ড্রোনের খোলস ভারতীয়, ভিতরে কার নির্দেশ

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত ড্রোন বা নজরদারি-ক্যামেরার গায়ে ভারতীয় সংস্থার নাম থাকলেও তার ভিতরের যন্ত্রাংশ, সফ্টওয়্যার ও গোপন যোগাযোগ কোথা থেকে এসেছে—সেটি পরীক্ষা করতে ছয়টি…
- ‘অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিসিস অব ইলেকট্রনিক সিস্টেমস হার্ডওয়্যার ফর ভালনারেবিলিটিজ অ্যান্ড সিকিউরিটি থ্রেটস’ বা সংক্ষেপে আশ্বস্ত নামে প্রথম কেন্দ্রটি দিল্লিতে তৈরি হচ্ছে।
- পরে আরও পাঁচটি কেন্দ্রে একই ক্ষমতা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত ড্রোন বা নজরদারি-ক্যামেরার গায়ে ভারতীয় সংস্থার নাম থাকলেও তার ভিতরের যন্ত্রাংশ, সফ্টওয়্যার ও গোপন যোগাযোগ কোথা থেকে এসেছে—সেটি পরীক্ষা করতে ছয়টি বিশেষ গবেষণাগার গড়ছে ভারতীয় সেনা। ‘অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিসিস অব ইলেকট্রনিক সিস্টেমস হার্ডওয়্যার ফর ভালনারেবিলিটিজ অ্যান্ড সিকিউরিটি থ্রেটস’ বা সংক্ষেপে আশ্বস্ত নামে প্রথম কেন্দ্রটি দিল্লিতে তৈরি হচ্ছে। পরে আরও পাঁচটি কেন্দ্রে একই ক্ষমতা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সেনার ইলেকট্রনিক্স ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্সের মহাপরিদপ্তরের জন্য কুইকপে প্রাইভেট লিমিটেড ব্যবস্থাটি তৈরি করেছে। এপ্রিল মাসে পরীক্ষাগারের প্রয়োজন জানিয়ে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছিল। সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, প্রথমে ড্রোন এবং পরে সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডওয়্যার ও ফার্মওয়্যার খুলে দেখা হবে। কোনও পণ্যের বিজ্ঞাপিত নির্মাতা এক দেশ হলেও প্রসেসর, যোগাযোগ-মডিউল, স্মৃতি বা সক্রিয় যন্ত্রাংশ অন্য দেশের হতে পারে; পরীক্ষায় সেই উৎসও চিহ্নিত করার চেষ্টা হবে।
ব্যবস্থাটি অন্তত ১৪ ধরনের দুর্বলতা খুঁজতে পারবে বলে দাবি করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে অবস্থান, সময় বা ভৌগোলিক সীমা অনুযায়ী হঠাৎ কাজ বন্ধ করার নির্দেশ; গোপন সংকেত পেলে সক্রিয় হওয়া কোড; কারখানায় বসানো পাসওয়ার্ড বা ক্রিপ্টোগ্রাফিক চাবি; দূর থেকে নিয়ন্ত্রণের সফ্টওয়্যার; অননুমোদিত তথ্য পাঠানো এবং ঘোষিত নকশার বাইরে বিদেশি উপাদান। সামরিক ড্রোনে এমন একটি দুর্বলতাও উড্ডয়নের তথ্য, লক্ষ্য বা সেনার অবস্থান ফাঁস করতে পারে।
চীনা যন্ত্রাংশ নিয়ে উদ্বেগ এর প্রধান পটভূমি। বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও শিল্প ড্রোনের সরবরাহ-শৃঙ্খলে চীনা সংস্থার বড় ভূমিকা রয়েছে। ভারতীয় সমাবেশকারী প্রতিষ্ঠান অনেক সময় বিদেশি ক্যামেরা, মোটর-নিয়ন্ত্রক, রেডিয়ো বা চিপ ব্যবহার করে। কোনও যন্ত্রাংশ চীনে তৈরি হলেই সেটি গুপ্তচরবৃত্তি করছে—এমন নয়; আবার শুধু চূড়ান্ত সংযোজন ভারতে হলেই পণ্য নিরাপদ হয় না। আশ্বস্তের উদ্দেশ্য দেশ-লেবেলের বদলে বাস্তব উপাদান ও আচরণ পরীক্ষা করা।
প্রতিরক্ষা ক্রয়ে আগে নথি, বিক্রেতার ঘোষণা ও নমুনা-পরীক্ষার উপর নির্ভরতা বেশি ছিল। নতুন পরীক্ষাগার ক্রয়ের আগে, সরবরাহের সময়ে এবং সফ্টওয়্যার বদলের পরে তুলনামূলক পরীক্ষা করতে পারলে ঝুঁকি কমতে পারে। তবে একটি নমুনা নিরাপদ পাওয়া মানে একই মডেলের প্রতিটি উৎপাদন-দল নিরাপদ নয়। ফার্মওয়্যার হালনাগাদে নতুন কোড ঢুকতে পারে; সরবরাহকারী মাঝপথে যন্ত্রাংশও বদলাতে পারে। তাই পরীক্ষার ফলকে ধারাবাহিক নজরদারির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
পরীক্ষায় কোনও বিদেশি অংশ ধরা পড়লে তার ফলও দ্বিমুখী হতে পারে। অনুমোদনহীন বা ঘোষণাবহির্ভূত অংশ নিরাপত্তা ও চুক্তিভঙ্গের প্রশ্ন তুলবে; কিন্তু অনুমোদিত আমদানিকৃত চিপের বিকল্প দেশে না-থাকলে তাৎক্ষণিক নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজনীয় ড্রোন সরবরাহই থামাতে পারে। তাই ঝুঁকির স্তর, ব্যবহারের সংবেদনশীলতা এবং বদলি তৈরির সময় ধরে সিদ্ধান্ত দরকার। স্বদেশি উৎপাদনের লক্ষ্যকে পরীক্ষাগারের ফলের সঙ্গে গবেষণা ও ক্রয়-পরিকল্পনায় জুড়তে হবে। একই মানদণ্ড বেসরকারি সরবরাহকারী ও সরকারি গবেষণায় তৈরি পণ্য—উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষণ: এই উদ্যোগের মূল্য কোনও ‘চীনা অংশ খোঁজার যন্ত্র’ হওয়ার চেয়ে বড়। আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম বহু দেশের জটিল সরবরাহ-শৃঙ্খলে তৈরি হয়; নিরাপত্তা যাচাইও উপাদানের দেশ দিয়ে শেষ হতে পারে না। নকশার পরিচিত দুর্বলতা, এনক্রিপশনের মান, সফ্টওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিক্রেতা বন্ধ হয়ে গেলে মেরামতের ক্ষমতা—সবই ক্রয়মূল্যের অংশ হওয়া দরকার।
একই সঙ্গে প্রস্তুতকারকের দাবি এবং স্বাধীন প্রমাণ আলাদা রাখতে হবে। ১৪ ধরনের সমস্যা শনাক্ত করার ঘোষণা বাস্তব আক্রমণ-অনুকরণ, ভুল সংকেতের হার এবং বহিরাগত পরীক্ষায় কতটা টেকে, সেই ফল এখনও প্রকাশিত নয়। নিরাপত্তার কারণে সব কারিগরি তথ্য জনসমক্ষে আসবে না, কিন্তু ক্রয়কারী সংস্থার মধ্যে ফল বিনিময়, ব্যর্থ পণ্যের তালিকা এবং সংশোধনের সময়সীমা থাকা প্রয়োজন। আশ্বস্ত নামটি আস্থা বোঝায়; সেই আস্থা গড়ে উঠবে সিলমোহরে নয়, একই পণ্য বারবার খুলে দেখে এবং ঘোষণার সঙ্গে ভিতরের বাস্তবতা মিলিয়ে। যুদ্ধক্ষেত্র সেই ভুল ক্ষমা করে না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



