বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সায়মার ইস্তফা, নিয়ম মেনেই পদক্ষেপের দাবি কর্তৃপক্ষের

যা জানা জরুরি
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে ইস্তফা দিলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ।
- বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন।
- তার আগের দিনই সংস্থার আঞ্চলিক কমিটি তাঁর নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ করেছিল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালকের পদ থেকে ইস্তফা দিলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ। বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। তার আগের দিনই সংস্থার আঞ্চলিক কমিটি তাঁর নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশ কার্যনির্বাহী পরিষদের বিবেচনা করার কথা ছিল। আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ ঘিরে আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের তদন্ত চলার মধ্যেই এই পদত্যাগ। সায়মা অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, তাদের বিধিবদ্ধ কাঠামো মেনেই গোটা বিষয়টি পরিচালিত হয়েছে। ন্যায্যতা এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের পাশাপাশি সংস্থার স্বার্থ ও দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। পদত্যাগের বিষয়টি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কমিটি এবং কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্যদের জানানো হচ্ছে।
অন্যদিকে সায়মার অভিযোগ, তাঁকে হয়রানি ও ভয় দেখানো হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে তিনি জানিয়েছেন, মহাপরিচালক টেড্রস আধানম ঘেব্রেয়েসুসের আচরণ নিয়ে তদন্ত চাওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে তাঁকে বিনা বেতনে ছুটিতে রাখা হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন এই পরিস্থিতি সামলানো মানসিক ও আর্থিক দিক থেকে অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। তাই তিনি সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিতর্কের সূত্রপাত আরও আগে। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৫ সালের মার্চে সায়মার বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনে। অভিযোগের মধ্যে ছিল তাঁর নেতৃত্বাধীন একটি সংস্থার মাধ্যমে অর্থ সরানো এবং সরকারি জমি বেআইনিভাবে পাওয়ার বিষয়। ওই বছরের জুলাইয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, সায়মা ছুটিতে রয়েছেন। তখন জেনিভার সদর দফতরের সহকারী মহাপরিচালক ক্যাথারিনা বোহমেকে আঞ্চলিক দফতরের অন্তর্বর্তী দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে বর্তমান পদত্যাগের অনেক আগেই তাঁর স্বাভাবিক দায়িত্ব পালনে ছেদ পড়েছিল।
রয়টার্সের দেখা নথি অনুযায়ী, চিন সফরের খরচ এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার বিবরণ নিয়েও সায়মার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। তাঁর আইনজীবীদের জবাব, ৯০১ ডলারের সফরব্যয় সংক্রান্ত বিষয়টি এক সহকারীর প্রশাসনিক ভুল। নিজের সম্মানসূচক ডক্টরেটের পরিচয়ও গোপন করেননি বলে তাঁর দাবি। বাংলাদেশের জমিটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় যোগ দেওয়ার আগে পেয়েছিলেন এবং তৎকালীন আইনে তার অধিকারী ছিলেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। পদত্যাগপত্রে সায়মা অভিযোগ করেছেন, তাঁকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হচ্ছিল না। মহাপরিচালকের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারানোর কথাও লিখেছেন তিনি।
সায়মা এর আগে অভিযোগ করেছিলেন, বাংলাদেশে হাসিনার পতনের পরে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নিশানা করা হচ্ছে। তিনি স্বাধীন তদন্তও চেয়েছিলেন। তবে এটি তাঁর অভিযোগ; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিজেদের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে নিয়ম ও ন্যায্যতা অনুসরণের কথাই বলেছে।
২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পাঁচ বছরের মেয়াদে দায়িত্ব নিয়েছিলেন সায়মা। তিনিই এই পদে প্রথম বাংলাদেশি এবং দ্বিতীয় মহিলা। নতুন আঞ্চলিক পরিচালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত নীলেশ বুদ্ধ দফতরের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছে সংস্থা।
ঘটনাপ্রবাহে একটি পার্থক্য স্পষ্ট রাখা জরুরি: আঞ্চলিক কমিটি নিয়োগ বাতিলের সুপারিশ করেছিল, কিন্তু সেই সুপারিশের ভিত্তিতে কার্যনির্বাহী পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই সায়মা পদত্যাগ করেন। ফলে তাঁর প্রস্থানকে সরাসরি বরখাস্ত বলে বর্ণনা করা যথাযথ হবে না। একইভাবে পদত্যাগকে অভিযোগ স্বীকার বলেও ধরে নেওয়া যায় না।
এই বিরোধে এখন মুখোমুখি দুটি বক্তব্য। সায়মা বলছেন, হয়রানি এবং আর্থিক চাপ তাঁকে সরে যেতে বাধ্য করেছে। সংস্থা বলছে, প্রক্রিয়াগত ন্যায্যতা বজায় রেখেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রকাশিত বিবৃতিতে তদন্তের সমস্ত নথি বা প্রত্যেক অভিযোগের বিস্তারিত নিষ্পত্তি নেই। তাই কোন পক্ষের ব্যাখ্যা কতটা প্রতিষ্ঠিত, সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু পদত্যাগের খবর থেকে পাওয়া যায় না। আপাতত নিশ্চিত বিষয় হল, পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই সায়মা সরে দাঁড়ালেন এবং আঞ্চলিক দফতর পরিচালনায় অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাই বহাল থাকছে এখন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



