যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে আক্রমণের সুর চড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার ‘গেরুয়া সম্মান যাত্রা’র নেতৃত্ব দিয়ে তাঁর হুঁশিয়ারি, যাঁরা কিষেণজিকে সেলাম জানান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্রি কাশ্মীর’ স্লোগান দেন, তাঁদের উপড়ে ফেলা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে বাম ও দক্ষিণপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির টানাপড়েনের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য সংঘাতকে আরও বড় রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে গেল।

গোলপার্ক থেকে যাদবপুর অভিমুখে আয়োজিত পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেন শুভেন্দু। গেরুয়া পতাকা হাতে সাধুসন্তরাও কর্মসূচিতে অংশ নেন। মিছিলের গন্তব্য ছিল যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকা। বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় পৌঁছে মুখ্যমন্ত্রীর রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ফলে কর্মসূচিটি শুধু ধর্মীয় প্রতীকের সম্মানরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; শিক্ষাঙ্গনে কোন ধরনের রাজনীতি চলবে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

মিছিলকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার ব্যবস্থাও ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২, ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ফটক বন্ধ রাখা হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথও হয়ে ওঠে এ দিনের ঘটনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। বাইরে মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে পদযাত্রা এবং ভিতরে পঠনপাঠনের জায়গা—এই দুই পরিসরের মাঝখানে বন্ধ ফটকের ছবিটি পরিস্থিতির উত্তাপ বুঝিয়ে দেয়।

সাম্প্রতিক বাম ও এবিভিপি সমর্থকদের সংঘর্ষের জেরে যাদবপুর নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর চলছিল। মিছিলের আগে দিলীপ ঘোষও বাম ছাত্র সংগঠনগুলিকে আক্রমণ করেন। তাঁর অভিযোগ, কিছু পড়ুয়াকে উসকে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের অখণ্ডতার বিরোধী পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে। সেখানে ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি শোনার দাবি জানান তিনি। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের খবরও প্রকাশিত হয়।

শুভেন্দুর বক্তব্যে কিষেণজি এবং কাশ্মীরের উল্লেখ অবশ্য এই প্রথম নয়। গত ২৮ আগস্ট ভবানীপুরে রাখিবন্ধনের অনুষ্ঠানে তিনি যাদবপুরের দেওয়ালে মাওবাদী নেতা কিষেণজিকে অভিবাদন জানানোর লেখা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, এমন ব্যক্তিকে সম্মান জানিয়ে নতুন প্রজন্মের সামনে কী আদর্শ তুলে ধরা হচ্ছে। কিষেণজি সংবিধান মানতেন না এবং নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন বলে সে দিন অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী।

ওই অনুষ্ঠানেই কলকাতার রাস্তায় স্বাধীনতার দাবিসূচক স্লোগানের বিরোধিতা করেছিলেন শুভেন্দু। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও কেন এমন দাবি উঠবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। কাশ্মীর প্রসঙ্গেও তাঁর আপত্তি ছিল। পাশাপাশি সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া নিয়ে বিরোধিতার সমালোচনা করে দেশের ভিতরের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। বুধবারের হুঁশিয়ারিকে তাই গত কয়েক সপ্তাহের ধারাবাহিক রাজনৈতিক অবস্থানের আরও কঠোর প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়।

আগস্টের ওই বক্তব্যে দেশের বাইরের শত্রুর পাশাপাশি দেশের ভিতরের বিরোধীদের প্রসঙ্গও এনেছিলেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি ছিল, সশস্ত্র বাহিনী সীমান্তের ওপারের বিপদের মোকাবিলা করলেও ভিতর থেকে কিছু শক্তি দেশকে দুর্বল করছে। সেই শক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধের কথাও বলেন তিনি। ওই দিন ভবানীপুরে শোভাযাত্রায় ঢোল বাজিয়ে অংশ নেওয়ার পরে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে কীর্তনেও যোগ দেন শুভেন্দু। ফলে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রাজনৈতিক বার্তাকে পাশাপাশি রাখার ধারাটি বুধবারের কর্মসূচির আগেও তাঁর প্রকাশ্য কর্মসূচিতে দেখা গিয়েছে।

তবে মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ এবং স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত ঘটনার মধ্যে পার্থক্য রাখা প্রয়োজন। কারা কোন স্লোগান দিয়েছেন, কখন দিয়েছেন, তার সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট কী—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর আলাদা। কোনও দেওয়াললিখনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রী কিংবা শিক্ষকের মত বলে ধরে নেওয়াও যথার্থ হবে না। বুধবারের বক্তৃতায় ব্যবহৃত উপড়ে ফেলার ভাষা নির্দিষ্ট কোনও প্রশাসনিক পদক্ষেপের ঘোষণা কি না, তা স্পষ্ট নয়।

এর মধ্যেই উচ্চশিক্ষায় রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর একটি বিতর্ক সামনে এসেছে। বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর বিধানসভার এক দিনের বিশেষ অধিবেশনে এমন সংশোধনী বিল আনার কথা, যা রাজ্য সরকারকে এক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী বদলির ক্ষমতা দেবে। সোমবার রাজ্য মন্ত্রিসভা প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন ও শিক্ষাবিদ এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন।

পদযাত্রা এবং বদলি সংক্রান্ত প্রস্তাবের বিষয় আলাদা হলেও দুটির কেন্দ্রেই রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তাই ঘটনাদুটিকে পাশাপাশি দেখার অবকাশ আছে। একদিকে মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে শিক্ষাঙ্গনের বিশেষ রাজনৈতিক প্রবণতাকে নির্মূল করার কথা বলছেন; অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব আসছে। এই সমাপতন স্বশাসন নিয়ে প্রশ্নকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলে।

গেরুয়া সম্মান রক্ষার নামে যাদবপুরকে মিছিলের গন্তব্য করার রাজনৈতিক তাৎপর্যও এখানেই। কোনও রঙের ধর্মীয় মর্যাদা, একটি দলের রাজনৈতিক পরিচয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের মতাদর্শগত বিরোধ এক কর্মসূচিতে এসে মিলেছে। এই অবস্থায় গেরুয়ার অবমাননার অভিযোগ ও বিজেপির বিরোধিতাকে একই অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। ধর্মীয় অনুভূতির প্রসঙ্গ উঠলে ছাত্র সংগঠনগুলির নির্দিষ্ট বিরোধের সীমা দ্রুত বদলে যেতে পারে।

মুখ্যমন্ত্রীর পদাধিকার তাঁর বক্তব্যকে বাড়তি গুরুত্ব দেয়। একজন দলীয় নেতা প্রতিপক্ষকে সরানোর কথা বললে তার অর্থ সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। সরকারের প্রধান একই ভাষা ব্যবহার করলে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। সেই কারণে হুঁশিয়ারির পর কোনও নির্দেশ, তদন্ত বা অন্য পদক্ষেপ আসে কি না, তা দেখার বিষয়। শুধু বক্তৃতা থেকে কাউকে বহিষ্কার কিংবা কোনও সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে বলা যায় না।

যাদবপুরের সামনে বুধবারের সমাবেশে শাসকশিবির নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কাজ, ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা এবং ভিন্নমতের সহাবস্থানের প্রশ্নগুলির উত্তর মিছিলের শক্তিপ্রদর্শনে মেলে না। পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্যেই বোঝা যাবে, এই সংঘাত কোন পথে এগোচ্ছে। আপাতত গেরুয়া সম্মানের কর্মসূচি থেকে মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া কঠোর বার্তা শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করল।