এসআইআরে বাদ ১১ কোটি ৮৩ লক্ষ নাম

যা জানা জরুরি
- ভারতের ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর এবং অসমে বিশেষ সংশোধনের ফলে এখনও পর্যন্ত ১১ কোটি ৮৩ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে।
- সংখ্যাটির বিপুলতা বোঝাতে একটি তুলনাই যথেষ্ট—২০২২ সালের ব্রাজিলের সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন প্রায় ১১ কোটি ১৮ লক্ষ মানুষ।
- অর্থাৎ ভারতের সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা ব্রাজিলের সেই নির্বাচনের মোট ভোটদাতার চেয়েও প্রায় ৬৫ লক্ষ বেশি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভারতের ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর এবং অসমে বিশেষ সংশোধনের ফলে এখনও পর্যন্ত ১১ কোটি ৮৩ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। সংখ্যাটির বিপুলতা বোঝাতে একটি তুলনাই যথেষ্ট—২০২২ সালের ব্রাজিলের সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন প্রায় ১১ কোটি ১৮ লক্ষ মানুষ। অর্থাৎ ভারতের সংশোধিত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা ব্রাজিলের সেই নির্বাচনের মোট ভোটদাতার চেয়েও প্রায় ৬৫ লক্ষ বেশি।
‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর ‘নাম্বার থিয়োরি’ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, যেসব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই সংশোধন প্রক্রিয়া হয়েছে, সেখানে আগের তালিকায় থাকা মোট ভোটারের ১২.১ শতাংশের নাম বাদ পড়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের আনুমানিক জনসংখ্যা অনুযায়ী ভারত ও চিন ছাড়া মাত্র ১৪টি দেশের জনসংখ্যা ১০ কোটির বেশি। সেই বিচারে ভারতের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের সংখ্যা একটি মাঝারি আকারের দেশের গোটা জনসংখ্যার চেয়েও বেশি।
তবে এই ১১ কোটি ৮৩ লক্ষকে চূড়ান্ত ভাবে ভোটাধিকার হারানো মানুষের সংখ্যা ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কারণ বিভিন্ন রাজ্যে এসআইআর এখন বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। কোথাও খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, কোথাও দাবি ও আপত্তি নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও সংশোধনের পরে নির্বাচনও হয়ে গিয়েছে। খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া বহু নাম পরবর্তী যাচাই ও আবেদনের ভিত্তিতে ফের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
জম্মু ও কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ এবং লাদাখ ছাড়া দেশের সর্বত্র এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, কেরল ও পুদুচেরিতে দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তির পরে নির্বাচনও হয়ে গিয়েছে। অসমে এসআইআরের পরিবর্তে বিশেষ সংশোধন করা হয়েছিল। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়, রাজস্থান, গুজরাত, গোয়া, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এবং লক্ষদ্বীপে সংশোধন সম্পূর্ণ হলেও এখনও নির্বাচন হয়নি। অবশিষ্ট রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির মধ্যে ত্রিপুরা ও নাগাল্যান্ড ছাড়া ১৭টিতে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, সংশোধনের পরে যে পাঁচটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে নির্বাচন হয়েছে, সেখানে আগের তালিকার তুলনায় ভোটারের সংখ্যা কমেছে ৮.১ শতাংশ। সংশোধন সম্পূর্ণ হলেও নির্বাচন হয়নি—এমন অঞ্চলে হ্রাসের হার ১০.৭ শতাংশ। কিন্তু যেখানে শুধু খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে বাদ পড়ার হার ১৭ শতাংশ। এই ব্যবধান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ, প্রাথমিক খসড়ায় ভুল করে নাম বাদ যাওয়ার প্রবণতা তুলনামূলক ভাবে বেশি; দাবি, আপত্তি ও যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এগোলে বাদ পড়া অনেক ভোটারের নাম ফিরে আসে। পাশাপাশি নতুন ভোটারদের নাম যুক্ত হওয়ায় চূড়ান্ত তালিকার আয়তন আরও বাড়ে।
এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক মূলত দুটি বিপরীত দাবিকে কেন্দ্র করে চলছে। বিরোধীদের অভিযোগ, নথির কঠিন শর্ত চাপিয়ে বহু প্রকৃত নাগরিককে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে সরকারপন্থীদের দাবি, মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক স্থানে নথিভুক্ত এবং নাগরিকত্বের বৈধতা প্রমাণে ব্যর্থ ব্যক্তিদের নামই মূলত সরানো হয়েছে। কিন্তু তথ্য বলছে, বাস্তবতা এই দুই রাজনৈতিক অবস্থানের কোনও একটিতে সম্পূর্ণ ধরা পড়ে না। ভুল অন্তর্ভুক্তি যেমন রয়েছে, তেমনই ভুল বর্জনেরও যথেষ্ট প্রমাণ মিলেছে। নথি জোগাড়ের চাপ সমাজের সুবিধাপ্রাপ্ত অংশকেও সমস্যায় ফেলেছে; দরিদ্র, পরিযায়ী ও প্রান্তিক মানুষের ক্ষেত্রে সেই বাধা আরও গুরুতর।
তবু এখনও পর্যন্ত সংশোধন-পরবর্তী নির্বাচনগুলিতে ভোটদানের মোট সংখ্যা ব্যাপক ভাবে কমে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তালিকাভুক্ত ভোটারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ভোটদানের হার বেড়েছে। কোনও নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা কম অথচ ভোট দিতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা একই বা বেশি হলে শতকরা হার স্বাভাবিক ভাবেই বাড়ে। এই তথ্য এসআইআরের কারণে দেশজুড়ে বিপুল ভোটাধিকার হরণের সরল তত্ত্বকে সমর্থন করে না।
তার অর্থ এই নয় যে উদ্বেগ অমূলক। বিধানসভা বা রাজ্যস্তরের মোট সংখ্যায় পতন না-দেখা গেলেও নির্দিষ্ট কিছু আসনে আগের নির্বাচনের তুলনায় কম মানুষ ভোট দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে বাদ পড়া প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের বিষয় এখনও বিচারাধীন—যা স্থানীয় স্তরে বর্জনের আশঙ্কা কতটা গভীর হতে পারে, তার বড় উদাহরণ।
এসআইআর সম্পর্কে এখন পর্যন্ত তিনটি সিদ্ধান্ত স্পষ্ট। প্রথমত, বাদ পড়া নামের মোট সংখ্যা অস্বাভাবিক রকমের বড়। দ্বিতীয়ত, খসড়া পর্যায়ে বর্জনের হার সর্বাধিক হলেও যাচাই ও দাবি-আপত্তির পরে তা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে। তৃতীয়ত, সামগ্রিক ভোটদানে এখনও বড় পতন দেখা যায়নি, কিন্তু কয়েকটি এলাকায় উদ্বেগজনক ব্যতিক্রম রয়েছে। তাই ১১ কোটি ৮৩ লক্ষের চমকপ্রদ সংখ্যাটিকে যেমন হালকা করে দেখা যায় না, তেমনই একে চূড়ান্ত ভাবে ভোটাধিকার হারানোর হিসাব বলাও বিভ্রান্তিকর। প্রকৃত পরীক্ষাটি হবে চূড়ান্ত তালিকা, পুনর্ভুক্তির পরিমাণ এবং আসনভিত্তিক ভোটদানের তথ্য বিশ্লেষণে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



