঘটনা এবং স্থানীয়দের জঙ্গি সংগঠনে নিয়োগ ছিল প্রধান বিষয়। এখন ছোট ছোট দল জঙ্গল ও পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে চলাফেরা করছে। অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকলেও তাদের উপস্থিতি ধরা পড়ছে না।” তাঁর মতে, এই পরিবর্তনের অন্যতম কারণ ২০১৯ সালে জম্মু ও কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ এবং তার সঙ্গে কাশ্মীরে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন। তিনি বলেন, “পাশাপাশি ব্যাপক টহল ও নজরদারির মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে জঙ্গিদের যোগাযোগের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ায় তারা গোপন ডেরা অথবা পাহাড়ের উঁচু এলাকাগুলিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।”

জঙ্গিদমনের কৌশলেও এর প্রভাব পড়েছে। আগে সন্দেহভাজন এলাকায় বিপুলসংখ্যক সেনা নিয়ে ঘেরাও ও তল্লাশি অভিযান চালানো হত। এখন সেনাবাহিনীর অভিযান অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। নির্দিষ্ট এলাকা লক্ষ্য করে চালানো এসব অভিযানে তুলনায় কম সেনা ব্যবহার করা হচ্ছে, বাড়ছে প্রযুক্তির প্রয়োগ। এক আধিকারিক জানান, আগে মূল ভরসা ছিল মানবসূত্র থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য এবং জঙ্গিদের পারস্পরিক যোগাযোগে ব্যবহৃত রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সির উপর নজর রাখা। এখন বিপুলসংখ্যক চালকবিহীন আকাশযান বা ইউএভি যুক্ত হওয়ায় সেই ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট এলাকায় কাজ করেছেন এমন এক আধিকারিক বলেন, “একই সঙ্গে উপগ্রহচিত্রও এখন অনেক বেশি পাওয়া যাচ্ছে।” তবে তাঁর সতর্কবার্তা, মানবসূত্র গড়ে তুলে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কাজ পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না। “পির পাঞ্জালের দক্ষিণে পরপর কয়েকটি হামলার পরে” সেই প্রয়োজন অনুভূত হয়েছিল। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির বিভিন্ন স্তরেও সমন্বয় ও তথ্য বিনিময় বেড়েছে। ফলে তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য আরও দ্রুত পৌঁছচ্ছে।

পাশাপাশি এলাকার উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে দিনরাত তৎপরতা চলছে। সেনা মোতায়েনের বিন্যাস বদলে জঙ্গিদমনের নিরাপত্তাবলয়ও আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। জম্মু ও কাশ্মীরে জঙ্গিদমনের দায়িত্বের বিরাট অংশ ঐতিহাসিকভাবেই বহন করে এসেছে সেনাবাহিনী, বিশেষত রাষ্ট্রীয় রাইফেলস।

পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলা এবং অপারেশন সিঁদুরের পরে নজরদারি ড্রোনের ব্যবহার ও শত্রুপক্ষের ড্রোন মোকাবিলার সক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলিতে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী অভিযান ঘাঁটি।

সেনাবাহিনীর নর্দার্ন কমান্ডের প্রাক্তন প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডি এস হুডা (অবসরপ্রাপ্ত) ব্যাখ্যা করেছেন, কীভাবে ২০১৬ সালের স্থলভিত্তিক সার্জিক্যাল স্ট্রাইক থেকে ২০১৯ সালের বালাকোট বিমান হামলা এবং সেখান থেকে ২০২৫ সালের মে মাসের সমন্বিত অভিযান ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ পৌঁছেছে ভারতের প্রত্যাঘাতের ধরন।

সেনা কমান্ডার হিসেবে ২০১৬ সালের সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের তত্ত্বাবধান করেছিলেন হুডা। সেই অভিযানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেনাদের হাতে উন্নততর সরঞ্জাম আসার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় উন্নতিগুলির একটি ঘটেছে নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পরিকাঠামোয়। তবে তাঁর সতর্কবার্তা, এসব উন্নতির সঙ্গে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বেড়েছে। তিনি বলেন, “অপারেশন সিঁদুরের সময় তা দেখা গিয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য এই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।”

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles