খবর

এসআইআর নিয়ে কমিশনের অন্দরে আপত্তির দুই মুখ, সান্ধু ও জোশী

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লিতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের খসড়া তালিকা প্রকাশের পরে যখন নোটিস পাঠানো শুরু হল, প্রাপকদের মধ্যে ছিলেন নির্বাচন কমিশনার সুখবীর…
  • কিন্তু অচিরেই তা নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের কাজকর্ম ফিরে দেখার উপলক্ষ হয়ে উঠল।
  • জানা গেল, সান্ধু এবং আর এক নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী গত দশ মাস ধরে দেশজুড়ে চলা এসআইআর প্রক্রিয়ার বহু অসংগতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লিতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের খসড়া তালিকা প্রকাশের পরে যখন নোটিস পাঠানো শুরু হল, প্রাপকদের মধ্যে ছিলেন নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধুও। তখন ঘটনাটিকে পরিহাসের মতো মনে হয়েছিল। কিন্তু অচিরেই তা নির্বাচন কমিশনের কাছে নিজেদের কাজকর্ম ফিরে দেখার উপলক্ষ হয়ে উঠল। জানা গেল, সান্ধু এবং আর এক নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী গত দশ মাস ধরে দেশজুড়ে চলা এসআইআর প্রক্রিয়ার বহু অসংগতি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতবিরোধের গুঞ্জন কয়েক মাস ধরেই শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু দুই কমিশনার যে আনুষ্ঠানিকভাবে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন, এমনকি মন্ত্রিপরিষদ সচিবকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে, সেই তথ্য বিস্ময় তৈরি করেছে। কারণ, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ২০২৩ সালের নতুন আইনে এই দু’জনকেই কার্যত বেছে নিয়েছিল সরকার।

দু’জনের নিয়োগের সময়েই বাছাই কমিটির বৈঠকে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিল বিরোধী দল কংগ্রেস। নির্বাচন কমিশনার অনুপচন্দ্র পাণ্ডের অবসর এবং অরুণ গোয়েলের আকস্মিক পদত্যাগের পরে, ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে সান্ধুকে নিয়োগ করা হয়। জ্ঞানেশ এখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। সেই সময়ে বাছাই কমিটির বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিন্নমত জানিয়ে লিখিত নোট দিয়েছিলেন কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরী। পরে জ্ঞানেশ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদে উন্নীত হলে, ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জোশীকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করা হয়। সে বার কমিটির বৈঠকে আপত্তি তুলেছিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।

খবরে প্রকাশ, দুই নির্বাচন কমিশনার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার মধ্যে ছিল ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করার বিষয়টিও। এ বছরের মে মাসে জোশী একটি নিরীক্ষার প্রস্তাব দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সেই নিরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে যে, সংশ্লিষ্ট আইননির্ধারিত কর্তৃপক্ষ ছাড়া ভোটার তথ্যভাণ্ডারে কোনও পরিবর্তন করার প্রবেশাধিকার আর কারও নেই।

আগস্টে সান্ধু লিখিতভাবে জানান, রাজ্যস্তরের নির্বাচনী আধিকারিকেরা অভিযোগ করছেন, ভোটার তালিকা রক্ষণাবেক্ষণের বৈদ্যুতিন ব্যবস্থা ইআরওনেটে তাঁদের ‘যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার’ নেই। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যে প্রবেশাধিকার এবং কাজ করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, তা সীমিত করার কোনও আইনি ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের মহানির্দেশকের নেই।

নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার আবেদনপত্র, অর্থাৎ ৬ নম্বর ফর্ম বদলে দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানান দুই কমিশনার। পরিবর্তিত ফর্মে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আবেদনকারী অথবা তাঁর বাবা-মা কিংবা ঠাকুরদা-ঠাকুরমা বা দাদু-দিদিমার নাম আগের এসআইআরের ভোটার তালিকায় ‘আছে’ কি না।

মে মাসেই তাঁরা সতর্ক করেছিলেন, ভোটার নিবন্ধন বিধি, ১৯৬০ সংশোধন না করে এমন একটি বিধিবদ্ধ আবেদনপত্র বদলানো যায় না। আগস্টে সান্ধু এই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’ বলে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানান। পশ্চিমবঙ্গে বিচারবিভাগীয় ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে যাঁদের নাম ভোটার তালিকায় উঠেছে, তাঁদের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আবেদন করার অনুমতি কমিশনকে কে দিয়েছিল, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। সেখানে তখন ৩৮ লক্ষ আবেদন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

গোয়ার ঘটনাটিও দুই কমিশনার তুলে ধরেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী শুনানির পরে স্থানীয় ভোটার নিবন্ধন আধিকারিকেরা ৯৭ জনকে যোগ্য ভোটার বলে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তবু চূড়ান্ত তালিকায় তাঁদের নাম ওঠেনি। কারণ, কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত সফটওয়্যারে ওই আধিকারিকদের সিদ্ধান্ত নথিভুক্ত করার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে সংশোধন করার সুযোগ চেয়ে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর আট বার চিঠি দিয়েছিল।

তবে প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার-সহ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন: দুই কমিশনার পূর্ণাঙ্গ কমিশনের বৈঠক ডেকে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে এই সমস্যাগুলির নিষ্পত্তির চেষ্টা করলেন না কেন?

নির্বাচন কমিশনারদের চাকরির শর্ত এবং কমিশনের কার্যপরিচালনা সংক্রান্ত ১৯৯১ সালের আইনের বিধান অনুযায়ী, সম্ভব হলে কমিশনের সব সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নিতে হবে। ২০২৩ সালের আইনেও সেই ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়েছে। কিন্তু কোনও বিষয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্য নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতপার্থক্য হলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ভোটের ক্ষেত্রে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার-সহ প্রত্যেক কমিশনারের মতের মূল্য সমান। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কোনও বিশেষ ভেটো বা সিদ্ধান্ত আটকে দেওয়ার ক্ষমতা নেই।

সান্ধু উত্তরাখণ্ডের ১৯৮৮ সালের ব্যাচের অবসরপ্রাপ্ত আইএএস আধিকারিক। জন্ম ১৯৬৩ সালে। অমৃতসরের সরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস, গুরু নানক দেব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর এবং আইনে ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি। ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত উত্তরাখণ্ডের মুখ্যসচিব ছিলেন। ওই রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার প্রাথমিক পরিকল্পনা তৈরির তদারকির কৃতিত্ব দেওয়া হয় তাঁকে।

তিনি জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এবং লুধিয়ানা পুরনিগমের কমিশনার হিসেবেও কাজ করেছেন। লুধিয়ানায় কাজের জন্য রাষ্ট্রপতির পদক পান। নগর সংস্কার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সান্ধু পুর প্রশাসন নিয়ে বহু গবেষণাপত্র লিখেছেন। নির্বাচন কমিশনার হওয়ার ঠিক আগে, ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত অল্প সময়ের জন্য ভারতের লোকপালের সচিবও ছিলেন।

বিবেক জোশীর জন্ম ১৯৬৬ সালের ২১ মে, উত্তরপ্রদেশে। হরিয়ানার ১৯৮৯ সালের ব্যাচের এই আইএএস আধিকারিক আইআইটি রুরকি থেকে যন্ত্রকৌশলে পড়াশোনা করেছেন। নয়াদিল্লির ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ফরেন ট্রেড থেকে আন্তর্জাতিক ব্যবসায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে তাঁর। জেনিভার গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডিও করেছেন।

জোশী কেন্দ্রের আর্থিক পরিষেবা বিভাগের সচিব এবং ভারতের রেজিস্ট্রার জেনারেল ও জনগণনা কমিশনারের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার আগে হরিয়ানার পঞ্চম রাজ্য অর্থ কমিশনের সদস্যসচিব ছিলেন।

৫৮ বছর বয়সে নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হওয়ায় কমিশনে তুলনামূলক কম বয়সে আসা সদস্যদের মধ্যে ছিলেন তিনি। কমিশনে যোগ দেওয়ার আগে স্বেচ্ছাবসর নিয়েছিলেন। বিষয়টিকে কিছুটা ব্যতিক্রমী বলেই মনে করা হয়েছিল।

জোশী নিজেই তাঁর নিয়োগকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলেছিলেন। তাঁর কথায়, কেন্দ্রীয় এই সংস্থায় যাওয়ার আগে অল্প সময়ের জন্য নিজের কর্মরাজ্য হরিয়ানায় ফিরে আসার সুযোগ পাওয়ায় ঘটনাটি ব্যক্তিগতভাবেও তাঁর কাছে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। জোশীর পরিবারের আরও সদস্য আমলাতন্ত্রে রয়েছেন। তাঁর ভাই বিনীত জোশী ১৯৯২ সালের ব্যাচের আইএএস আধিকারিক এবং উচ্চশিক্ষা সচিবের দায়িত্বে আছেন। নির্বাচন কমিশনে বিবেক জোশীর মেয়াদ ২০৩১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

বর্তমান কমিশনারদের জ্যেষ্ঠতার ক্রম অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমার ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে অবসর নিয়ে পদ ছাড়লে জোশী হবেন সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার। সে ক্ষেত্রে তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হতে পারেন, কারণ সান্ধুর অবসর নেওয়ার কথা ২০২৮ সালের জুলাইয়ে। কিন্তু জ্ঞানেশকে যদি ২০২৮ সালের জুলাইয়ের আগেই পদ ছাড়তে হয়, তা হলে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ কমিশনার হবেন সান্ধু। তিনি জোশীর আগে নিযুক্ত হয়েছেন।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ২০২৩ সালের আইন জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় উত্তরাধিকার নিশ্চিত করে না। আগে যে ব্যবস্থা অনেকটাই প্রথার উপর নির্ভর করত, তার পরিবর্তে এই আইন নিয়োগ, কার্যকালের মেয়াদ এবং চাকরির শর্তের একটি বিধিবদ্ধ কাঠামো তৈরি করেছে।

মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ খালি হলে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আপনাআপনি সেই পদে বসবেন—আইনে এমন কোনও ধারা নেই। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার-সহ প্রতিটি নিয়োগের ক্ষেত্রেই নতুন করে নির্ধারিত নিয়োগপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আগে বিদায়ী মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের উত্তরসূরি হিসেবে পরবর্তী জ্যেষ্ঠতম নির্বাচন কমিশনারকে বেছে নেওয়ার যে প্রথা ছিল, নতুন ব্যবস্থায় তার নিশ্চয়তা নেই।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles