আঙুর আছে, ক্রেতা নেই

যা জানা জরুরি
- প্রতিবেদন: বিল বেরিহিলের মাঠে আঙুর ফলেছে ঠিকই।
- ক্যালিফর্নিয়ার এই তৃতীয় প্রজন্মের চাষির ৫০০ একর জমির মধ্যে প্রায় ২০০ একরের ফসলের এখনও কোনও ক্রেতা নেই।
- ফসল তোলার পর আরও ৫০ একর জমির লতা তুলে ফেলার পরিকল্পনা করেছেন তিনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রতিবেদন: বিল বেরিহিলের মাঠে আঙুর ফলেছে ঠিকই। সমস্যা অন্য জায়গায়—সেই আঙুর কিনবে কে?
ক্যালিফর্নিয়ার এই তৃতীয় প্রজন্মের চাষির ৫০০ একর জমির মধ্যে প্রায় ২০০ একরের ফসলের এখনও কোনও ক্রেতা নেই। ফসল তোলার পর আরও ৫০ একর জমির লতা তুলে ফেলার পরিকল্পনা করেছেন তিনি। ৬৮ বছরের বেরিহিলের জন্য সিদ্ধান্তটি শুধু কৃষিকাজের বদল নয়; টানা লোকসানের পরে ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে হিসাব কষা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এর ২২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই ছবি। মাঠের ছবিগুলি অবশ্য ১০ সেপ্টেম্বর তোলা—অর্থাৎ প্রতিবেদন প্রকাশের দিনেই ঘটনাগুলি ঘটেছে, এমন নয়।
একটি খামারের গল্প হলেও সংকটটি বৃহত্তর বাজারের সঙ্গেও মিলে যায়। সিলিকন ভ্যালি ব্যাঙ্কের ২০২৬ সালের শিল্প-প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০২৫ সালে আমেরিকায় ওয়াইনের বিক্রির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ৩২ কোটি ৯২ লক্ষ কেস; ২০২৪ সালে তা ছিল প্রায় ৩৩ কোটি ৫৯ লক্ষ। এক কেসে নয় লিটার ওয়াইন ধরা হয়েছে। রাজস্বের হিসাবও কমেছে। এগুলি শিল্প-প্রতিবেদনের বাজার-অনুমান, সরকারি জনগণনার তথ্য নয়; সেপ্টেম্বরের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনের পটভূমি হিসেবে এগুলি প্রাসঙ্গিক, সদ্য প্রকাশিত সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যান হিসেবে নয়।
তবে বাজারের মন্দা সবার জন্য সমান নয়। একই সমীক্ষায় দেখা যায়, সবচেয়ে ভালো করা এক-চতুর্থাংশ ওয়াইন উৎপাদকের বিক্রি প্রায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা এক-চতুর্থাংশের বিক্রি কমেছে ১০.২ শতাংশ। সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক, পণ্য কোথায় বিক্রি হচ্ছে এবং আতিথেয়তা-নির্ভর ব্যবসার ধরন—এসবই পার্থক্য তৈরি করছে বলে প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ।
তাই ‘আমেরিকা ওয়াইন ছেড়ে দিয়েছে’ বললে ছবিটা খুব সহজ করে ফেলা হয়। বাজার ছোট হচ্ছে, কিন্তু সেই ছোট বাজারের মধ্যেও কেউ টিকে যাচ্ছে, কেউ দ্রুত পিছিয়ে পড়ছে।
এর পিছনে প্রজন্মের বদল একটি কারণ। নিয়মিত পুরনো ক্রেতাদের বয়স বাড়ছে, অথচ কমবয়সিরা একই অভ্যাসে একই পরিমাণে তাঁদের জায়গা নিচ্ছেন না। তাঁদের পানীয়ের পছন্দও তুলনায় বেশি বিচিত্র। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার বাড়তি খরচ, দামের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ। নতুন প্রজন্ম বয়স বাড়লেই আগের ক্রেতাদের মতো বোতল কিনতে শুরু করবে—এই আশায় বসে থাকাকে শিল্পের সাম্প্রতিক সমীক্ষা নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিকল্পনা হিসেবে দেখছে না। তবে সব তরুণের রুচি এক—এমন দাবিও সেখানে নেই।
জমির ছবিটাও একটু জটিল। ক্যালিফর্নিয়া অ্যাসোসিয়েশন অব ওয়াইনগ্রেপ গ্রোয়ার্সের মানচিত্র প্রকল্প উপগ্রহের ছবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মাঠপর্যায়ের যাচাই মিলিয়ে কোথায় আঙুরের লতা রয়েছে আর কোথায় তা তুলে ফেলা হয়েছে, তা চিহ্নিত করে। কিন্তু মানচিত্রে লতা দেখা যাচ্ছে মানেই সেই জমিতে সক্রিয় উৎপাদন চলছে—এমন নয়।
প্রকল্পের পদ্ধতিগত ব্যাখ্যায় পরিত্যক্ত, অল্প পরিচর্যার বা সাময়িকভাবে বন্ধ জমিও ‘লতা রয়েছে’ শ্রেণিতে পড়তে পারে। মানচিত্র কোনও ক্ষেতের বর্তমান স্বাস্থ্য বা খামারটি বাস্তবে চালু আছে কি না, সে উত্তর দেয় না।
তার উপর ওই নথির সময়সীমাও মনে রাখা জরুরি। সেখানে ব্যবহৃত মানচিত্র ১ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত জমির অবস্থা ধরে তৈরি; তার পরের পরিবর্তন সেই সংস্করণে নেই। সংজ্ঞা অনুযায়ী দুই একরের কম কিছু বিচ্ছিন্ন ক্ষেতও বাদ পড়ে। খাওয়ার আঙুর বা কিশমিশ তৈরির আঙুরও এই মানচিত্রের আওতায় নয়—লক্ষ্য ওয়াইনের জন্য ব্যবহৃত আঙুরের ক্ষেত চিহ্নিত করা। কৃষকেরা যাচাইকৃত সংশোধন জানালে পরবর্তী সংস্করণে তা যোগ করার ব্যবস্থাও রয়েছে।
অর্থাৎ কত জমিতে লতা আছে, কত জমিতে এ বছর ফসল তোলা হবে এবং কত ফসল বিক্রি হয়েছে—তিনটি আলাদা প্রশ্ন। আকাশ থেকে সবুজ সারি দেখা গেলেই কৃষকের ব্যবসা ভালো চলছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।
বিশ্লেষণ: এই সংকটে চাষি আর বোতল বিক্রেতার ঝুঁকিও এক নয়। একটি ওয়াইন সংস্থা বিপণনের ধরন বদলাতে পারে, নতুন ক্রেতা খুঁজতে পারে বা অন্য বাজারে যেতে পারে। কিন্তু বহু বছরের লতা তুলে অন্য ফসলে যাওয়া একজন কৃষকের জন্য জমি, শ্রম, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ আয়ের পুরো হিসাব নতুন করে করা।
আজ অতিরিক্ত সরবরাহ কমাতে যে লতা তুলে ফেলা হচ্ছে, তার প্রভাব আগামী দিনের উৎপাদনক্ষমতার উপরও পড়বে। তাই বাজারের ভারসাম্য ফিরছে কি না, সেই প্রশ্নের পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন জরুরি—সংশোধনের খরচটা দিচ্ছে কে?
আর এই গল্পকে ‘মানুষ কম মদ খাচ্ছে’—এই এক লাইনে নামিয়ে আনাও ঠিক হবে না। এর ভিতরে আছে কৃষিজমির ব্যবহার, বদলে যাওয়া ক্রেতা, সরবরাহের ভারসাম্য, ঋণ, শ্রম এবং কৃষকের অভিযোজনের প্রশ্ন। বিকল্প ফসল, জমির ভবিষ্যৎ ব্যবহার কিংবা কৃষকের আর্থিক চাপ—এসব নিয়েই বরং আলোচনাটা এগোনো দরকার।
বেরিহিলের মাঠে আঙুর পেকেছে। কিন্তু কৃষিতে ভালো ফলন কখনও পুরো সাফল্য নয়। ফসল ফলানো এক কাজ; সেই ফসলের জন্য এমন একজন ক্রেতা খুঁজে পাওয়া, যে হাজার মাইল দূরে বসে নিজের অভ্যাস বদলে ফেলছে না—সেটাই অন্য কাজ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



