নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতবিরোধ আগেও হয়েছে। কিন্তু দুই নির্বাচন কমিশনার এমন সব বিষয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন, যা সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তির সঙ্গে জড়িত—এমন নজির আগে দেখা যায়নি। নতুন ভোটারের নাম তোলা, তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং গোটা ভোটার তালিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করার তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা—সবই সেই আপত্তির আওতায়।

১. ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ

আইন অনুযায়ী আপনি ভোট দেওয়ার অধিকারী হতে পারেন। কিন্তু এখন আপনার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে ‘ব্যবস্থা’ নিজেই। আপনার নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকও হয়তো আপনার অধিকার নিশ্চিত করতে পারবেন না।

গোয়ায় ঠিক এমনটাই ঘটেছে। সেখানে ৯৭ জন নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিকের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেছিলেন। তাঁরা প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেন। সংশ্লিষ্ট আধিকারিক তাঁদের যোগ্য বলে বিবেচনাও করেন। কিন্তু দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতর থেকে নিয়ন্ত্রিত সফটওয়্যার সেই সিদ্ধান্ত নথিভুক্ত করতে দেয়নি।

অর্থাৎ, কোনও নাগরিক ভোটার হওয়ার যোগ্য হতে পারেন, সেই যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারেন এবং আইন যাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে, সেই আধিকারিকের কাছেও যোগ্য বলে স্বীকৃতি পেতে পারেন। তা সত্ত্বেও ভোটের দিন তাঁর নাম তালিকায় না-ও থাকতে পারে। কারণ, ভোটার তালিকা এখন এমন এক কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার অধীন, যা সংশ্লিষ্ট আধিকারিককেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দিয়েছে।

২. পরবর্তী প্রজন্মের উপরেও বিশেষ নিবিড় সংশোধনের ছায়া

ফর্ম ৬-এর যে পরিবর্তন নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনার আপত্তি জানিয়েছেন, তাতে নতুন ভোটারদের জানাতে বলা হচ্ছে, সর্বশেষ বিশেষ নিবিড় সংশোধনের ভোটার তালিকায় তাঁদের বাবা-মা, ঠাকুরদা-ঠাকুরমা বা দাদু-দিদিমার নাম রয়েছে কি না।

তীব্র বিতর্কের মধ্যে চলা এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় কোনও বাবা বা মায়ের নাম বাদ পড়লে, এবং তার পর সেই বিষয়টি আপিল বা বিচারিক নিষ্পত্তির পথে গেলে, তার অনিশ্চয়তা এখন তাঁদের সন্তানের উপরেও ছায়া ফেলবে।

কে নতুন ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবেন, তা নির্ধারণের এই গুরুত্বপূর্ণ আবেদনপত্র বদলে দেওয়া হয়েছে। অথচ আইন অনুযায়ী সরকারের যে বিধি সংশোধন করার কথা, তা করা হয়নি।

৩. সুরক্ষাব্যবস্থার ক্ষয়

নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থায় ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণই ছিল তার সবচেয়ে বড় সুরক্ষাকবচ। কয়েক দশক ধরে ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগের জবাবে কমিশন একটি মৌলিক যুক্তিই দিয়ে এসেছে: কোনও এক ব্যক্তি বা একটি দল গোটা তালিকা নিয়ন্ত্রণ করে না। আইনবলে দায়িত্বপ্রাপ্ত হাজার হাজার আধিকারিক নিজ নিজ নির্বাচনী কেন্দ্রে সেই কাজ করেন।

দুই নির্বাচন কমিশনারের অভিযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হলে সেই সুরক্ষাকবচ দুর্বল হয়ে পড়ে। দিল্লিতে বসে একটি দল এখন মাঠপর্যায়ের আধিকারিকদের কাজ আটকে দিতে পারে, তাঁদের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করতে পারে, এমনকি বাতিলও করতে পারে।

৪. ভেঙে পড়ছে ক্ষমতার ভারসাম্য ও পারস্পরিক নিয়ন্ত্রণ

ভারতের নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট আইনে বলা রয়েছে, যত দূর সম্ভব সর্বসম্মতিক্রমে কমিশনের কাজ পরিচালিত হবে। সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য হলে সিদ্ধান্ত হবে সংখ্যাগরিষ্ঠের মত অনুযায়ী।

অথচ নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু ও বিবেক জোশী বারবার লিখিতভাবে জানিয়েছেন, কমিশনের নামে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের আগে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি; এমনকি সিদ্ধান্তের কথা তাঁদের জানানোও হয়নি।

৫. কমিশনের নির্ধারিত দায়িত্ব ও কার্যপদ্ধতির লঙ্ঘন

কমিশনের মধ্যে মতবিরোধ আগেও হয়েছে। কিন্তু এবারের বিরোধের চরিত্র একেবারেই আলাদা।

২০০৯ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এন গোপালস্বামী রাষ্ট্রপতিকে চিঠি লিখে নির্বাচন কমিশনার নবীন চাওলাকে সরানোর সুপারিশ করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল পক্ষপাতিত্বের। বাজপেয়ী সরকারের আমলে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত গোপালস্বামী পরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হন।

২০০৯ সালের ১ মার্চ সরকার তাঁর সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করে। সে বছরের এপ্রিলেই গোপালস্বামীর উত্তরসূরি হিসেবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হন চাওলা।

২০১৯ সালের মে মাসে, লোকসভা নির্বাচনের শেষ দফার কয়েক দিন আগে, নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসা মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সুনীল অরোরাকে চিঠি দেন। তিনি জানান, চূড়ান্ত নির্দেশে তাঁর ভিন্নমত নথিভুক্ত না করা পর্যন্ত নির্বাচনী আদর্শ আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে কমিশনের বৈঠকে তিনি যোগ দেবেন না।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপির তৎকালীন সভাপতি অমিত শাহকে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সঙ্গে তিনি একমত হননি। অরোরা বলেছিলেন, তিন সদস্য পরস্পরের হুবহু প্রতিরূপ হবেন, এমন প্রত্যাশা করা হয় না।

২০১৯ সালের ২১ মে পূর্ণাঙ্গ কমিশনের বৈঠকে ২–১ ভোটে সিদ্ধান্ত হয়, ভিন্নমত দফতরের নথিতে থাকবে, কিন্তু চূড়ান্ত নির্দেশে থাকবে না। পরের বছর, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার পালা আসার আগেই, এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্কে যোগ দিতে কমিশন ছাড়েন লাভাসা। অরোরা ও লাভাসা—দু’জনেই এনডিএ সরকারের আমলে নিযুক্ত হয়েছিলেন।

চাওলা ও লাভাসা—দুই ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে একজন সদস্য আপত্তি তুলেছিলেন। এবার কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই কমিশনার এমন কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্নমত জানাচ্ছেন না, যেখানে তাঁদের মত খারিজ হয়ে গিয়েছে। তাঁরা লিখিতভাবে জানাচ্ছেন, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, নির্দেশ জারি হয়েছে, মামলা দায়ের হয়েছে—অথচ তাঁরা অন্ধকারে।

অথচ ২০২৩ সালের আইন অনুযায়ী, কমিশনের কাজ করার কথা ‘যত দূর সম্ভব সর্বসম্মতভাবে’, কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টো।