দুষ্টু ছেলে’র বদনাম ঘুচিয়ে মহাকাশে ভারতের প্রথম ভূ-চিত্রগ্রাহক উপগ্রহ

যা জানা জরুরি
- ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে নতুন অধ্যায় লিখল জিএসএলভি।
- অতীতে একাধিক অভিযানে ব্যর্থতার কারণে যে রকেটকে ঠাট্টা করে ইসরোর ‘দুষ্টু ছেলে’ বলা হত, সেই জিএসএলভি-এফ১৭-ই শুক্রবার ভোরে সফলভাবে মহাকাশে পৌঁছে দিল ইওএস-০৫ উপগ্রহকে।
- পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় ভূ-সমলয় কক্ষপথে থেকে ছবি তোলার জন্য নির্মিত এটিই ভারতের প্রথম উপগ্রহ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে নতুন অধ্যায় লিখল জিএসএলভি। অতীতে একাধিক অভিযানে ব্যর্থতার কারণে যে রকেটকে ঠাট্টা করে ইসরোর ‘দুষ্টু ছেলে’ বলা হত, সেই জিএসএলভি-এফ১৭-ই শুক্রবার ভোরে সফলভাবে মহাকাশে পৌঁছে দিল ইওএস-০৫ উপগ্রহকে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় ভূ-সমলয় কক্ষপথে থেকে ছবি তোলার জন্য নির্মিত এটিই ভারতের প্রথম উপগ্রহ।
অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটায় সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্রের দ্বিতীয় উৎক্ষেপণ মঞ্চ থেকে রাত ২টো ৫৫ মিনিটে রকেটটি যাত্রা শুরু করে। উৎক্ষেপণের প্রায় ১৮ মিনিট পরে ২,৩৬৭ কিলোগ্রাম ওজনের ইওএস-০৫-কে নির্দিষ্ট অন্তর্বর্তী কক্ষপথে স্থাপন করে জিএসএলভি-এফ১৭। এরপর নিজস্ব পরিচালনব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে ধাপে ধাপে আরও উপরে উঠে উপগ্রহটি তার চূড়ান্ত ভূ-সমলয় কক্ষপথে পৌঁছবে। ইসরোর সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, রকেটটি উপগ্রহকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নির্ধারিত কক্ষপথে স্থাপন করেছে।
ইওএস-০৫ সাধারণ ভূ-পর্যবেক্ষণকারী উপগ্রহের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। ভারতের অধিকাংশ সক্রিয় ভূ-পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ পৃথিবীর কাছাকাছি নিম্ন কক্ষপথে ঘোরে। পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে করতে নির্দিষ্ট সময় অন্তর তারা ভারতের উপর দিয়ে যায় এবং ছবি তোলে। ফলে একই অঞ্চলের পরপর ছবি পেতে দুটি প্রদক্ষিণের মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
ইওএস-০৫ থাকবে এমন এক উচ্চতায়, যেখানে তার প্রদক্ষিণকাল পৃথিবীর নিজের অক্ষের উপর আবর্তনের সময়ের সমান। তাই ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকার উপর কার্যত অবিচ্ছিন্ন দৃষ্টি রাখা সম্ভব হবে। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে একই অঞ্চলের ছবি তুলে তার পরিবর্তনও শনাক্ত করতে পারবে উপগ্রহটি। মেঘমুক্ত পরিস্থিতিতে দেশের বৃহৎ এলাকার প্রায় তাৎক্ষণিক ছবি সরবরাহ করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য।
প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় এই ক্ষমতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ঘূর্ণিঝড়, মেঘভাঙা বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস কিংবা দাবানলের মতো বিপর্যয় কতটা ছড়িয়ে পড়ছে, কোন এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং কোথায় দ্রুত উদ্ধারকারী দল পাঠানো প্রয়োজন—ইওএস-০৫ থেকে পাওয়া ঘন ঘন ছবি সেই সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। কৃষিক্ষেত্রে ফসলের অবস্থা, খরা, জলাভাব বা রোগের বিস্তার পর্যবেক্ষণেও এর তথ্য কাজে লাগতে পারে। বনাঞ্চলের পরিবর্তন, বেআইনি বৃক্ষচ্ছেদন, জলাশয়ের সংকোচন, শহরের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো নির্মাণের অগ্রগতিও নজরে রাখা যাবে।
উপগ্রহটির ঘোষিত আয়ুষ্কাল দশ বছর। অসামরিক ব্যবহারের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত নজরদারিতেও এর তাৎপর্য যথেষ্ট। সীমান্তবর্তী অঞ্চল, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা কিংবা প্রতিবেশী ভূখণ্ডের পরিবর্তনের ঘন ঘন ছবি পাওয়ার ক্ষমতা ভারতকে নিজস্ব উৎস থেকে কৌশলগত তথ্য সংগ্রহে অনেক বেশি স্বনির্ভর করবে। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে উপগ্রহটির ছবির সর্বোচ্চ স্পষ্টতা এবং নজরদারির পূর্ণ ক্ষমতা প্রকাশ করেনি ইসরো।
এই অভিযানের অন্য তাৎপর্য জিএসএলভির সাফল্য। তিন ধাপের এই রকেটের সবচেয়ে জটিল অংশ হল দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি অতিশীতল জ্বালানিচালিত তৃতীয় ধাপ। প্রযুক্তি উন্নয়নের প্রথম পর্বে একাধিক ব্যর্থতার কারণে পিএসএলভির তুলনায় জিএসএলভির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সেখান থেকেই তার ‘দুষ্টু ছেলে’ নাম। ২০২১ সালে একই ধরনের ভূ-চিত্রগ্রাহক উপগ্রহ ইওএস-০৩-কে নিয়ে যাত্রা করা জিএসএলভি-এফ১০ অভিযান তৃতীয় ধাপের গোলযোগে ব্যর্থ হয়। উপগ্রহটিও হারিয়ে যায়।
সেই স্মৃতি শুক্রবারের সাফল্যকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। এটি জিএসএলভির উনিশতম উড়ান। ইওএস-০৫ আবার এই রকেটে বহন করা এযাবৎ সবচেয়ে ভারী উপগ্রহ। চলতি বছরে ইসরোর কয়েকটি অভিযানে ধাক্কার পরে এই উৎক্ষেপণ বিজ্ঞানীদের প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে দিল। ইসরোর চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন একে দেশের মহাকাশ কর্মসূচির ‘ঐতিহাসিক সাফল্য’ বলে অভিহিত করেছেন।
একটি সফল উৎক্ষেপণ দিয়ে অবশ্য কোনও রকেটের অতীত পুরোপুরি মুছে যায় না। উৎক্ষেপণের ধারাবাহিক সাফল্যই শেষ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্যতার আসল মাপকাঠি। তবু ইওএস-০৫-কে নিখুঁত কক্ষপথে পৌঁছে দিয়ে জিএসএলভি দেখিয়ে দিল, ‘দুষ্টু ছেলে’র পরিচয় পিছনে ফেলে সে এখন ভারতের ভারী উপগ্রহ অভিযানের অন্যতম ভরসাযোগ্য বাহন হয়ে ওঠার পথে। আর ইওএস-০৫ চালু হলে আকাশে স্থায়ী চোখ রেখে বিপর্যয় থেকে কৃষিক্ষেত্র, বনভূমি থেকে সীমান্ত—দেশের প্রতি মুহূর্তের পরিবর্তনের ছবি আরও দ্রুত হাতে পাবে ভারত।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



